kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

এটা জয়ের সমান এক ড্র

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এটা জয়ের সমান এক ড্র

পরশু ম্যাচটি জিততে পারেনি বাংলাদেশ। তবে আগাগোড়া আধিপত্য করা ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিমণ্ডলে টিকে থাকা নিশ্চিত হয়েছে। কোচ জেমি ডে তাই এই ড্রকে মনে করছেন জয়ের সমান। ম্যাচের পরদিন সনৎ বাবলার মুখোমুখি হয়ে ম্যাচসহ কথা বললেন বাংলাদেশ ফুটবলের সম্ভাবনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

প্রশ্ন : গত (পরশু) রাতটা কেমন উপভোগ্য ছিল?

জেমি ডে : এটা দুর্দান্ত এক রাত ছিল। ম্যাচের আগে কিছু টেনশন ছিল, তবে খেলোয়াড়রা তাদের সেরাটা দিয়ে খেলেছে। তারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে, গোলের সুযোগ তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে বিশ্বকাপের মূল বাছাই পর্বে। যেটার অপেক্ষায় ছিল সবাই। তাই লাওসের বিপক্ষে এ ম্যাচে জয় না পেলেও ড্র-টা জয়ের সমান। এ জন্য এ ম্যাচের কোনো কিছুই আমার কাছে নেতিবাচক নয়, সবই আনন্দের এবং উপভোগের। এটা আমার কোচিং ক্যারিয়ারেও দারুণ এক স্মৃতি।

প্রশ্ন : প্রাক-বাছাইয়ে লাওসের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচ জিতে ফেরার পরও সবাই অবিশ্বাস্যভাবে খুব নার্ভাস ছিল। এমনকি হোম ম্যাচের শুরুতে খেলোয়াড়দের মধ্যে সেটা দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত ট্যাকটিক্যালি খেলে লাওস হার্ডল পার করেছে বাংলাদেশ...

জেমি : এই ম্যাচের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছিল, সেটা হয়তো চাপের কারণ। তবে আমাদের নির্দিষ্ট গেম প্ল্যান ছিল, আগের দুটি ম্যাচেও (ভিয়েনতিয়েনে এবং বঙ্গবন্ধু কাপে সিলেটে) লাওস আমাদের জালে বল জড়াতে পারেনি। প্ল্যান ছিল তাদের বিপক্ষে আমরা ডিরেক্ট ফুটবল খেলব, মাঝে মাঝে লং বল ফেলব। এই ট্যাকটিকসে ঢাকার ম্যাচ আমরা নিয়ন্ত্রণ করেছি এবং চারটি খুব ভালো সুযোগ তৈরি করেছি। একটি গোল পেয়ে গেলে আর ম্যাচের শেষের দিকে ওই চাপে পড়তে হতো না।

প্রশ্ন : প্রায় দশ হাজার দর্শক বাংলাদেশ দলকে সমর্থন করতে মাঠে এসেছিল। একটা গোলের সুখস্মৃতি নিয়ে তাদের বাড়ি ফেরা হলো না...

জেমি : অনেক দিন পর এত দর্শকের সামনে খেলেছে বাংলাদেশ। এটা স্বাগতিক দলের জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা। আমাদের দেশে (ইংল্যান্ডে) হোম ভেন্যু বিশাল অ্যাডভান্টেজ। এখানে ঘরোয়া ফুটবলে অত দর্শক হয় না বলে হঠাৎ করে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের এমন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়াটাও চ্যালেঞ্জিং। এর পরও এত দর্শকের সমর্থনে এই ম্যাচটা আগাগোড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে ছেলেরা। আশা করি বাছাই পর্বের ম্যাচগুলোতে তারা হোমের সব সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষকে দারুণ কিছু উপহার দেবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের এই দলের শক্তির জায়গা কোনটা?

জেমি : মাঠের কোনো বিভাগ ধরে বলা যাবে না। তারুণ্যের ঝলকানিতে দুর্দান্ত এক দল ফুটবলার এই দলের বড় সম্পদ। তারা যেকোনো ম্যাচের জন্য কঠিনভাবে তৈরি হয়। সর্বোচ্চ ফিটনেস নিয়ে খেলতে নামে তারা। তারা মাঠে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে, একে অন্যকে সাহায্য করে। কোনো প্রতিপক্ষের এখন সহজভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই বাংলাদেশকে। আমরা হয়তো সব সময় জেতার গ্যারান্টি দিতে পারব না, কিন্তু লড়াই করব শেষ বাঁশি পর্যন্ত। এমন কঠিন মানসিকতা নিয়ে ফুটবল খেলে তারা আস্তে আস্তে দেশের মানুষকে ফুটবলে আগ্রহী করে তুলছে।

প্রশ্ন : ২০১৮ সালের মে থেকে আপনি বাংলাদেশ ফুটবলের সঙ্গে আছেন। আপনার সেই শুরুর দলের সঙ্গে এখনকার দলের কী পার্থক্য দেখেন?

জেমি : শুরুতে তাদের ফুটবল অ্যাডুকেশনের অভাব ছিল। কিভাবে নিজেকে তৈরি রাখতে হয়, সেটা জানত না ফুটবলাররা। আস্তে আস্তে তাদের খাওয়া বদলে দেওয়া হলো, এখন চর্বিযুক্ত খাবার তারা খায় না। কখন কী খেতে হয়, সেটাও তারা জানে ভালোভাবে। নিয়মিত জিমে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। কিভাবে ট্রেনিং করতে হয়, সেটা শিখেছে। খেলোয়াড়দের মানসিকতার বড় পরিবর্তন হয়েছে, তারা কৌশল মেনে মাঠে পারফরম করে। এভাবেই দলটি উন্নতি করেছে, আসলে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে তারা তৈরি হচ্ছে।

প্রশ্ন : এই এক বছরে এমন কোনো ২/৩ জন খেলোয়াড় কি যোগ হয়েছে, যাঁরা দলে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে?

জেমি : না। এই দলে এমন কোনো ম্যাচ উইনার নেই যে রাতারাতি দলটাকে বদলে দিতে পারে। আছে একদল তরুণ খেলোয়াড়, যারা প্রায় সমমানের, একসঙ্গে মিলেই তারা সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে। ২৩ জনের স্কোয়াডের যে কেউ যেকোনো দিন দুর্দান্ত কিছু করে বসতে পারে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের বড় সমস্যা স্কোরিংয়ে। কিন্তু ভারত, মালদ্বীপ কিংবা আফগানিস্তানে এই সমস্যা নেই। একজন ভালো স্কোরার যোগ করা গেলে এই দলের চেহারাও অনেকখানি বদলে যেতে পারে?

জেমি : এটা আসলে এ দেশের সামগ্রিক ফুটবলের সমস্যা। জাতীয় দলে খেলার আগে স্ট্রাইকাররা সেভাবে ঘরোয়া ফুটবলে ওই পজিশনে খেলার সুযোগ পায় না। ফলে তার গোলের অভ্যাসও তৈরি হয় না। জাতীয় দলে স্কোরারের সামনে যখন সুযোগ আসে তখন সেটা তার কাছে হয়তো নতুন মনে হয়, এর আগে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি সে। তাই সে হয়তো ওই মুহূর্তে হতচকিত হয়ে পড়ে। ঢাকায় লাওসের ম্যাচে এ কারণে সুযোগ তৈরি করেও আমরা গোল পাইনি। এই সমস্যা থেকে বের হতে গেলে অবকাঠামো বদলাতে হবে। সেটা তো আর রাতারাতি হবে না। আমি তাই স্ট্রাইকারদের নিয়ে কাজ করি এবং ম্যাচ খেলিয়ে তাদের মনে বিশ্বাস ফেরাতে চেষ্টা করি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ফুটবলে প্রতিভার সংকট আছে। মনে হচ্ছে, এই ঘাটতি পুষিয়ে দিতেই আপনি খেলোয়াড়দের দৌড়-ঝাঁপ করে খেলা, প্রেসিং ফুটবলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এটাই কি আপনার ম্যাচ খেলার কৌশল?

জেমি : দেশের ফুটবলের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটাই ভালো উপায় মনে হয়েছে আমার। কোচ হিসেবে আপনাকে কোনো না কোনো উপায় বের করতে হবে। এই কৌশল ছাড়া আমরা শক্তিশালী দলের সঙ্গে লড়তে পারব না। রক্ষণ সংগঠন ভালো না করে খেলা যাবে না। আসলে টেকনিক্যালি ভালো ফুটবলার থাকলে হয়তো আমার বেশি পরিশ্রম করতে হতো না। আমার স্কোয়াডের বড় সম্বল হলো লড়াই করার মানসিকতা এবং ফিটনেস। মাঠে তারা কৌশল মেনে খেলতে পারলে বড় দলের সঙ্গেও আমাদের পারফরম্যান্স ভালো হবে।

প্রশ্ন : এর মধ্যেও চমৎকার কোনো প্রতিভা কি আছে আপনার দলে?

জেমি : এই তরুণ দলে রবিউল, বিপলু, সুশান্ত, আরিফদের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, তারা তৈরি হচ্ছে সামনের দিনগুলোর জন্য। তবে রবিউল হাসানের সম্ভাবনা দেখি বেশি, বাইরে খেলার মতো সামর্থ্য আছে তার।

প্রশ্ন : সামনে বিশ্বকাপের মূল বাছাইয়ে শক্তিশালী দলগুলো পড়বে গ্রুপে। কেমন হবে লড়াই?

জেমি : ওখানে খেললে আমাদের ম্যাচ অভিজ্ঞতা বাড়বে এবং শিখব। ওখানে বড় প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। এই ম্যাচগুলো আমাদের বঙ্গবন্ধু কাপ ও সাফের জন্য শক্তিশালী দল তৈরিতে সাহায্য করবে।

মন্তব্য