kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

আমি পালিয়ে যাব না

৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমি পালিয়ে যাব না

প্রশ্ন : বিশ্বকাপে নিজের পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন করবেন কিভাবে?

তামিম ইকবাল : ব্যর্থ হয়েছি। সরাসরি বলি বা যেভাবেই বলি, আমি ব্যর্থ হয়েছি। দলের বা নিজের কাছে নিজের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো যে, আমি খারাপ ব্যাটিং করিনি। মোটামুটি করেছি কিন্তু বড় স্কোর পাইনি। শেষ ম্যাচটিতেই শুধু এক অঙ্কের ঘরে আউট হয়েছি। তার আগের চারটি স্কোর ৪৮, ৬২, ৩৬, ২২। এমন নয় যে ম্যাচের পর ম্যাচ ১, ২, ৫, ১০ রানে আউট হয়েছি। যতক্ষণ উইকেটে ছিলাম, নিয়ন্ত্রণ হারাইনি কখনোই। কিন্তু হুট করেই আউট হয়ে গেছি। এমন এমন সব আউট হয়েছি, যেগুলো বেশির ভাগ সময় আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তবে যত কথা বলি বা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করি, আমাকে মানতেই হবে যে ব্যর্থ হয়েছি। এখন পথ খুঁজতে হবে কিভাবে এখান থেকে বের হতে পারি। আগেও সেটি করতে পেরেছি। আবার না পারার কারণ নেই।

প্রশ্ন : ব্যর্থতার কারণ কি টেকনিক্যাল, নাকি দুর্ভাগ্যও কাজ করেছে?

তামিম : যখন একজন ব্যাটসম্যান রানে থাকে না, তখন এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আমার নিজের মনেও প্রশ্ন জেগেছিল যে কোথাও ভুল করছি নাকি। তখন ব্যাটিং কোচের সঙ্গে কথা বলেছি। নিল (ম্যাকেঞ্জি) বলেছেন, ‘সত্যিই যদি তোমার টেকনিক্যাল সমস্যা থাকত, তাহলে তোমাকে বলতে পারতাম, কাজ করতে পারতাম!’ কমবেশি যারা ক্রিকেট বোঝে, তারা সবাই অন্তত এটা বুঝতে পারবে, যে আউটগুলো আমি হয়েছি, এসবে টেকনিকের কোনো ভূমিকা নেই। এই টেকনিকেই ১২ বছর খেলছি। গত পাঁচ বছর খেলছি, প্রচুর রান করেছি। ইনসাইড এজ হয়ে কেউ তিনবার আউট হয়ে গেলে টেকনিকের কোনো ব্যাপার নেই। আরেকটি ব্যাপার হলো, ক্রিকেটে বাজে ফর্ম আসেই। কিছু অফ ফর্মের সময় দেখা যায় ব্যাটে-বলেই হচ্ছে না ঠিকমতো। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা ছিল না। বেশির ভাগ ইনিংসে ভালো খেলছিলাম। কিন্তু বড় হয়নি। আমি অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছি। তবে ব্যর্থ টুর্নামেন্টেও ৩০ গড় খারাপ নয়।

প্রশ্ন : মনস্তাত্ত্বিক কোনো ব্যাপার ছিল?

তামিম : হ্যাঁ ছিল। এটাই ছিল বড় কারণ। বিশেষ করে প্রথম তিন ম্যাচে আমি নিজের ওপর অনেক চাপ নিয়ে ফেলেছিলাম। শুধু মনে হচ্ছিল, ২০১৫ বিশ্বকাপের সময় যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটি যেন ফিরে না আসে। কিন্তু সেটিই তো হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের কারণে আপনাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। সেটি কিভাবে সামলেছেন?

তামিম : শুধু আমিই জানি, ২০১৫ সালে কিসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি শিক্ষা নিয়েছি। এবারের সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রল বা সমালোচনায় তাই আমার ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। মনে হয়, ভালোই সামেলেছি। শুধু একটি ব্যাপার নিয়েই ভয় পাচ্ছিলাম—পরিবার। পরিবারকে যেন হেনস্তা না হতে হয়। ২০১৫ সালে যখন এসব চলছিল, আমি নিজে ঠিকভাবে সামলাতে পারিনি। এবার সে রকম হয়নি।

প্রশ্ন : গত বিশ্বকাপ খারাপ কাটার পর পাকিস্তানের বিপক্ষে ঠিক পরবর্তী সিরিজেই দারুণভাবে রানে ফিরেছিলেন। এবারও তেমন কিছু হবে বলে আশাবাদী?

তামিম : খুব কঠিন। গত বিশ্বকাপের পর পাকিস্তান সিরিজটি আমার অসাধারণ কেটেছিল। এবার সামনে শ্রীলঙ্কা সিরিজ আছে। আমার চেষ্টা থাকবে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা। কখনো সফল হব, কখনো হব না। কিন্তু চেষ্টা করব। বিশ্বকাপটা স্রেফ ক্রিকেটের নিয়মেই আসা একটি সফর, একটি টুর্নামেন্ট—যেখানে ভালো করতে পারিনি। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বিশ্বকাপেই সেটি এলো। বিশ্বকাপেই এলো...। আমি নিজেও ভালো করতে চেয়েছিলাম প্রবলভাবে, এ জন্যই কষ্ট অনেক বেশি।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপেই খারাপ সময়টা এলো বলে তা মেনে নেওয়া নিশ্চয়ই কঠিন?

তামিম : কঠিন, অনেক কঠিন। এটা হজম করতে, কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। জানি না, বাড়ি ফেরার পর কী হবে। তবে নিজেকে আমি চিনি বলেই জানি, আমি পালিয়ে যাব না।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপের পরপরই তো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ। এর প্রস্তুতি...

তামিম : ২০১৫ বিশ্বকাপের পর পাকিস্তান সিরিজের আগে এক-দেড় মাসের মতো সময় ছিল। এবার সময় একটু কম। সত্যি বলতে, আমি দেশে ফেরার পর বুঝতে পারব কী করা উচিত। দু-একটি বিকল্প আছে। এমন হতে পারে ট্রেনিং করার জন্য দেশের বাইরে চলে গেলাম। হতে পারে দেশেই করলাম। সিদ্ধান্ত নিইনি। আমার পরিবারকেও অনেক দিন দেখি না। দেশে গিয়ে ওদের সঙ্গে একটু সময় কাটিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেব।

প্রশ্ন : ভারতের বিপক্ষে রোহিত শর্মার ক্যাচ মিস করার প্রভাব কতটা ছিল?

তামিম : আমার এসব প্রভাব ফেলে না। পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচেও যদি আমি আবার ক্যাচ মিস করতাম, তার পরদিনই আরেকটি খেলা থাকত, ওই বোলার আমাকেই ফিল্ডিংয়ে চাইবে ওই পজিশনে। সেই আত্মবিশ্বাস আমার আছে। মুস্তাফিজের বলে আমি রোহিতের ক্যাচটি ছেড়েছিলাম। হেঁটে যাওয়ার সময় মুস্তাফিজ আমাকে বলেছিল, ‘ভাই, আপনি আমার বোলিংয়ে এত দারুণ সব ক্যাচ নিয়েছেন, আপনি মিস করলে আমার কষ্ট লাগে নাই।’ চাইলে পাকিস্তানের বিপক্ষে আমি সহজেই নিরাপদ একটি ফিল্ডিং পজিশন বেছে নিতে পারতাম। কারো কিছু বলার ছিল না। কিন্তু আমি একটি ব্যাপার মনে করেছি, আমি যদি ওই পজিশন থেকে সরে যাই, তাহলে আর কখনো ওই পজিশনে দাঁড়াতে পারব না। মনে ভয় ঢুকে যাবে। পাকিস্তানের বিপক্ষেও আমি একই পজিশনে ছিলাম। মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দৌড়ে ক্যাচিং পজিশনেই ছিলাম।

প্রশ্ন : অবিশ্বাস্য এক বিশ্বকাপ কাটালেন সাকিব আল হাসান। তাঁকে নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন?

তামিম : সাকিবকে আমি গত ১৩-১৪ বছর বা তার বেশি সময় ধরে দেখছি। এবার ওর যতটা নিবেদন দেখা গেছে, তা আগে দেখিনি। এমন নয় যে, নিবেদন দেখালে বা পরিশ্রম করলেই পারফরম্যান্স হবে। তবে ওর মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখেছি। এতটা কঠোর পরিশ্রম করতে দেখেছি যে আমি চাইছিলাম, ও যেন ভালো করে। এই বিশ্বকাপে ওর যা অর্জন এক কথায় তা ‘ফেনোমেনাল’। কোনো কিছুর সঙ্গেই এই পারফরম্যান্সের তুলনা চলে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ রকম ধরনের পারফরম্যান্সের পর ওর দলের সেমিতে খেলার কথা। এটিই হতাশার যে আমরা পারিনি। আমার খারাপ লাগছে যে আমি অবদান রাখতে পারলে হয়তো সেমিফাইনাল সম্ভব হতো। দলের জন্য, সাকিবের জন্য। যা-ই হোক, সে যা অর্জন করেছে, কেউ তা কেড়ে নিতে পারবে না। আশা করি সে এভাবেই চালিয়ে যাবে।

মন্তব্য