kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

শতরানের জুটিতে ইংলিশ উৎসব

ইংল্যান্ড স্বাগতিক দল তো!

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইংল্যান্ড স্বাগতিক দল তো!

‘টিকিট লাগবে। টিকিট। কম দামে দিয়ে দেব’—শুনতে শুনতে ঢুকলাম এজবাস্টনে।

সাদা চামড়ার মানুষজনই টিকিট বিক্রি করছে। তা এরা করেও। ইংল্যান্ডে ক্রিকেট কভারের অভিজ্ঞতায় দেখেছি সাদারাই এখানকার কালোবাজারি। ওরা ক্রিকেট দেখুক না দেখুক টিকিট কিনে রাখে, এরপর সময়মতো বেচে দিয়ে দু-পয়সা কামায়। এমনি এক টুপাইসমুখী একজনকে ধরলাম গেটের কাছে।

‘লাভ কেমন হচ্ছে?’

(ক্ষুব্ধ এবং বিরক্ত) ‘দেখতেই তো পাচ্ছ। সেই সকাল থেকে দাঁড়িয়ে একটি মাত্র টিকিট বিক্রি করেছি। এভাবে চলে?’

‘কী হলে ভালো চলত?’

‘সব সর্বনাশ করে দিয়ে গেল ভারত। নিজেদেরও। আমাদেরও।’

‘ভারত আবার এখানে কী করল?’

‘ওদেরই তো এই সেমিফাইনালটা খেলার কথা ছিল। তাহলে আমার কী লাভ হতো। মাঝখান দিয়ে অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে সব ঝামেলা পাকিয়ে দিল।’

মধ্যবয়সী মানুষটি মাথা নাড়তে থাকেন। বিড়বিড় চলে। ভারত না অস্ট্রেলিয়া কাকে অভিশাপ ঠিক বুঝতে পারি না।

আরো একটি সম্ভাব্য জটলাকে দেখে আশা নিয়ে তিনি এগোন। আমি এগোই ভাবতে ভাবতে। ভারত বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে আগের দিন। কিন্তু চলে গিয়েও কী প্রবলভাবে ওরা আছে। আর ইংল্যান্ড এখনো বিশ্বকাপে টিকে আছে। কিন্তু থেকেও যেন নেই। নিজের মাঠে খেলার দিনে যারা টিকিটের দাম বাড়াতে পারে না তাদের তো থাকা আর না থাকা একই কথা। স্বাগতিক হয়েও ইংল্যান্ড যেন নিজেদের মাঠে খেলছে না। যখন সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আসা ভারত কিংবা আরেকটু বড় করে দেখলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঠিকই এখানে প্রায় স্বাগতিকের সুবিধা পেয়ে চলছে।

ইংল্যান্ডে প্রথমে এলে সবাই এই ধাক্কাটা খায়। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে পত্রিকা হাতে নিয়ে। ফুটবল তো আছেই, এমনকি এই সময়ের বার্ষিক আয়োজন উইম্বলডন ফুটবলকেও ছাপিয়ে যায় কখনো কখনো। ক্রিকেটের হাল তো এমন যে মাঝেমধ্যে পত্রিকাতেই খুঁজে পাওয়া যায় না। এবার যেমন অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড মুখোমুখি হওয়ার পর দেখছি গার্ডিয়ান-টেলিগ্রাফ পত্রিকার মূল খবরে ক্রিকেট উঠে এসেছে। বিশ্বকাপের স্বাভাবিক অনাগ্রহ ছাপিয়ে এমন আগ্রহ যে কাল সকালের ট্যাবলয়েড-ব্রডশিট সবগুলোতে একাধিক স্টোরি। ভারত বিদায় হওয়াতে আমরা বাংলাদেশি সাংবাদিকরা ধরে নিয়েছিলাম প্রেসবক্সের ভিড়টা কমবে। কিন্তু সকালে মিডিয়া বক্সে ঢুকতে গিয়ে দেখি, ওভার ফ্লোতেই জায়গা। সাময়িক টেবিল বিছিয়ে অংশ না নেওয়া দলগুলোর সাংবাদিকদের জন্য বসার ব্যবস্থা, যেখানে বৃষ্টি হলেই ল্যাপটপ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। সেই দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত কয়েকজন দেশি সাংবাদিক বিরক্ত হয়ে ম্যাচ ডে’তে না আসারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কালকের ভারতবহির্ভূত বিশ্বকাপের প্রথম দিনে তাই আশা ছিল প্রেসবক্স খাঁ খাঁ করবে। কিসের কী! অনেক ইংলিশ সাংবাদিক। আর তাঁদের অনেকেরই আগ্রহ ক্রিকেটের চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে। ম্যাচকে পরিপ্রেক্ষিত ধরে সেই বিষয়ে লেখালেখি করবেন। এত কিছু বলার মানে, মিডিয়ার কাছে ঠিক ক্রিকেট জাগেনি। জেগেছে দেশবোধ। প্রবল অস্ট্রেলিয়াবিরোধিতা। বিশ্বকাপ ক্রিকেট এখানেও দ্বিতীয় স্থানে। তাই স্বাগতিক দেশের সেমিফাইনাল হলেও কালোবাজারে টিকিটের দাম বাড়ে না। ইংল্যান্ডকে নিজ মাঠে খেলতে হয় বিদেশির মতো।

এখানেই ভারতের সমীকরণ। এটা শিশু ক্লাসের পাঠ্য যে ক্রিকেট এখন ভারতমুখী। ক্ষেত্রবিশেষে ভারতসর্বস্ব। আইসিসির আইন-কানুনও এমন ভারতের দিকে হেলে থাকে যে পুরো ক্রিকেট দুনিয়া আইসিসি আর ভারতকে দুই ভাই-ই মনে করে। এক ভাই খেলে আরেক ভাই খেলায়। আর এই দুইয়ের ভ্রাতৃত্ব এমন বজায় থাকে পুরো প্রক্রিয়ায় যে বাকিরা মনে করে নিজেদের সত্ভাই। বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটমুখী বলে আওয়াজের তীব্রতাটা এখানে স্পষ্ট। অন্যদের জনশক্তি নেই বলে আওয়াজ ওঠে না। তবে বঞ্চনার দুঃখটা অনুচ্চারে টের পাওয়া যায়। আর কোথাও ঠিক টের পাওয়া যায় না। যেমন ইংল্যান্ড। সেদিন এক ইংলিশ ক্রিকেটপ্রেমী ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলেছেন বলে ম্যানইউ-সিটি-লিভারপুল এসব ছাপিয়ে তিনি মজে আছেন ক্রিকেটে। তাঁর নিশ্চয়ই এটা দেখে খারাপ লাগে যে নিজের দেশেও সেই অর্থে ইংলিশ দলের প্রতি তীব্র ভালোবাসার প্রকাশ নেই। ভদ্রলোক একটু ভাবলেন, ‘আমরা তো সমর্থন করি।’

‘কিন্তু তরুণ প্রজন্ম তো সেভাবে মাঠে আসে না। আর এই সুযোগে ইংল্যান্ডকে মনে হয় অন্য দেশের মাঠে খেলছে।’

‘ভারতের সঙ্গে ম্যাচে এমন হয়।’

‘তোমাদের খারাপ লাগে না?’

‘না। আমার খারাপ লাগে না। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ সমর্থকদের উন্মাদনাটা বরং আমি উপভোগ করি। আফসোস হয়, আমাদের দেশে এমন উন্মাদনা থাকলে ভালো হতো। কিন্তু আমি ইংলিশ এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে আমি ক্রিকেটপ্রেমী। ক্রিকেট নিয়ে যেকোনো উন্মাদনা আমাকে আনন্দ দেয়।’

কথার মধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়। আমি ইংলিশ আবার ক্রিকেটভক্তও। সত্যি বললে, ইংলিশরা এভাবেই একরকম আপস ফর্মুলার পক্ষে গেছে। ইংল্যান্ডের মানুষ যখন ক্রিকেটকে অত ভালোবাসে না, তখন যারা ভালোবাসছে ওদের ভালোবাসাকেই মূল্য দিই। তাই ইংল্যান্ড-ভারত ম্যাচে ভারতের বেশি সমর্থন থাকা নিয়ে রক্ষণশীল পত্রিকাগুলো যতই সম্পাদকীয় লিখুক তাতে ক্রিকেটপ্রেমী ইংলিশদের কিছু যায় আসে না। আর যারা ক্রিকেটপ্রেমী না তারা তো এসব নিয়ে অত ভাবেও না।

ভাবে। নাচে। লাফায় পৃথিবীর একটা অংশের মানুষই। আমাদের উপমহাদেশ। তাতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান শরিক থাকলেও ভারতই পুরোভাগে থাকে, ভারতীয় আবেগ হিসেবেই এখানে চিত্রিত হয়। আর এই দেশগুলো যখন নিজেদের মধ্যে এখানে মুখোমুখি হয় তখনই যা জমজমাট উত্তেজনা। দেশ যেমন, ইংল্যান্ডেও তেমন। ইংল্যান্ড মাঠ ছেড়ে দিয়ে এই দৃশ্যের দর্শক। আর ক্ষুব্ধ নয়। মুগ্ধ দর্শক। ক্রিকেটকে প্রায় ভুলে এর চেতনাকে এভাবেই উঁচিয়ে ধরে বসে ওরা।

আবার এই উন্মাদনাই আইসিসিকে ঠেলে দেয় ভারতের দিকে। ব্যাবসায়িক চিন্তা বলে আমরা সংকীর্ণ করে ফেলি কিন্তু সত্যি বললে পৃথিবীর এই অংশে যে নিরাসক্তি ক্রিকেটকে নিয়ে তাতে ভারত ক্রিকেট ধারণ না করলে খেলা হিসেবে টেকাই মুশকিল। সঞ্জয় মাঞ্জরেকার অবশ্য বলছিলেন, ‘আইসিসি নয়, আসলে ভারতের দিকে আছে টেলিভিশনগুলো। টেলিভিশনে ভারতের খেলা বেশি দেখায় কারণ দর্শক বেশি। বিজ্ঞাপনদাতা বেশি। আর তাই মনে হয় ক্রিকেট মানেই ভারত।’ একভাবে দেখলে বোধহয় ব্যাপারটা ঠিক। যে চ্যানেলগুলো খেলার স্বত্ব কেনে তাদের মূল বাজার ভারত। তাই ভারত-ভারত রব ওঠায়। ভাষ্যকাররাও ভারতীয় দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে গিয়ে বিনা পাসপোর্টের ভারতীয় নাগরিক। দেখতে এমন বিচ্ছিরি লাগে। আর তাই আইসিসি আর ভারতকে ঘিরে ঘটনা যতটা রটনা তার চেয়ে বেশিই বোধহয়।

আসলে ক্রিকেটের প্রথম বিশ্বের নিরাসক্তিই খেলাটা ভারতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এবং তাতে আমরা ক্ষুব্ধ যদিও কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসলে বাংলাদেশেরও লাভ তাতে।

কারণ, ভারতের পরই তো আমরা। বড় দেশ, বড় অর্থনীতি, ইংল্যান্ডে পুরনো অভিবাসী গোষ্ঠী বলে পুরো আবেগটা অনূদিত হচ্ছে ভারতীয় আবেগ হিসেবে। কিন্তু এবার বাংলাদেশও লড়ল বেশ।

সময় যাবে। বাংলাদেশ এগোবে। এখানকার সম্প্রদায়ের পরের প্রজন্ম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ভারতীয় ছাতা ছিঁড়ে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড তৈরির কাজটা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে।

কে জানে, পরের বিশ্বকাপ যখন এখানে হবে, দুই-আড়াই দশক পর, তখন হয়তো কোনো এই ইংলিশ প্রৌঢ়ের আফসোস শুনব, ক্রিকেটটা বাংলাদেশের খেলা হয়ে গেল।

‘তোমাদের আফসোস হয়?’

‘হয় তো। ইস! যদি আমরা বাংলাদেশের মতো হতে পারতাম।’

মন্তব্য