kalerkantho

বেহাল শুরুর বোলিং

১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বেহাল শুরুর বোলিং

অধিনায়ক তামিম ইকবাল আসেন নিয়মিত। কখনো কোচ খালেদ মাহমুদ। কখনো-বা সিনিয়র ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সফরে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার সময় তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গেই অদৃশ্যে থাকে যেন এক তোতা পাখি। মুখস্থ বুলি যে আওড়ে যায়— ‘ব্যাটিং ও বোলিংয়ের শুরুটা খারাপ হওয়াই দলের এমন ফলের মূল কারণ।’

কী করুণ বাস্তবতা! কী নগ্ন সত্য!

বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসানের কারণে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় ব্যাটিং ইনিংস অমন হুড়মুড়িয়ে ধসে যায়নি শুরুতে। কিন্তু বোলিংটা তো ছন্নছাড়া তখন থেকেই। ভাবা যায়, বিশ্বকাপ থেকে ধরলে সর্বশেষ ১১ ওয়ানডেতে প্রথম ২০ ওভারে প্রতিপক্ষের মাত্র ১২ উইকেট নিতে পেরেছে বাংলাদেশ! যার মধ্যে একটি আবার রান আউট। অর্থাৎ, বোলাররা এই ১১ ম্যাচে শুরুর ২০ ওভারে নেন ১১ উইকেট। ম্যাচপ্রতি একটি করে!

এমন দখদন্তহীন বোলিং বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটে রয়েছে আর কোনো দলের!

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের তিনটি ম্যাচের বোলিং-ব্যর্থতায় আগে চোখ বোলানো যাক। প্রথম ২০ ওভারে তিন ম্যাচে স্বাগতিকদের রান যথাক্রমে ১৩৫/২, ১২৫/১ এবং কালকের ৯৫/১। প্রথম খেলার তৃতীয় ওভারে শফিউল ইসলাম আউট করেছিলেন আভিস্কা ফার্নান্ডোকে; ১৫তম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজ ওপেনার দিমুথ করুনারত্নেকে। দ্বিতীয় ম্যাচে আবারও ওই অফ স্পিনের শিকার লঙ্কান অধিনায়ক; এবার ১২তম ওভারে। কাল প্রথম ২০ ওভারের সবেধন নীলমণি পঞ্চম ওভারে শফিউলের বলে ফার্নান্ডোর এলবিডাব্লিউর উল্লাস।

মাশরাফি-সাকিব-সাইফ উদ্দিনরা নেই বলে এমন নির্বিষ বাংলাদেশের বোলিং—সে দোহাই দেবেন? উপায় নেই। বিশ্বকাপের সময় থেকেই তো ইনিংসের শুরুতে অমন ঢোঁড়াসাপ বোলাররা। প্রথম ২০ ওভারের খেরোখাতার ছিন্ন পাতাগুলো জোড়া লাগিয়ে দেখা যাক আরেকবার। ওই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা তুলে ফেলে ২ উইকেটে ১০৫ রান। ১০ম ওভারে কুইন্টন ডি ককের রান আউট; ২০তম ওভারে সাকিব ফেরান এইডেন মারক্রামকে। নিউজিল্যান্ডের ২ উইকেটে ১১০ রানে দুটিই সাকিবের শিকার; ষষ্ঠ ওভারে মার্টিন গাপটিল এবং দশম ওভারে কলিন মুনরোকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম উইকেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ২০তম ওভার পর্যন্ত। মাশরাফি আউট করেন জনি বেয়ারস্টোকে। প্রতিপক্ষ তুলে ফেলে ১ উইকেটে ১৩০ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজেরও এক উইকেটের বেশি নিতে পারেনি। চতুর্থ ওভারে ক্রিস গেইলকে ফিরিয়ে একমাত্র আনন্দের উপলক্ষ এনে দেন সাইফ উদ্দিন। ক্যারিবিয়ানদের ১ উইকেটে ৮৬ রান তোলা তাতে ঠেকানো যায়নি।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তো প্রথম ২০ ওভারে কোনো উইকেটই নিতে পারেনি বাংলাদেশ! স্কোরকার্ডে উঠে যায় বিনা উইকেটে ১১৭ রান। আফগানিস্তানের বিপক্ষে একাদশ ওভারে রহমত শাহকে সাকিবের আউট করা একমাত্র সাফল্য। ওরা তোলে ৭৭ রান। ভারতের বিপক্ষে আবার উইকেট না নেওয়ার ব্যর্থতা; বিনা উইকেটে ১২২ রানের তাচ্ছিল্য। পাকিস্তানের বিপক্ষে অতটা হয়নি। অষ্টম ওভারে ফখর জামানকে ফিরিয়ে সাইফই একবার আনেন খুশির মুহূর্ত। প্রতিপক্ষের ২০ ওভারে ১ উইকেটে ৯৪ রান তোলায় অবশ্য সে উচ্ছ্বাস আর থাকে না।

খেয়াল করে দেখুন, সর্বশেষ এই ১১ ওয়ানডের মধ্যে প্রথম ২০ ওভারে দুটির বেশি উইকেট বাংলাদেশ নিতে পারেননি একবারও। দুটি করে উইকেট নিয়েছে মোটে তিন ম্যাচে—বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে। একটি করে উইকেট ছয় খেলায়—বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের শেষ দুই ওয়ানডেতে। বাকি দুই ম্যাচ, অর্থাৎ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে প্রথম ২০ ওভারে কোনো উইকেটই নিতে পারেনি।

পরিসংখ্যানের বিদ্রূপ এখানেই শেষ নয়। প্রথম ২০ ওভারে বাংলাদেশ রানও তো দিয়েছে ‘উদার জমিদারের’ মতো। ১১ ওয়ানডের মধ্যে সাতটিতে এক শর ওপর রান তোলে প্রতিপক্ষ। সর্বোচ্চ এই সিরিজের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ১৩৫। এ ছাড়া বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা ১০৫, নিউজিল্যান্ড ১১০, ইংল্যান্ড ১৩০, অস্ট্রেলিয়া ১১৭, ভারত ১২২ এবং সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কা ১২৫ রান তোলে। এক শর নিচের চারটি ইনিংসের মধ্যে কাল তৃতীয় ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কার ৯৫, বিশ্বকাপের পাকিস্তানের ৯৪, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮৬, আফগানিস্তান ৭৭।

রেকর্ডের তীর্যক শ্লেষ রয়েছে আরো। এই ১১ ওয়ানডের কোনোটিতে প্রথম ২০ ওভারে পাঁচ বোলারের কম ব্যবহার করাননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, ভারতের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কাল সিরিজের শেষ ম্যাচ—এই পাঁচ খেলায় তো ছয়জন করে বোলারের হাতে বল তুলে দিতে হয়েছে। স্থিতি নেই নতুন বলের জুটিতেও। সর্বশেষ ১১ ম্যাচে নতুন বলে বাংলাদেশের আট জুটি। তাঁদের মধ্যে মাশরাফি-সাইফ, মাশরাফি-মুস্তাফিজ ও এ সিরিজে শফিউল-মিরাজ জুটি দুইবার করে। একবার করে মুস্তাফিজ-মিরাজ, মাশরাফি-মিরাজ, সাকিব-মাশরাফি, মিরাজ-সাইফ, শফিউল-রুবেল জুটি।

অদৃশ্যের তোতা পাখি তাই তারস্বরে আরেকটি বুলি আওড়াতে পারে— ‘ওয়ানডেতে বাংলাদেশের মতো এমন বাজে বোলিং ক্রিকেট-পৃথিবীর আর কোনো দেশের নেই।’ প্রথম ২০ ওভারের তো অবশ্যই, পুরো ৫০ ওভারেরও নয় কি?

মন্তব্য