kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

মালিঙ্গার বিদায়ের দিনে মাশরাফি ভাবনা

২৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মালিঙ্গার বিদায়ের দিনে মাশরাফি ভাবনা

হয় লাসিথ, নয় স্লিংগা। হয় মালি, নয় মালিঙ্গা। শ্রীলঙ্কায় আসার পর থেকেই তো মিছিলের স্লোগানের মতো শুনছি এক ধ্বনি। একই প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের ফল নিয়ে তাদের থোড়াই কেয়ার। কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের পদত্যাগ বা বিতাড়ন নিয়েও আগ্রহ নেই তেমন। সবাই বুঁদ বরং এক কিংবদন্তির বিদায় আয়োজন বর্ণিল করে তোলার। রঙিনতায় ভরিয়ে দেওয়ার।

ভালোবাসার সেই রাজপুত্রকে কাল কী আবেগমাখা বিদায়ই না জানাল শ্রীলঙ্কা! ব্যাটিংয়ে যখন নামেন, সব সমর্থকের মোবাইলের আলো জ্বলে ওঠে। যেন গ্যালারিতে ফুটে ওঠে তারার ফুল। ডাগআউট থেকে ক্রিজ পর্যন্ত জাতীয় পতাকা নিয়ে একজন তাঁর সঙ্গী। তাঁর প্রতিটি রানে আনন্দ-কল্লোল। তাঁর প্রতিটি বলে উল্লাসের হিল্লোল। এমন বিদায়ই তো প্রাপ্য এমন কিংবদন্তির!

আর এখানেই মিশেমিশে একাকার হয়ে যান লাসিথ মালিঙ্গা ও মাশরাফি বিন মর্তুজা। মোহনায় মিলে যায় ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের দুই বিপরীতমুখী স্রোত। আনন্দ আর নিষ্ঠুরতার। উল্লাস ও নির্মমতার। উচ্ছ্বাস ও নির্জনতার। যে রাজসিক বিদায় কাল শ্রীলঙ্কানরা দিল মালিঙ্গাকে, বাংলাদেশ কি তা দেবে মাশরাফিকে? এমন আন্তর্জাতিক ম্যাচে; এমন ভরা গ্যালারির সামনে? নাকি কোনো একদিন শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের বিষণ্ন দুপুরকে আরো বিষাদাক্রান্ত করে তুলবে একটি সংবাদ সম্মেলন? অথবা তীব্র অভিমানী এক প্রেমপত্রের প্রতিচ্ছবি হয়ে হাজির হবে একটি বিবৃতি? মাশরাফির বিদায়ের! মাশরাফির অবসরের!

অমন আশঙ্কা যে অমূলক নয় একেবারে!

২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচ। তা জিতে সিরিজ জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। অধিনায়ক সেদিনও পান দুই উইকেট। এরপর তো বিশ্বকাপের আগে দেশের মাটিতে আর কোনো ওয়ানডে নেই। তাহলে কি বাংলাদেশে সেটিই শেষ ম্যাচ মাশরাফির। অবসর নিয়ে গুনগুনিয়ে ওঠা গুঞ্জন সেদিন কিছুকালের জন্য থামিয়ে দেন তিনি, ‘এখনো অবসর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, বিশ্বকাপের সময়ও নেব না। ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে আপনাদের সবার সামনে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাব।’

বিশ্বকাপ অভিযান শেষে ৭ জুলাই দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ। এরপর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে মাশরাফি যান বেশ কদিন। গল্পে-আড্ডায় কাটান কত সকাল-দুপুর! অনুশীলনে নিজেকে প্রস্তুত করেন শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য। কিন্তু নিজের অবসর নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সাত মাস আগে, তা পূরণ করেননি। করার মতো অবস্থায় ছিলেন না বলেই হয়তো!

মাশরাফির জীবন আসলে বদলে দিয়েছে দুটি ঘটনা। প্রথমত, গেল বছরের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে সংসদ সদস্য পদের জন্য লড়াই করা। সিলেটের সেই ম্যাচ শেষে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে নেমেছেন; সপ্তাহ দুয়েক পরের নির্বাচনে জিতেছেনও। কিন্তু আপামর বাঙালির ভালোবাসার যে মাশরাফি ছিলেন, হারিয়েছেন সেই সিংহাসন। ‘প্রখর রাজনৈতিক সচেতন’ বাঙালিদের বড় একটি অংশের কাছে ক্রিকেটার থেকে ‘একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি’ হয়ে যায় তাঁর মুখ্য পরিচয়। সে দলের বিরোধীদের কাছে চোখের পলকে হয়ে যান চোখের বালি। আর দ্বিতীয় ঘটনা, বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স। টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে অধিনায়ক নেন মোটে এক উইকেট। গড় ৩৬১; ইকোনমি ৬.৪৪। তাতেই যেন মাশরাফিকে ঠেলে-ধাক্কা দিয়ে অবসরে পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় জনমানসে।

কী আশ্চর্য, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও যেন সায় রয়েছে তাতে!

কিভাবে? বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে অবসর নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর কথা ছিল মাশরাফির। জানাননি। কিন্তু ওই সময় ইংল্যান্ডে বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান তো একরকম লিখে দেন ওয়ানডে অধিনায়কের এপিটাফ। সংসদ সদস্যদের বিশ্বকাপের প্রীতি টুর্নামেন্টের সময় বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে বলেন তিনি, ‘বাংলাদেশের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ আয়োজন করে মাশরাফিকে বিদায় দেবে বোর্ড।’ প্রশ্ন হলো, এ সিদ্ধান্ত কি অধিনায়কের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছে বোর্ড? নাকি নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে মাশরাফির ওপর? যদি দুই পক্ষের সম্মতিতে এমন সিদ্ধান্ত হবে, তাহলে নিজের অবসর নিয়ে খোলাখুলি কিছু বলছেন না কেন মাশরাফি?

বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য। দেশ ছাড়ার আগের দিন আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনেও আসেন অধিনায়ক হিসেবে। সেখানে অবসর নিয়ে আরেক দফা প্রশ্ন। উত্তরে মাশরাফির মনোভাব পরিষ্কার হয়নি, ‘আমার অবসর হয়তো-বা আপনাদের কাছে বড় খবর। তবে আমার কাছে তা নয়; এই খেলাটা ছাড়াটা অনেক কিছু। সুতরাং অবশ্যই আমাকে একটু সময় নিয়ে চিন্তা করতে হবে। বিশ্বকাপের মতোই বলছি, শ্রীলঙ্কা যাচ্ছি শেষবারের মতো। সেখান থেকে আসার পর হয়তো একটু সময় পাব; অবসর বিষয়ে সময় নিয়ে চিন্তা করব। যেটা বললাম, আপনাদের কাছে এটি হয়তো-বা একটু লেখালিখি করলেই ব্যাপারটি শেষ; আমার কাছে তা না।’ তবে গণমাধ্যমকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি তিনি। তারা যে নিজেদের কাজ করছে, তা-ও বোঝেন মাশরাফি, ‘এ নিয়ে আমি বিব্রত কিংবা হতাশ না। কারণ প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাজ করবে—এটাই স্বাভাবিক। মহেন্দ্র সিং ধোনির কথা বলি। তাঁর ধারেকাছেরও ক্রিকেটার নই আমি। তবু প্রতিটি সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে অবসর নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। আমি তাই ব্যাপারটি পেশাদার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি। একজন খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের সেরা পারফরম করতে পারিনি। অধিনায়ক হিসেবেও পারিনি সেরাটা দিতে। সবার প্রত্যাশা ছিল দল সেমিফাইনালে যাবে। সেখানেও ব্যর্থ। আমার অবসর নিয়ে প্রশ্ন তাই আসতেই পারে।’

ওই সংবাদ সম্মেলন শেষে শ্রীলঙ্কা আসার আগের শেষ অনুশীলন করতে যান মাশরাফি। সেখানেই পড়েন ইনজুরিতে। ডান পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে ‘গ্রেড ওয়ান টিয়ার’-এর কারণে ছিটকে পড়েন সফর থেকে। কিন্তু বিশ্বকাপে তো বাঁ পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে ‘গ্রেড টু টিয়ার’ নিয়েও খেলেছেন। তাহলে এর চেয়ে কম গুরুতর ইনজুরি নিয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে আসতে পারলেন না কেন? প্রশ্নটা মাশরাফির নিজেরও। যে কারণে ক্রিকেট-ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বলেছেন, ‘হয়তো প্রথম ওয়ানডে খেলতে পারতাম না। কিন্তু শেষ দুটি ম্যাচে তো পারতাম।’ তাই যদি হবে, তাহলে শ্রীলঙ্কা সফরের দল থেকে আসলে মাশরাফিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট বাস্তবতায় সে বাদ দেওয়ার এখতিয়ার ফিজিওর নেই; নির্বাচকদের তো আরো নেই।

মাশরাফিকে ‘বাদ’ দিয়েছে তাহলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডই!

সেই ক্রিকেট বোর্ড তাঁর জন্য বিদায়ী আয়োজন করবে এই মালিঙ্গার মতো! বিশ্বাস করাটা একটু কঠিন বৈকি। তা আরো কঠিন করে তুলেছে বাংলাদেশের নিকট ভবিষ্যতের ক্রিকেটসূচি। আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ হওয়ার কথা সেপ্টেম্বরে। নভেম্বরে ভারত সফরে গিয়ে দুই টেস্ট ও তিন টি-টোয়েন্টি খেলবে দল। আগামী বছরের মার্চে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এশিয়া একাদশ ও বিশ্ব একাদশের মধ্যে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ আয়োজন করার ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি। তাহলে সে সময় পর্যন্ত অন্তত কোনো ওয়ানডের সূচি নেই বাংলাদেশের। দেশে না, দেশের বাইরেও না। মাশরাফির বিদায়ী ম্যাচের আয়োজন তাহলে কখন, কোন দলের বিপক্ষে করবে বিসিবি?

আদৌ করবে তো?

না করলে কালকের মালিঙ্গার বীরের বিদায় আবার হাহাকার নিয়ে হাজির হবে আমাদের সামনে। এই ফাস্ট বোলার শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের অনেক নায়কের একজন; মহানায়ক কিছুতেই নয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটে মাশরাফি নিঃসন্দেহে মহানায়ক। পারফরম্যান্স দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে বেশি প্রভাব দিয়ে। উইকেট দিয়ে যতটা না, তার চেয়ে বেশি সামগ্রিকতা দিয়ে। সেই মহানায়কের মহাপ্রস্থান না হলে অকৃতজ্ঞতা ও অনুশোচনার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকতে হবে বাংলাদেশকে।

আর মাশরাফি বিন মর্তুজার আহত আশা এক দীর্ঘশ্বাসের পোস্টার হয়ে ঝুলে রইবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওপর। অ-নে নে-নে-ক কাল। হয়তো-বা অন্ততকাল!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা