kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ভাঙা ঘরে সাফল্যের ট্রফি

রাহেনুর ইসলাম, নীলফামারী থেকে ফিরে   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাঙা ঘরে সাফল্যের ট্রফি

ভাঙা দেয়াল। বাড়ির পুরনো টিন জরাজীর্ণ। ঘরে পড়ার টেবিল নেই, ছোট্ট আনিসুর রহমান বই-খাতা নিয়ে পড়ে বিছানায়। তবে পুরনো আমলের আলমারির ওপরে চকচকে ট্রফিটার দিকে চোখ আটকে যায়। কদিন আগে শেষ হওয়া ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ’-এর সেরা গোলরক্ষকের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে নীলফামারীর দক্ষিণ কানিয়ালখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র আনিসুর। ৬৫ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ের ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫১৫ ফুটবলারের মধ্যে সেরা গোলরক্ষক হওয়াটা বিশেষ কিছুই।

আনিসুর রহমানের স্কুল অবশ্য শিরোপা জিততে পারেনি। ফাইনালে ১-০ গোলে হেরেছে সিলেটের জৈন্তাপুর হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে। এর পরও নীলফামারী সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের স্কুলটি ঘিরে গর্বিত জেলার মানুষ। ৬৫ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ের মধ্যে রানার্স-আপ হওয়াটাই বা কম কিসে? স্কুল ফুটবলে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের যে ঐতিহ্য এর বর্তমান ধারক তারা। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তাহমিনা বেগম জানালেন, ‘স্কুলের অনেক ছেলের বাড়ি কয়েক কিলোমিটার দূরে। খেলোয়াড়দের সেটা বুঝতে দিইনি। আমার বাড়িতে বেশির ভাগ সময় খেত ওরা। সাহায্য করেছেন আসাদুজ্জান নূর এমপি থেকে নৈশ প্রহরী বিশ্বনাথসহ এলাকার অনেকেই।’ স্কুল মাঠের অর্ধেকটা ব্যক্তি মালিকানাধীন। ক্যাম্প চলার সময় গাছ লাগিয়ে ফেলে তারা। পরে স্থানীয়রা ক্ষতিপূরণ দিয়ে কেটে ফেলে গাছ আর সুযোগ করে দেয় অনুশীলনের। সাহায্যের পরিমান এতটাই বিশাল।

জেলার মানুষের মুখ উজ্জ্বল করা এই দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ের অভিভাবকেরই নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। আমিনের বাবা রিকশাচালক। আবু সাইদের বাবা দিনমজুর। শাহ আলমের বাবা কাঠমিস্ত্রি। স্কুল চত্বরে কথা বলার সময় সবার চোখ-মুখ থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল ভবিষ্যতে ভালো খেলোয়াড় হওয়ার প্রত্যয়। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নানও আশাবাদী তাদের নিয়ে, ‘ওরা রংপুর বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গত বছরের জুলাই থেকে ক্যাম্প করিয়েছি আমরা। দল-মত-নির্বিশেষে সবাই সাহায্য করেছেন স্কুলের ছাত্রদের। তখনকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন ভুঁইয়া এঁদের অন্যতম। স্থানীয় কোচ জিতেন্দ্র নাথের অভিজ্ঞতা থাকলে চ্যাম্পিয়নও হতে পারতাম। এর পরও ৬৫ হাজার স্কুলের মধ্যে ফাইনাল খেলাটা কম অর্জন নয়।’

কানিয়ালখাতা বিদ্যালয় না পারলেও নীলফামারীর স্কুলগুলোর বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে সাফল্য কম নয়। ২০১২ ও ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্টে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল নীলফামারীর দুটি স্কুল। ২০১২ সালে দক্ষিণ দোনদরী কোরানিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় আর ২০১৩ সালে শিরোপা জিতে বেড়াডাঙ্গা সোডাপীর যাদুরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আঞ্চলিক পর্যায়ে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল নীলফামারী জেলা সদরের নতুনবাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই খেলোয়াড়রা অনেকে সুযোগ পেয়েছে বিকেএসপিতে, দেখছে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন।

এই সাফল্যের শুরুটা নীলফামারী ইংলিশ হাই স্কুল দিয়ে। ১৯৩৫ সালে প্রথম গ্রেগরি হ্যান্ডিকাপ, ১৯৩৫-১৯৩৭ সালে হার্ডিং শিল্ড, ১৯৩৭ সালে কুমুদিনী কাপ ও অজিত যাদবেশ্বর শিল্ড, ১৯৩৮ সালে হান্টার আন্ত স্কুল কাপ, ১৯৫১ সালে আন্ত স্কুল প্রাদেশিক শিল্ড, ১৯৬০ সালে আইএসএস কাপসহ অসংখ্য টুর্নামেন্ট জিতে সুনাম বাড়িয়েছিল এখানকার ফুটবলের। স্বাধীনতার পর ফুটবলের সোনালি যুগে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন কয়েকজন। অধিনায়কও হয়েছিলেন আরিফ হোসেন মুন। তিনি এখন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। এর অনেকটাই কৃতিত্ব সবার প্রিয় খোকনদা বা সুনীল রতন ব্যানার্জি। ১৯৬৮ সালে নীলফামারী থেকে ভারতে চলে যাওয়া সুনীল রতন ছিলেন তৎকালীন নীলফামারী হাই ইংলিশ উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক। ১৮৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলই আজকের নীলফামারী উচ্চ বিদ্যালয়। সুনীল রতন ব্যানার্জি আর তাঁর দুই ভাই নীল রতন ব্যানার্জি ও অমূল্য রতন ব্যানার্জির হাত ধরে নীলফামারীর ক্রীড়াঙ্গন পেয়েছিল নতুন মাত্রা। তাঁরই শিষ্যরা এখন হাল ধরেছেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার। জেলার স্কুলগুলোর সাফল্যের পেছনে অবদান আছে তাঁদেরও।

মন্তব্য