kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৩০ জানুয়ারি ২০২০। ১৬ মাঘ ১৪২৬। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

অন্য রকম খেলা

যানজটের শহর থেকে উদ্দাম রেসট্র্যাকে

১০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যানজটের শহর থেকে উদ্দাম রেসট্র্যাকে

আকাশ-সংস্কৃতি খুলে দিয়েছিল জানালা আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় গোটা দুনিয়াটাই তো হাতের মুঠোয়। বিশ্বের নানা প্রান্তের জনপ্রিয় অন্য অনেক খেলাও আকর্ষণ করছে বাংলাদেশের তারুণ্যকে। এমনই কিছু নতুন ধরনের খেলা নিয়ে ধারাবাহিক লিখেছেন সামীউর রহমান। আজ শেষ পর্বে থাকছে মোটর রেসিং

ব্রাজিল বললে পেলে রোনালদো নেইমারের কথা যেমন আসে, তেমনি উঠে আসে আর্টন সেনার নামটাও। ফর্মুলা ওয়ানের জগতে সেনা একজন কিংবদন্তি, যাঁকে মনে করা হয় সর্বকালের সেরাদের একজন। ব্রিটিশ ফর্মুলা রেসার লুইস হ্যামিলটন, স্পেনের ফার্নান্দো আলোনসোরাও কম বড় তারকা নন। মাইকেল শুমাখারকে তো গোটা বিশ্বই চেনে এক নামে। বাংলাদেশে থেকে তাঁদের মতো ফর্মুলা ওয়ান রেসার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেও সাহস লাগে! সেই দুঃসাহসিক যাত্রাপথেই এখন পর্যন্ত কিছুটা পথ এগিয়েছেন দুজন। একজন মাসুদুর রহমান তুষার, প্রথম বাংলাদেশি রেসার হিসেবে গিয়েছিলেন ফর্মুলা ফোরে। তাঁর দেখানো পথ ধরে দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ফর্মুলা ফোরের রেসে অংশ নিতে যাচ্ছেন কারিব আহমেদ।

রাস্তায় ভোঁ ভোঁ করে গাড়ি চালানোর সঙ্গে রেসট্র্যাকে গাড়ির রেসের প্রতিযোগিতা করার পার্থক্য রাত-দিনের। ফর্মুলা সিরিজের গাড়িগুলোর ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স এবং চালনার কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মোটর রেসিংয়ের শুরুটা গোকার্ট দিয়ে। এরপর ধাপে ধাপে ফর্মুলা ফোর, থ্রি, টু হয়ে ওয়ানে উত্তরণ। বাংলাদেশ থেকে তুষার গিয়েছিলেন ফর্মুলা ফোরে, কারিবের গন্তব্যও একই। কারণ বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ফেডারেশন অব মোটর স্পোর্টস ক্লাব ইন্ডিয়া সংক্ষেপে এমএমএসসিআই থেকে রেসিংয়ের লাইসেন্স নিয়ে রেস করতে নামাটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। তুষার ভারতের অ্যাভালাঞ্চ রেসিংয়ের হয়ে ফর্মুলা ফোরের রেসে অংশ নিয়েছিলেন। অর্থাভাবে এক মৌসুমের বেশি ট্র্যাকে থাকতে পারেননি তুষার। ২২ জনের রেসে তাঁর সর্বোচ্চ পজিশন ছিল দশম। ২০১৬ সালে সবশেষ রেসে অংশ নিয়েছিলেন তুষার। এরপর নানা ব্যক্তিগত আর আর্থিক অসুবিধার কারণে রেসট্র্যাকে নামতে পারেননি। বাংলাদেশের ‘মাইকেল শুমাখার’-এর জীবন তাই থমকে আছে দীর্ঘ এক লালবাতিতে। তুষার এখন মোটর পার্টস ব্যবসায়ী, রেসিং তাঁর কাছে দূরের বাতিঘর।

কারিব আহমেদের আর্থিক অবস্থা তুষারের চেয়ে ভালো। বাবা গাড়ি ব্যবসায়ী, শৈশব থেকেই তাই শিরায়-উপশিরায় রক্তের বদলে অকটেন-পেট্রলের ছোটাছুটি! ১১ বছর বয়সেই শিখে ফেলেন গাড়ি চালানো। গাড়ি কিনতে জাপান গিয়েছিলেন বাবার সঙ্গে, সেখানেই একসময় কৌতূহলে যাওয়া হয় ফর্মুলা ওয়ানের রেসিং দেখতে। দেশে ফিরে খোঁজখবর নিতে ইন্টারনেটের দ্বারস্থ হওয়া। জানতে পারলেন গো-কার্টিং হচ্ছে রেসিংয়ের হাতেখড়ি। আশুলিয়ায় গো-কার্টিং করলেন, প্রতিযোগিতায় হলেন তৃতীয়। এরপর রেসার হওয়ার জন্য ভারতের এফএমএসসিআই থেকে লাইসেন্স করালেন। গত দুই বছর ধরে প্রতি মাসে অনুশীলনের জন্য গিয়েছেন ভারতের কোইম্বাটোরে। সেখানেই অনুশীলন করেছেন রেসিংয়ের, আর দেশে কম্পিউটার সিমুলেশনে। অবশেষে অ্যাভালাঞ্চ রেসিংয়ের ট্রায়ালে প্রথম হয়ে ফর্মুলা ফোরে নামার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন কারিব। অ্যাভালাঞ্চ রেসিং ক্লাব যে চারজন রেসারকে চলতি মৌসুমের জন্য নির্বাচিত করেছে, তাদের ভেতর কারিবের টাইমিং সবচেয়ে ভালো। ২.৭ কিলোমিটারের রেসট্র্যাক এক পাক দিতে কারিবের লাগে ১১৩ সেকেন্ড, যে কোর্সের রেকর্ড ১১১ সেকেন্ড।

কারিব অংশ নিতে যাচ্ছেন জেকে টায়ার ও এফএমএসসিআইয়ের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় রেসিং চ্যাম্পিয়নশিপে। এলজিবি ৪০০ ক্যাটাগরির এই গাড়িগুলো ১৩০০ সিসির, সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার। চারটি রেসের এই চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম তিনটি হবে কোইম্বাটোরের কারি মোটর স্পিডওয়েতে, শেষটি হবে বুদ্ধ ইন্টারন্যাশনাল সার্কিটে, যেখানে হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ফর্মুলা ওয়ান রেস।

তুষার এবং কারিব, দুজনেই জানালেন এই খেলার পেছনে অর্থ ব্যয় হয় জলের মতো। লাইসেন্স পাওয়া, গাড়ি বানানো থেকে শুরু করে একেকটি রেসে অংশ নিতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তুষার এক বছরের জন্য শাহ সিমেন্টকে পেয়েছিলেন স্পন্সর হিসেবে। তাঁর রেসস্যুটের বুকে ও গাড়িতে ছিল শাহ সিমেন্টের লোগো। কারিব এখনো পাননি কোনো রকম পৃষ্ঠপোষকতা। জানালেন, ‘গত ২৪ মাস ধরে প্রতিমাসে দুই দিনের জন্য হলেও চেন্নাই গিয়ে অনুশীলন করতে হয়েছে। প্রতিবার যাওয়া-আসা, অনুশীলন ট্র্যাকের ভাড়া সব কিছু মিলিয়ে এক লাখ টাকার কাছাকাছি খরচ। তা ছাড়া এই মৌসুমে রেসে নামার জন্য গাড়ি বানানো ও অন্যান্য খরচ দিতে হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা।’ সব মিলিয়ে গত বছর দুয়েকে রেসিংয়ের পেছনে ৫০ লাখ টাকার মতো খরচ করেছেন কারিব। প্রাপ্তি আর্থিক অঙ্কে এখন পর্যন্ত শূন্য।

পারিবারিক সহায়তা পাচ্ছেন বলেই এখনো রেসিং নিয়ে স্বপ্ন দেখা থামাননি কারিব, অপেক্ষা করছেন সবুজ সংকেতের। কিন্তু তুষারে স্বপ্নের গাড়ি আটকে আছে লালবাতির ট্রাফিক সিগন্যালে। সেটা কখন সবুজ হবে, তুষার জানেন না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা