kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

লাল রঙের স্বর্গে

মোস্তফা মামুন ►ম্যানচেস্টার থেকে

১০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



লাল রঙের স্বর্গে

ডিরেক্টর বক্সের ৮টা সিট বরাদ্দ অ্যালেক্স ফার্গুসনের জন্য। ববি চার্লটনের জন্য চারটা।

হিসাবটা ঠিক মেলে না। বা মেলার নয়।

রহস্য করে গাইড অ্যাডাম বলে, ‘বল তো ফার্গুসনের জন্য আটটা আর চার্লটনের জন্য চারটা। কেন?’

এসব ক্ষেত্রে ক্লাসের পড়ুয়া ফার্স্ট বয়ের মতো কেউ কেউ উত্তর দিতে তৈরি হন। কিন্তু সঠিক উত্তর হয় না কোনোটাই।

অ্যাডাম হাসতে হাসতে বলল, ‘ফার্গুসন চাইলে এখানে ৩৮টা সিটও নিতে পারেন।’

‘৩৮টা?’

‘হ্যাঁ, যিনি ৩৮টা ট্রফি জিতিয়েছেন, তাঁকে তো ৩৮টা সিটই দেওয়া যেতে পারে। এটা তো তাঁর অর্জনের তুলনায় সামান্য।’

পরশু সন্ধ্যায় ‘থিয়েটার অব ড্রিমস’ বা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাঠ ঘুরতে গিয়ে যা পাওয়া গেল, তাতে মনে হলো স্যার অ্যালেক্সে এই প্রজন্ম এত বেশি মজে যে সেখানে বিখ্যাত ট্রিনিটি, জর্জ বেস্ট-ডেনিস ল-ববি চার্লটন, কিংবা কিংবদন্তির ম্যাট বুসবি সবাই ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রজন্মের কাছে ফ্যাকাশে হলেও ম্যানইউর রূপকথায় তো এঁরা অমলিন। আছেন তাই সশরীরে। সশরীরে বলতে ঢোকার মুখেই ট্রিনিটির একটা মূর্তি আপনাকে স্বাগত জানাবে। একটু এগোলেই সামনে স্যুট-হ্যাট পরিহিত ম্যাট বুসবি। ইতিহাস আর বর্তমান, বাস্তবতা আর কিংবদন্তি এভাবেই একাকার হয়ে আছে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লাল রং—এগুলো এখন প্রতীক। কিন্তু সত্যি বললে এই নাম আর রঙেরও কী যেন একটা মাহাত্ম্য আছে আজকের উত্থানে। ল্যাঙ্কাশায়ার আর ইয়র্কশায়ারের রেলওয়ের কিছু কর্মী যখন উনিশ শতকের শেষ দিকে ক্লাবটা তৈরি করেন, তখন নামটা ছিল নিউটন হিথ। এমন কিছু পারফরম্যান্স ছিল না। দেনার দায়ে তো ডুবে যাওয়ার অবস্থা। তখন স্থানীয় একজন মদ ব্যবসায়ী আসেন রক্ষা করতে। তখন দরকার দেখা দেয় নতুন স্টেডিয়াম তৈরিরও। তৈরি হয় আজকের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের আদি মাঠ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যেটা প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ধুলা থেকেই যেমন দালান তৈরি হয়, সেভাবেই পুনরুজ্জীবিত হয়ে গেছে আজকের এই রূপের ওল্ড ট্র্যাফোর্ড; আর সেখানেও ইতিহাসের ধারা রক্ষা করা হয়েছে ঐতিহ্যের প্রতি আবেশে। একটা অংশ এর মধ্যেও কিভাবে টিকে ছিল। সেটা হুবহু রাখা হয়েছে। ডাগ আউটের যে জায়গাটায় বদলি খেলোয়াড়-কোচরা বসেন এর পেছনটাই হচ্ছে আদি রূপের ওল্ড ট্র্যাফোর্ড। যা বলছিলাম, নতুন মাঠ তৈরির পর সবার মনে হলো ক্লাবের নামটাও বদলানো উচিত। কারণ, শুরুতে যে জায়গার নামে ক্লাবের নামটা তৈরি হয়েছিল সেখান থেকে তো তারা সরে এসেছে অনেক দূরে। ট্র্যাফোর্ড ফুটবল ক্লাবও হতে পারত বা হতে পারত অন্য যেকোনো কিছু। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যে হলো এর কারণ তখন তাদের মনে হয়েছিল মাঠটা আবার সরাতে হতে পারে। দেনার দায়ে ডুবে গেলে তখন অন্য জায়গায় মাঠ নিয়ে গেলে আবার নাম বদলানোর যন্ত্রণা। তার চেয়ে নিরাপদ নাম এটাই থাকুক। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ক্লাব আর মাঠ যেখানেই স্থানান্তর হোক বৃহত্তর ম্যানচেস্টারের মধ্যেই থাকবে। স্রেফ আত্মরক্ষার সুবিধা থেকে যে নামের জন্ম সেই নামটাই মহিমান্বিত হয়ে গেল—ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড মানে পুরো ম্যানচেস্টার, আর নামের গুণেই কিনা পুরো শহর ক্লাবটাকে নিজেদের মনে করে নিল। মানুষের হৃদয়ে কোনো ক্লাব এভাবে ঢুকে গেলে প্রকৃতিরও বোধ হয় কিছু করতে ইচ্ছা করে। এ নাম ধারণের পরই ম্যানইউ অন্য চেহারায়। সাফল্য আসতে থাকে। এখন টাকা-পয়সাও মিলতে থাকল। এবং এসব কিছুকে পূর্ণতা দিতে এলেন তিনি। ম্যাট বুসবি নামের এক স্কটিশ, যাঁর উচ্চাঙ্গের বোধের মধ্য দিয়েই তৈরি এ ক্লাবের চারিত্রিক ধরন। বুসবি মন দিলেন তরুণ প্রতিভা খোঁজার দিকে। যেন খনি থেকে বের হতে থাকল অপরিশোধিত সব ফুটবলাররা। জন্ম হলো বুসবি বেবসের। এভাবেই চলে যদি ওরা পৌঁছে যেত তীরে, তাহলেই দারুণ গল্প হয়। কিন্তু তাতে ঠিক বাঁক থাকে না। একঘেয়ে সেই গল্প তাই মিউনিখ ট্র্যাজেডিতে পৌঁছাল অন্য মাত্রায়। ইউরোপিয়ান স্বপ্নে বিভোর দলটা রেডস্টার বেলগ্রেডের সঙ্গে ম্যাচ খেলে ফিরছিল। মিউনিখে জ্বালানি নিতে গিয়ে ট্র্যাজেডি। বিমান দুর্ঘটনায় প্রায় শেষ হয়ে গেল দলটা। বুসবি বেঁচে রইলেন। আবার শুরু করলেন। ১০ বছর পর শেষে ইউরোপিয়ান কাপ জয়ে পরিণতি।

ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে গেলে শুরুতেই সেই শোকস্তব্ধতা ভর করবে মনে। মিউনিখ টানেল যেন টানবে দুঃসহ স্মৃতির দিকে। কিন্তু সেই স্মৃতি থেকেই যখন জন্ম, তখন সেটা শোকভাবে মুহ্য করে রাখতে পারে কি! অদূরেই যে তিনি দাঁড়িয়ে অক্ষয় হয়ে। ম্যাট বুসবির সেই মূর্তি যেন জানায়, কোনো কিছুই শেষ নয়। প্রতিটির শেষ আসলে নতুন শুরু। যেমন করে রাতের অন্ধকার শেষে সকালের আলো, তেমনি এখানে কালোর হতাশা ছাপিয়ে লালের উল্লাসী কল্লোল। সেই লাল রং এমন অধিকার করে রেখেছে পুরো পরিবেশ যে বাস্তবিক লাল ছাপিয়ে এক অতিপ্রাকৃত লাল জগতের দেখাও যেন মেলে। যেখানে আলো-অন্ধকার, দিন-রাত সব কিছু লালে লাল।

২৭ পাউন্ডের ওল্ড ট্র্যাফোর্ড ট্যুর যেখান থেকে শুরু হয়, সেখানে যথারীতি সব লাল। ফ্লোর থেকে শুরু করে পাশের দেয়াল। অ্যাডাম প্রথমেই বলে, ‘চারদিকে এত লাল যে এখান থেকে হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ। আমার পেছনে চলো নইলে হারিয়ে যাবে।’

আগতদের খুব চিন্তিত দেখা যায় না। লাল রাজ্যে হারিয়ে যেতেই যে তাদের আসা।

অ্যাডাম অতীত বর্ণনা করতে করতে চলে ইতিহাসের খনি হয়ে। কেউ শোনে, কেউ শোনে না। ম্যানইউর ইতিহাস এত বর্ণাঢ্য আর প্রতিষ্ঠিত যে খুব না জানা কেউ নেই। তবু জানা জিনিস ঘরে বসে চর্চা করা আর ইতিহাসের সেই দেয়াল ধরে রোমন্থন করা তো এক নয়। চলতে চলতে মনে হচ্ছিল এ টানেল দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে বুসবি হয়তো উদাসী হয়ে যেতেন গভীর ট্যাকটিক্যাল চিন্তায়। কিংবা বেস্ট-ল-চার্লটনের ত্রিফলা হয়তো কাউকে বিদ্ধ করার শেষ ছকটা কষে নিত।

ইতিহাসের চাকা ধরে এগোতে থাকি। প্রেস কনফারেন্স রুম, প্লেয়ার্স লাউঞ্জ সব কিছুই ঘোর বাস্তবতা। সাম্প্রতিক অতীতের কথাই বেশি আসে অ্যাডামের গল্পে। ভিডিওতে নিকট অতীতই বেশি স্পষ্ট। তবু এর মধ্যে যখন সাদা-কালো আমলের ছবি আসে, সেটাকেই বেশি সরব আর তীব্র মনে হয়। তখন আবার একটা অঙ্কের হিসাবে কানটা খাড়া হয়। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে একটা সিজন টিকিটের সর্বোচ্চ দাম নাকি মাত্র ৯৫০ পাউন্ড। সবচেয়ে কমটা মাত্র ৫৩০ পাউন্ড। হিসাব করে দেখি যা ভেবেছিলাম এর চেয়ে অনেক কম। যে ব্যাখ্যা মেলে তাতে মনে হয়, এই জনও এ ক্লাবটা নিজেদের আলাদা দাবি করতে পারে। ‘দেখো প্রতিবছর টিভি ডিলে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড পাই আমরা। সমর্থকদের কাছে ১০০-২০০ পাউন্ড বাড়ালে কত আর বেশি পাওয়া যাবে। তাই সমর্থকদের ওপর চাপ দিতে চাই না।’ বটে। সমর্থকপ্রেমী না হলে আসলে সফল হয়তো হওয়া যায় না, বড় হওয়া যায় না। তবে সাধারণ সমর্থকদের জন্য সমস্যাও আছে। ৭৫ হাজারের মধ্যে ৫৫ হাজারই মৌসুমি টিকিট। হাজার দশেক চলে যায় সৌজন্য টিকিটে। বাকি মাত্র ১০ হাজার সাধারণ দর্শকদের জন্য। ম্যানউই দুঃখ করে তাদের জন্য। কিন্তু উপায় তো নেই।

ভ্রমণ শেষ হয় একেবারে মাঠে এসে। মাঠের ঘাসের মাহাত্ম্যও উঠে আসে গাইডের বর্ণনায়। মলিন সাম্প্রতিকতাও কাঁটা হয়ে ফুটে বেরোয়। কিন্তু সাফল্য-ব্যর্থতা এগুলো তো শেষ পর্যন্ত হিসাবের বিষয়। কখনো হবে, কখনো হবে না। আর থিয়েটার অব ড্রিমস তো অঙ্ক কষার জায়গাও নয়। অঙ্ক করতে গেলেই আপনি ম্যানইউকে চিনলেন না।

চিনতে হলে আপনাকে রোমান্টিক মন নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে ইতিহাসের সরণি ধরে। তিল তিল তৈরির একাগ্রতা, ট্র্যাজেডির অন্ধকার, সাফল্যের উদ্ভাস, গৌরবের জয়ধ্বনি এসবই পাবেন সঙ্গী হিসেবে। শারীরিক বেড়া ডিঙিয়ে বুসবি-বেস্ট-চার্লটন-ফার্গুসনরাও হাজির।

আর তখন পুরো জগতে একটাই রং। লাল। ওহ হো! শুদ্ধিকরণ লাগছে। তখন আর সেটা যোগ-বিয়োগে আক্রান্ত জগৎ থাকে না। অনুভব-কল্পনা-স্বপ্ন আর সুন্দরের স্বর্গ।

মন্তব্য