kalerkantho

তুরিনেও দুর্ধর্ষ আয়াক্স

সামীউর রহমান   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তুরিনেও দুর্ধর্ষ আয়াক্স

গ্রিক চারণকবি হোমার গেয়ে বেড়াতেন ট্রয়ের যুদ্ধের বীরগাথা। রাজপুত্র আয়াক্স, অ্যাকিলিস ও হেক্টরের আড়ালে খানিকটা ঢাকাই পড়ে গিয়েছেন ইলিয়াড মহাকাব্যে। তাঁর নামটা অ্যামস্টেল নদীর ধারের শহরের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ১১৯ বছর আগে জনাতিনেক ফুটবলপ্রিয় মানুষ গড়ে তুলেছিলেন আয়াক্স আমস্টারডাম ক্লাবটি। নদীর জোয়ার-ভাটার মতো আয়াক্সের সাফল্যের পারদও করেছে ওঠানামা। ইয়োহান ক্রুইফদের সময়ে টোটাল ফুটবলের জাদুতে সত্তরের দশকের গোড়াটা ইউরোপিয়ান কাপে রাজত্ব করেছে আয়াক্স, এরপর আবার ভাটার টান। এরপর মরা নদীতে ফের স্রোত জাগে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে। এরপর দীর্ঘ শীতঘুম। পেট্রোডলার আর উড়ে আসা ধনকুবেরদের মুড়ি-মুড়কির মতো ছিঁটানো টাকায় যখন দলবদলের বাজারে উড়ছে কোটি কোটি টাকা, ভালো দল গড়া মানেই যখন ট্যাঁকের জোরের খেলা; তখন আয়াক্সের এই তরুণ দলটাই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিল প্রচলিত নিয়মকে। এরিক ট্যান হেগের এই তরুণ দলটা রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের মতো ইউরোপের পরাশক্তিতে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় করে দিয়েছে তাদেরই মাঠে হারিয়ে এসে। লিখেছে নতুন ফুটবলের নতুন রূপকথা।

কখনো কখনো ভাগ্যদেবীর কৃপাতেও অনেক কিছু হয়ে যায়। রোমা, মোনাকো কিংবা ইউরোপের ছোট দেশের দলগুলো চ্যাম্পিয়নস লিগে চমক জাগালেও লম্বা দৌড়ে শেষ ফিতে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তারকাবহুল কিংবা প্রতিষ্ঠিত কোনো শক্তিই জিতে নেয় শিরোপা। আয়াক্সের ভাগ্যে কী আছে সেটা সময়ই বলে দেবে, তবে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত তাদের যা কীর্তি তাতে অনেকেই মনে মনে তাদের ইউরোপসেরা মেনে নিয়েছেন। আমস্টারডাম শহর সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘ভালো ছেলেরা স্বর্গে যায় আর দুষ্ট ছেলেরা যায় আমস্টারডামে।’ শহরটা ছিল ইউরোপের অন্যতম প্রধান বন্দর, নাবিকদের আনন্দফুর্তির নৈতিক-অনৈতিক সব উপকরণেরই অঢেল ব্যবস্থা ছিল বলেই হয়তো এই দুর্নাম! তবে আমস্টারডামের এই দুষ্ট ছেলের দল যেভাবে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে টানা তিনবারের চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ আর এবারের শিরোপার অন্যতম দাবিদার জুভেন্টাসকে তাদের মাঠে হারিয়ে দিল, তাতে ভবিষ্যতে অনেক ফুটবল দলই হয়তো আমস্টারডামের ইয়োহান ক্রুইফ অ্যারেনায় পা রাখতে ভয় পাবে। আয়াক্সের চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা পেতেই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। প্রথমে বাছাই পর্বের তৃতীয় ধাপে তারা হারিয়েছে বেলজিয়ামের দল স্ট্যান্ডার্ড লিয়েগেকে, এরপর প্লে-অফে ডায়নামো কিয়েভকে। গ্রুপ পর্বে বায়ার্ন মিউনিখ ও বেনফিকার সঙ্গে পড়ে যাওয়াতে অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই টানতে হবে দাঁড়ি। কিন্তু বেনফিকার সঙ্গে নিজেদের মাঠে ৯২তম মিনিটে পাওয়া গোলে জয় আর বায়ার্নের সঙ্গে ৯৫ মিনিটের গোলে ড্র, এই ৪টা পয়েন্ট ব্যবধান গড়ে দেয় বেনফিকার সঙ্গে। গ্রুপে রানার্স-আপ হয়ে তারা পেয়ে যায় শেষ ষোলোর টিকিট। এরপর ড্রতে যখন খেলা পড়ল রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে এবং নিজ মাঠে তারা মাদ্রিদিস্তাদের কাছে হেরে গেল ২-১ গোলে, তখনই ফুলস্টপ দেখে ফেলেছিলেন বেশির ভাগ মানুষ। হোক দুর্দিনের কবলে রিয়াল, তাই বলে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু থেকে তিনবারের চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে জিতে আসা কি মুখের কথা! সাহস করেছিলেন দুশান তাদিচ, ডেভিড নেরেসরা। রিয়ালের মাঠে ৪-১ গোলে জিতে, লস ব্লাংকোসদের স্মরণকালের সবচেয়ে বড় চ্যাম্পিয়নস লিগ হার উপহার দিয়ে মহাবীর আয়াক্সের অনুসারীরা ঠাঁই করে নেয় শেষ আটে। কিন্তু তাতেও রক্ষা নেই, সামনে যে ‘হেক্টর’ দাঁড়িয়ে!

ইলিয়াডে হেক্টর না অ্যাকিলিস, কে বড় বীর এই নিয়ে হয়তো তর্ক চলত শ্রোতাদের মাঝে। আধুনিক যুগে বীররা নিয়েছেন ফুটবলারের অবতার। তাতে লিওনেল মেসি অবধ্য অ্যাকিলিস হলে রোনালদো ভুল সময়ে জন্ম নেওয়া ট্র্যাজিক হিরো হেক্টর। এই মৌসুমেই রিয়াল ছেড়ে গিয়েছেন জুভেন্টাসে, তুরিনের ক্লাবটিও বারবার শিরোপার চৌকাঠ মাড়িয়ে ফিরেছে খালি হাতেই। এবার তাই আশার মশালটা জ্বলছিল দাউদাউ করে, প্রতিপক্ষের মাঠে ১-১ ড্র করে আসায় তাতে আরেকটু ঘি পড়েছে। নিজ মাঠে রোনালদো যখন ২৮ মিনিটে হেড করে গোলটা দিয়েদিলেন, তখন তুরিনবাসী হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি কী আসছে সামনে! ঢেউয়ের মতো আক্রমণ ধেয়ে এসেছে জুভেন্টাসের রক্ষণে, মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন জিয়েচ, ডি লিট, ডি ইয়ং, ফন ডি বেকরা। তাঁদের এই জয়ের ক্ষুধার সামনেই নতজানু হয়েছে জুভেন্টাস।

জয়ের পর তুরিনের ‘তুতোস্পোর্টস’ শিরোনাম করেছে অতিথি দলের জয়কেই, লিখেছে ‘দুর্দান্ত আয়াক্স, জয় তাদেরই প্রাপ্য’। গ্যাজেত্তা দেল্লো স্পোর্তস লিখেছে, ‘টোটাল ফুটবল রোনালদোর চাইতে বড় ব্যবধান গড়ে দিল’। অন্যদিকে একটি ডাচ পত্রিকা লিখেছে, ‘তুরিনের এই জাদুকরী রাতে, আয়াক্স প্রমাণ করল; ফুটবলের দরকারি সব কৌশলই তারা আয়ত্ত করেছে। দুঃসময়ে শান্ত থেকেছে, পরস্পরের ওপর ভরসা রেখেছে এবং নিজেদের ওপর বিশ্বাস হারায়নি। এবং তারা গোলও করেছে...যেটা তারা সব সময় করে!’ সেমিফাইনালে আয়াক্সের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হবে টটেনহাম-ম্যানসিটি ম্যাচের জয়ী দল। তাদের জন্য সাবধানবাণী শুনিয়ে দিলেন দুশান তাদিচ, ‘আমাদের ক্ষুধা এখনো মেটেনি। আমরা যে কাউকে ধরাশায়ী করতে পারি। আমাদের লক্ষ্য অসাধারণ এই অ্যাডভেঞ্চারটা চালিয়ে যাওয়া।’ আসলেই তো, আয়াক্সের এই সাফল্যকে রূপকথা গল্পকথার মোড়কে না মুড়িয়ে দুষ্ট ছেলের দলের অ্যাডভেঞ্চার বলাটাই যুক্তিসংগত। কারণ শেষ পর্যন্ত, আমস্টারডাম তো দুষ্ট ছেলেদেরই গন্তব্য!

মন্তব্য