kalerkantho

মামলা আর তদন্তের ফুটবল!

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মামলা আর তদন্তের ফুটবল!

ক্রীড়া প্রতিবেদক : জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্মেলনকক্ষে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ক্রীড়া সাংবাদিকদের প্রায় সবাই হাজির। প্রশ্নবাণে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও বাফুফে সভাপতি কোণঠাসা। এরই মধ্যে এক সিনিয়র সাংবাদিকের ক্ষোভমাখা প্রশ্ন, ‘আপনারা কি ফিফার ওজন বুঝতে পারছেন?’

খুবই রূঢ় প্রশ্ন। তবে ওটাই হলো বাস্তবতা। বাংলাদেশ কেন, বেগড়বাই করলে কোনো দেশের সরকারেরই তোয়াক্কা করে না বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা। ক্ষমতায় এসেই বাফুফের নির্বাচিত কমিটি বিলুপ্ত করে এস এ সুলতানকে মসনদে বসিয়েছিল চারদলীয় জোট সরকার। ফলশ্রুতিতে ফিফার নিষেধাজ্ঞা জারি। সে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে বৈশ্বিক ফুটবলে ফিরতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল তৎকালীন সরকারকে। শুধু বাংলাদেশ নয়, অনেক দেশের ওপরই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ফিফা। ২০১৭ সালে তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপের জেরে পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনকেও সাসপেন্ড করেছিল। কুয়েত, পেরু, ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়াকেও নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেতে ফিফার প্রদর্শিত পথে হাঁটতে হয়েছে।

বাফুফের বর্তমান কমিটির সদস্য এবং উইমেন্স উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণের বিরুদ্ধে মামলা, জেল এবং জামিন এ কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ফিফা কাউন্সিলে এশীয় অঞ্চলের নির্বাচিত নারী প্রতিনিধি তিনি। স্বভাবতই মাহফুজার বিরুদ্ধে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কারাবরণের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফিফা এবং এএফসি। এর এক দিন পর ১০ হাজার টাকা মুচলেকার বিনিময়ে জামিনও পেয়েছেন তিনি। দেশীয় ফুটবলের জন্য আশঙ্কার বিষয় হলো, কিরণের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাটির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে ফিফা।

কিরণের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন ফুটবল সংগঠক আবু হাসান চৌধুরী প্রিন্স। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গত ৮ মার্চ একটি সংবাদ সম্মেলনে নাকি প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করে কিছু মন্তব্য করেছেন কিরণ। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এজাহারে উল্লিখিত দিনটিতে মাহফুজা কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি। বেশ কিছুদিন আগে আড্ডার মাঝে নাকি মাহফুজা বলেছিলেন যে, ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটের প্রতিই প্রধানমন্ত্রীর অনুগ্রহ বেশি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে কখনোই পক্ষপাতের কথা বলেননি। তবে এ দেশে ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটের প্রতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পৃষ্ঠপোষক এবং সংবাদমাধ্যমের অনুরাগ যে কয়েকগুণ বেশি, সেটি তো আর মিথ্যা নয়।

প্রিন্স পোড় খাওয়া ফুটবলের লোক, মাহফুজার মন্তব্য তাঁর মনে আঘাত করতেই পারে। তবে নিজে আহত হয়েছেন বলে নয়, মাহফুজার বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর মানহানি ঘটিয়েছে—এমন অভিযোগ থেকেই এজাহার দায়ের করেছেন তিনি। সে কারণেই কিনা ফুটবলপাড়ার ‘পালস’ জানেন যাঁরা, তাঁদের অনেকের ধারণা এটা বাফুফের পরবর্তী নির্বাচনের আগে বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনকে দুর্বল করার চাল মাত্র!

এদিকে কিরণ জামিন পাওয়ার পরদিনই ঘটেছে আরেক কাণ্ড। পাতানো ম্যাচ নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ মৌসুমে ময়মনসিংহে সাইফ স্পোর্টিং নাকি ‘স্বেচ্ছায়’ ড্র করে চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গে—দুটো ক্লাবের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত তরফদার রুহুল আমিন। ম্যাচটি পাতানো ছিল প্রমাণ করা গেলে বিপাকে পড়বেন তরফদার। অবশ্য ম্যাচ কমিশনারের প্রতিবেদনে সে রকম সংশয়ের উল্লেখ ছিল না বলে জানিয়েছেন বাফুফের কম্পিটিশন ম্যানেজার জাবের বিন আনসারী, ‘তবে কোন একটি টিভিতে ম্যাচটি নিয়ে সংশয়ের কথা বলা হয়েছিল।’ সে সূত্রেই আচমকা এই তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হওয়া দেখে কটাক্ষ করেছেন সাইফ স্পোর্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী, ‘আমাদের বিরুদ্ধে পাতানো খেলার অভিযোগ ওঠা হাস্যকর। মাঠের খেলা নিয়ে অসুস্থ কর্মকাণ্ড চলছে বলেই এমন অভিযোগ উঠছে।’ চট্টগ্রাম আবাহনীর ম্যানেজার আরমান আজিজও ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, ‘মালেককে তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে বলা হয়েছে। অথচ মালেক সেই ম্যাচের স্কোয়াডেই ছিল না। সে ময়মনসিংহেও যায়নি।’ তাতে নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই পক্ষের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রচেষ্টা হিসেবেই গণ্য হচ্ছে ওপরের ঘটনা দুটি।

আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এমন পাল্টাপাল্টি চলছে কি না জানতে চাইলে বাফুফে সহসভাপতি তাবিথ আউয়াল গতকাল বলেছেন, ‘কিরণের মামলা এবং পাতানো খেলার তদন্ত দুটি পাল্টাপাল্টি কোনো ঘটনা বলে আমি মনে করি না। মনে হয় না নির্বাচনের কোনো সমীকরণ আছে এতে।’

তবে যা আছে, সেটিও ফুটবলের জন্য কতটা মঙ্গলকর—সে প্রশ্নটি কিন্তু থাকছেই। নিষেধাজ্ঞা টেনে এনে সবাইকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ফুটবল। নির্বাচনকে ঘিরে আবার উত্তেজনা ফুটবলে। তবে মাঠে নয় মামলা বনাম তদন্তে।

মন্তব্য