kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

স্পিনের বিপক্ষে প্রশ্ন তবু ২৬২

২৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্পিনের বিপক্ষে প্রশ্ন তবু ২৬২

জয়ে টিকে রইল সেমির সম্ভাবনা। ম্যাচ শেষে দর্শক অভিনন্দনের জবাবে সেটিই বুঝি বোঝাচ্ছেন মাশরাফি-মুশফিকরা

‘ইগোইস্ট’ কমবেশি সবাই-ই। ইগো তারকাদের বুকপকেটের বাহারি রুমাল, একটু গভীর দৃষ্টিতে তাকালেই চোখে পড়বে। তামিম ইকবাল তারকা, ইগো আছে তাঁরও। গত বছর ফ্লোরিডায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যখন ইনিংসের শুরুতে নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়াতে বলেছিলেন কোচ স্টিভ রোডস, ইগোর কাঁটায় বিদ্ধ তামিম নীরবে ফুঁসেছিলেন। সেই তিনি কাল আবার নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে। প্রথম বলের সামনে লিটন কুমার দাশ। ফ্লোরিডায় ঠিক এমন দৃশ্যই দেখা গিয়েছিল।

সেই থেকে তামিম ইকবালকে উত্ত্যক্ত করার সহজতম উপায় হলো অ্যাশলে নার্সের নামটা মনে করিয়ে দেওয়া! এ ক্যারিবীয় অফস্পিনার, তাই তামিমের সামনে দিয়ে বল বেরিয়ে যাবে। সেন্ট কিটসে ওই সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ডাউন দ্য উইকেটে খেলতে গিয়ে অবশ্য বোল্ড হয়েছিলেন তামিম। তাতে স্টিভ রোডস ধরে নেন যে, বাঁহাতি ওপেনারকে ইনিংসের শুরুতেই অফস্পিনারের সামনে থেকে আগলে রাখাই ভালো।

কিন্তু তিনি তামিম ইকবাল, সকালের শিশিরভেজা উইকেটেও জেমস অ্যান্ডারসন, ট্রেন্ট বোল্টদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। সেই তাঁকে কিনা নার্স নামের এক ক্যারিবীয় অফস্পিনারের সামনে লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছেন কোচ! তারকার ইগোতে লাগা স্বাভাবিক। কোচের কথা নীরবে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু নিজেকে কি মানাতে পেরেছিলেন তামিম? যে বোলারের চোখের সামনেই তিন ম্যাচের সিরিজে দুটি সেঞ্চুরি আর একটা ফিফটি করে সিরিজ সেরার পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি। আর সেই তাঁকেই কিনা একটা টি-টোয়েন্টির ব্যর্থতায় স্ট্রাইকিং এন্ড থেকে সরিয়ে দিলেন কোচ, স্রেফ নার্স বোলিং শুরু করবেন জেনে!

ফ্লোরিডার জোড়া টি-টোয়েন্টির পর যথারীতি পছন্দের প্রথম বলই খেলছিলেন তামিম, গতকালের আগে পর্যন্ত। সাউদাম্পটনে তাই লিটনের প্রথম বলের জন্য গার্ড নিতে দেখা ছোটখাটো চমকই ছিল। সৌম্য সরকারকে নিচে নামিয়ে লিটনকে তামিমের উদ্বোধনী সঙ্গী করে পাঠানোয় অবশ্য চমক নেই। আফগানরা বিশ্বকাপে বোলিং শুরুই করছে অফস্পিনার মুজিব-উর-রহমানকে দিয়ে। বাংলাদেশের দুই বাঁহাতি ওপেনারের জন্য যে একই ফন্দি আঁটবে, সে তো জানা কথাই। সে ফাঁদ কাটতেই লিটন ফিরে গেছেন তাঁর অভ্যস্ত টপ অর্ডারে। তবে লিটনের প্রথম বল খেলা নিয়ে সম্ভবত এবার আর কোনো মনোবেদনা নেই তামিম ইকবালের। দেরাদুনে তো তিনি নিজে থেকেই নন স্ট্রাইকিং এন্ডে চলে গিয়েছিলেন। তিন টি-টোয়েন্টির ওই সিরিজের প্রতিটি ম্যাচেই নতুন বলে শুরু করেছিলেন মুজিব।

এর মধ্যে দুইবারই তামিম আউট হন মুজিবের অফস্পিনে। প্রথম ম্যাচে প্রথম বলেই মুজিবকে উইকেট দেওয়া তামিম পরের ইনিংসের শুরুতে নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে। তখন চন্দিকা হাতুরাসিংহেও নেই, অন্তর্বর্তী কোচ কোর্টনি ওয়ালশ। খেলোয়াড়ি জীবনে ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া এ ক্যারিবীয় পেসার এখন নিতান্তই ভদ্রলোক। দুটি কলিজা তাঁর নেই যে, মুজিবের কথা ভেবে তামিমকে নন স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়াতে বলবেন তিনি! তামিম স্বেচ্ছায় প্রথম বল থেকে ‘নির্বাসন’ নিয়েছিলেন ওই সিরিজে। হ্যাম্পশায়ার বৌলে কাল প্রান্ত বদলের পেছনেও তাঁর অনিচ্ছা আছে বলে মনে হয়নি।

রশিদ খান নিঃসন্দেহে বহির্বিশ্বের কাছে আফগান সুপারস্টার। এ লেগ স্পিনারের গুণমুগ্ধ বাংলাদেশ দলেও আছে। তবে বাংলাদেশের ব্যাটিং কোর গ্রুপে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে মুজিবের। সেই ব্যাটিং গ্রুপে তামিম তো আছেনই, বিশ্বকাপের মি. বাংলাদেশ সাকিব আল হাসানকেও ব্র্যাকেটবন্দি রাখুন।

আধুনিক ক্রিকেটে অফস্পিনারের কদর শুধু রান আটকানোর বেলায়। ইনিংসের মাঝপথে লাইন আর লেংথ বজায় রেখে প্রতিপক্ষের রান তোলার গতি কমাবেন—একজন অফস্পিনারের কাছে কোচের এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। তাতে হাঁসফাঁস অবস্থা থেকে মুুক্তি পেতে ব্যাটসম্যান ভুলভাল শট খেলে যদি উইকেট দেন, তবে সেটা বোনাস। কিন্তু মুজিব-উর-রহমানের কাছে উইকেট চান ফিল সিমন্স। চিরায়ত অফস্পিনের সঙ্গে উল্টোদিকেও বল ঘোরাতে পারেন মুজিব। আফগানিস্তানের সাবেক কোচ অ্যান্ডি মোলস যাঁকে বলেন ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’।

একজন পরিপূর্ণ অফস্পিনার যুগ যুগ ধরে সমস্যার কারণ হয়ে এসেছেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের সামনে। টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার নাথান লায়ন আর সীমিত ওভারে মুজিব-উর-রহমানের স্মৃতি তো একেবারে তাজা। মোহাম্মদ নবির অফস্পিনও কম ধারালো নয়। গতকালই তো বাংলাদেশের বাঁহাতি তারকা ব্যাটসম্যানের উইকেটটি নিয়েছেন নবি। কারো স্মৃতি প্রখর হয়ে থাকলে অফস্পিনে তামিমের এমন আউটের দৃশ্য চোখে ভেসে ওঠার কথা। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে বল ছেড়েছেন মোহাম্মদ নবি, সেটি টার্ন করবে ভেবে ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে লাইন মিস করে ফেলেন তামিম। তার আগে লেংথটাও পড়তে ভুল করা ওপেনারের স্টাম্প ভেঙেছে বোলারের কৃতিত্বের পুরস্কার দিতে।

অফস্পিনের যন্ত্রণার বিষে কাল নীল হয়েছেন সাকিব আল হাসানও। বুকে এই টুর্নামেন্টে ৪৭৬ রানের আকাশচুম্বী আত্মবিশ্বাস। কিন্তু এর কোনোটাই আগলে রাখতে পারেনি সাকিবের ডিফেন্স। তিনিও টার্নের আশায় খেলেন, দেখেন মুজিবের বলটা ‘স্কিড’ করে প্যাডে আঘাত হেনেছে। এবার আর রিভিউ নেওয়ার দরকার মনে করেননি সাকিব।

দেখতে দেখতে ওই ক্রিকেটারের কথাটাই মনে পড়ছিল বারবার, ‘আপনারা খালি পেস বোলিং নিয়ে কথা বলেন। আমরা কি কোয়ালিটি স্পিন ভালো খেলি?’

ওটাই, কোয়ালিটিই সাফল্যের চাবিকাঠি। ডান-বাম, পেস-স্পিন নিয়ে অনেক ভেবে একটা ছক ঠিকই তৈরি করা যায়। তবে সেই ছক মেনে মাঠে পারফরম করার দায়িত্ব খেলোয়াড়ের। যাঁর মান যত উঁচুতে তাঁর ব্যাটে-বলে ছক মিলবে ততই।


সাকিবের আড়ালে পড়ে আছেন। নইলে এই বিশ্বকাপটি তো দুর্দান্ত কাটছে মুশফিকুর রহিমেরও। কালই যেমন ৮৭ বলে ৮৩ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেললেন। তাতেই বাংলাদেশ পায় জয়ের পুুঁজি। একটাই আফসোস থাকতে পারে মুশফিকের- বিশ্বকাপের টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি যে পেলেন না কাল।      

ছবি : কালের কণ্ঠ


সংখ্যায়

রূপকথার মতো কাটানো বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষেও হাফসেঞ্চুরি করেছেন সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপে এ নিয়ে ছয় ইনিংসের পাঁচটিতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেললেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই পঞ্চাশ ছুঁতে পারেননি তিনি।

 

৪৭৬

ইংল্যান্ডের আসরে সাকিবের স্কোরগুলো হচ্ছে—দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৫, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ৬৪, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১২১, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ১২৪*, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪১ এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে ৫১। সব মিলিয়ে ৪৭৬ রান নিয়ে নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ স্কোরারও এখন সাকিব।

 

তুখোড় ছন্দে আছেন মুশফিকুর রহিমও। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচেই হার না মানা শতরান করেছিলেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। অসাধারণ ছন্দটা ধরে রেখে আফগানিস্তানের বিপক্ষেও ৮৩ রানের কার্যকর হাফসেঞ্চুরি তাঁর। আসরে এটা তাঁর তৃতীয় পঞ্চাশোর্ধ্ব স্কোর। সব মিলিয়ে এক সেঞ্চুরির পাশাপাশি দুই হাফসেঞ্চুরিতে মোট ৩২৭ রান তাঁর। রোহিত শর্মাকে পেছনে ফেলে মোট রানে ছয় নম্বরে উঠে এসেছেন মুশফিক।

 

১০

ব্যাটিংয়ে হাফসেঞ্চুরির পর বোলিংয়েও সফল সাকিব আল হাসান। রহমত শাহকে তামিম ইকবালের ক্যাচ বানিয়ে গতকাল বাংলাদেশকে প্রথম ব্রেক থ্রুটা এনে দিয়েছেন কিন্তু এই অলরাউন্ডারই। শেষ পর্যন্ত ২৯ রানে ৫ উইকেট তাঁর। টুর্নামেন্টে মোট উইকেট ১০টি

মন্তব্য