kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

বিউটি এনেছেন বিদ্যুৎ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সবার শেষের গ্রামটি যে কুন্দপুকুর হবে ধরে নেন সবাই! সেই গ্রামে ২০১৬ সালে এসে যায় বিদ্যুৎ, যার পুরো কৃতিত্বটা আর্চার বিউটি রানী রায়ের।

রাহেনুর ইসলাম, নীলফামারী থেকে ফিরে   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিউটি এনেছেন বিদ্যুৎ

ছিটমহল বিলুপ্ত হয়েছে সেই কবে। নীলফামারী সদর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরের গ্রাম কুন্দপুকুরের মানুষ এরপরও নিজেদের ভাবত ছিটমহলের বাসিন্দা! গ্রামে যাওয়ার রাস্তা এবড়োখেবড়ো। পাশের কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ এলেও তারা অন্ধকারে ডুবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সবার শেষের গ্রামটি যে কুন্দপুকুর হবে ধরে নেন সবাই! সেই গ্রামে ২০১৬ সালে এসে যায় বিদ্যুৎ, যার পুরো কৃতিত্বটা আর্চার বিউটি রানী রায়ের।

কুন্দপুকুর থেকে উঠে এসে বিউটি রানী শিলং এসএ গেমসে জিতেছিলেন একটি রুপার পদক। গ্রামে বয়ে যায় খুশির বন্যা। ভাসতে থাকেন অভিনন্দনের স্রোতে। স্থানীয় সংসদ সদস্য জনপ্রিয় অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরও জানান অভিনন্দন। চেম্বার অব কমার্স থেকে সংবর্ধনা দেওয়ার সময় মোবাইলে ফোন দিয়ে পাওয়া যাচ্ছিল না বিউটিকে। পরে জানা যায় গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকায় চার্জ ছিল না মোবাইলে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেই বিউটি চেয়ে বসেন বিদ্যুৎ, ‘সবাই বলে আমি গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছি। কিন্তু প্রত্যন্ত এই গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। সন্ধ্যার পর অন্ধকারে ডুবে যায় এলাকা। সম্ভব হলে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করবেন।’ প্রতিশ্রুতি দেন উপস্থিত গণ্যমান্যরা।

এটা কথার কথা ধরে নিয়েছিলেন বিউটি। কিন্তু কদিন না যেতে তাঁর বাবা দিপু রামের মোবাইলে ফোন আসে পল্লী বিদ্যুৎ থেকে, ‘দাদা আপনার মেয়ের চাওয়ায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে কুন্দপুকুরে। বাড়িতে আসেন।’ প্রথমে পাত্তা দেননি টাউন ক্লাবের উল্টো দিকে ছোট্ট টেইলার্সের দোকান দেওয়া দিপু রাম। পরে বাড়ি গিয়ে দেখেন স্থাপিত হচ্ছে বিদ্যুতের খুুঁটি। চোখ ভরে যায় জলে। কুন্দপুকুর শাহপাড়ায় পাঁচ বাড়ির মধ্যে সবার আগে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় বিউটিদের বাড়িতে। এরপর ধীরে ধীরে পায় গ্রামের ২৬ বাড়ির সবাই। সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের প্রতি তাই বিউটির কৃতজ্ঞতা, ‘গ্রামের সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। বিদ্যুৎ সংযোগ আনতে যে টাকা জমা দিতে হয়, সেটা সংগ্রহ করা আমাদের জন্য অসম্ভব ছিল। আমার চাওয়াতে এত দ্রুত বিদ্যুৎ চলে আসবে কল্পনাও করিনি কোনো দিন।’

তখন থেকে কুন্দপুকুরকে এক নামে বিউটির গ্রাম বলে চেনে সবাই। বিদ্যুৎ আসায় স্বস্তিতে গ্রামের মানুষ। রাতে আর যেতে হয় না কয়েক কিলোমিটার দূরের দোকানে। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে কিছু দোকান, যা চালু থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। মুরগির খামার করার কথাও ভাবছেন শুধাংসু রায়, ‘বিউটি মেয়েটা আরো সফল হোক, এই আশীর্বাদ করি। ওর জন্য বিদ্যুৎ পেয়েছি। মুরগির খামার করার পুঁজি জোগাচ্ছি এখন।’

২০১৭ সালে আইএসএসএফ ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটি ওয়ার্ল্ড আর্চারির প্রথম আসরে জোড়া সোনা জিতেছিলেন বিউটি রানী রায়। একটি দলগত আরেকটি মিশ্র রিকার্ভে। তাঁর মতো নীলফামারীর মেয়ে দিয়া সিদ্দিকীও এবারের সলিডারিটি ওয়ার্ল্ড আর্চারিতে সোনা জিতেছেন দুটি। একই জেলার দুজন আর্চার দেশের অন্যতম সেরা হওয়ায় গর্বিত নীলফামারীর মানুষ। জাতীয় দলের যেকোনো টুর্নামেন্টে নিয়মিত এখন দুজন। তবে গ্রামে বিদ্যুৎ নিয়ে আসা বিউটির পরিবারে আসেনি স্বাচ্ছন্দ্যের আলো।

বিউটির বাবা দিপু রাম রায় ও দুই ভাই সুবাস চন্দ্র রায়, নারায়ণ রায় মিলে চালান ছোট্ট টেইলার্সের দোকান। তাতে টেনেটুনে চলে যায় খাওয়া-পড়ার খরচ। আর্চারির সাফল্যে বিউটি পুরস্কার হিসেবে সরকারিভাবে দুইবার মিলে পান আড়াই লাখ টাকা। সেই টাকায় কুন্দপুকুরে তোলা হয়েছে দুটি আধাপাকা ঘর। জরাজীর্ণ টিনের আরেকটি ঘর থাকলেও গত মঙ্গলবার বৈশাখী ঝড়ে ভেঙে গেছে সেটা। ভাঙা সেই বাড়িতে দাঁড়িয়ে বিউটির বাবা দিপু রামের দীর্ঘশ্বাস, ‘ভাঙা এই বাড়ি কিভাবে ঠিক করব জানি না।’

ভাতাভিত্তিক চুক্তিতে বিউটি ছয় বছর চাকরি করেছেন বাংলাদেশ আনসারে। কিন্তু চাকরি স্থায়ী হয়নি। বাধ্য হয়ে আনসার ছেড়ে নাম লিখিয়েছেন একটি ক্লাবে। সেখানে বেতন একটু বেশি পেলেও আজীবন ক্লাব টাকা দিয়ে যাবে, এর নিশ্চয়তা নেই। গ্রাম আলোকিত করা বিউটির জীবন কি এভাবেই অন্ধকারে ডুবে থাকবে?

মন্তব্য