kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

হকি : নির্বাচন নিয়ে ভাবনা

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হকি : নির্বাচন নিয়ে ভাবনা

নির্বাচন নিয়ে ভাবলেই ছোটবেলার ছড়া, ‘জল পড়ে পাতা নড়ে, পাগলা হাতি মাথা নাড়ে’ মনে পড়ে যায়। নির্বাচন স্বাভাবিক একটা প্রয়োজনীয়তা। পানি পড়লে পাতা নড়বে এটা স্বাভাবিক, তবে পাগলা হাতি মাথা নাড়ে, এটা হলো নির্বাচনকে গরম করতে কিছু গরমাগরম কাণ্ডকারখানা অহেতুক প্রচার হতেই থাকে। হকি ফেডারেশনের নির্বাচনে এসব থেকে দূরে থেকে প্রয়োজনীয় কার্যসূচি সামনে রেখে দরকারি আলোচ্য সূচির মাধ্যমে হকিকে এগিয়ে নেওয়ার শপথ নেওয়া নির্বাচিতদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

হকিকে সচল রাখা দরকার। এ মুহূর্তে মাঠে খেলা হচ্ছে। যা আমরা হঠাৎ হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেকেন্ড ডিভিশন, প্রথম বিভাগ, প্রিমিয়ার, যুব চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়মিত রাখতেই হবে। আমাদের সময়ে দর্শকের অভাব ছিল না। এখন হকি শুধু দর্শক টানতে পারছে না তা নয়, খেলোয়াড়ও তৈরি করতে পারছে না। এই ব্যর্থতা জেলাগুলোর। মাঠে প্রথম বিভাগ হকিতে দেশীয় খেলোয়াড়ের স্বল্পতার জন্য বিদেশি খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। রাজশাহী, যশোর, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুর—এসব জেলায় নিয়মিত লিগ হতো, ঢাকার মাঠ কাঁপাত এদের সব নামকরা খেলোয়াড়। এখন ঢাকা জেলাকেই তার দল তৈরিতে অন্য জেলার খেলোয়াড় ধার নিতে হচ্ছে। অন্য সব হকি খেলুড়ে জেলাগুলোরও একই অবস্থা। জাতীয় দল গঠনে সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে বিকেএসপির ওপর। জেলা থেকে চাহিদামতো খেলোয়াড় সরবরাহের অভাবে আজ জাতীয় দল গঠনের ওপর এর ছাপ পড়ছে। নির্বাচন আসছে, জেলার কাউন্সিলর হওয়ার তোড়জোড়, সঙ্গে কাউন্সিলররা যাতে আবার কমিটিতে ভালো একটা চেয়ার পান তার আকুতি, অথচ জেলাতে হকি দলই তৈরিতে নেই কোনো প্রচেষ্টা। নির্বাচকমণ্ডলী এঁদের কাউন্সিলর হওয়ার ওপর কঠোরতা আরোপ করুন।

এ দেশে হকি সেই ১৯০৭ সাল থেকে চলছে। শতবর্ষ বয়সের এই খেলা আজ পর্যন্ত কখনই কাঠামোগত দিক দিয়ে পূর্ণতা পায়নি। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হকি আম্পায়ার মাত্র দু-তিনজন। কেন আরো আন্তর্জাতিক মানের আম্পায়ার তৈরি হবে না? কেন আমাদের কোচরা সব সময় বিদেশি কোচদের পেছন পেছন থাকবেন? হারুন, শুভ, আশিক, কাওসার আলী, নুরুল ইসলাম—এঁরা কোচিংয়ে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। কাওসার আলী, যিনি কোচিংয়ের ওপর যথেষ্ট পড়াশোনা করেছেন। এই মুহূর্তে তিনি বিকেএসপি থেকে অবসর নিয়ে একদম ফ্রি, তাঁকে কেন ব্যবহার করা হচ্ছে না? এই যে আম্পায়ারিং আর কোচিং, এঁদের আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জনে সেভাবে তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা, যাতে উপযুক্ত অর্থ ব্যয়ে এঁদের আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানো যায়। অবকাঠামো তৈরি হতে হলে প্রথম দরকার কৃত্রিম টার্ফের মাঠ। প্রতিটি বিভাগে একটি কৃত্রিম টার্ফ স্থাপন হলো হকির পরিবর্তনের প্রথম শর্ত। আমাদের সময়ের জনজোয়ার না পেলেও, এশিয়া পজিশনে আমরা এখন ষষ্ঠ। বর্তমান হকি কমিটি এ জন্য ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেই। মহিলা হকি খেলোয়াড়রা এখন বিদেশে টিম নিয়ে যাচ্ছে। হকি একটি গতি পেয়েছে। পরিকল্পনা নিতে হবে ‘এ’ টিম, ‘বি’ টিম করার। জাতীয় দলের বাইরে এই ‘এ’ টিম আর ‘বি’ টিম হলে হকি এক আলোচিত এবং সরগরম ফেডারেশনে পরিণত হবে। ক্রিকেটের ৫০ ওভার পেছনে ফেলে টি-টোয়েন্টি এখন সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। হকিতে ফাইভ এ সাইড চালু হয়েছে। দর্শকের আগ্রহ এই ফাইভ এ সাইডে প্রচুর। আমরাও ফাইভ এ সাইডে অংশ নিচ্ছি। আবার আসন্ন ইনডোর এশিয়া কাপে অংশ নেওয়ার জন্য এন্ট্রি করেছি। অথচ ইনডোর হকির মাঠই নেই। হ্যান্ডবল ফেডারেশন, বিকেএসপি সব জায়গাতে হকি ফেডারেশনের কর্মকর্তারা ধরনা দিচ্ছেন অনুশীলনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। ফাইভ এ সাইড দর্শকপ্রিয়, এর জন্য খরচও কম। যুব অলিম্পিকে ফাইভ এ সাইড অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমাদের এই ছোট্ট মাঠের ব্যবস্থা করতেই হবে। একটি মাত্র টার্ফ তাতে কী নেই? মহিলা হকি, উপজাতি হকি, লিগ—সব টুর্নামেন্ট আর এসব নেই কাঠামোর সমাধান একমাত্র ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের হাতে। রহমতুল্লাহ নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর স্থবির হকিকে গতি এনে দিয়েছেন বর্তমান হকির কর্মকর্তারা। তবে প্রতিটি বিভাগে টার্ফ বসানোর জন্য সরাসরি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। হকি একটি টেকনিক্যাল এবং পুরোপুরি ফিটনেসের ওপর নির্ভরশীল খেলা। হকির সভাপতি বিমানবাহিনী প্রধান। তাঁর বিরাট দায়িত্ব। তিনি এই টেকনিক্যাল খেলাটির নাড়ি-নক্ষত্র সাধারণ সম্পাদক থেকেই জেনে নেন। এই খেলাটির সাফল্য ও ভাবমূর্তি নির্ভর করে সাধারণ সম্পাদকের কার্যক্রমের ওপরই। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ—সব কাউন্সিলরের এটা বোঝা উচিত। হকির এই অবকাঠামোর দৈন্যদশা এর আগের মন্ত্রীরাও দেখেছেন, কিন্তু হাজার মাথা কুটেও খুব আশাপ্রদ কিছু হকিতে হয়নি। জাতীয় কবি নজরুল লিখেছেন—

‘বন্ধুগো আর বলিতে পারি না

বড় বিষ জ্বালা এ বুকে

দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি

তাই যাহা আসে কই মুখে।’

হকির উত্তরণের জন্য প্রচুর সেমিনার, প্রচুর লেখালেখি নিয়ত হচ্ছেই, তবে কাঠামোগত উন্নয়ন এখনো শূন্যের কাঠামোতেই ক্রীড়া মন্ত্রণালয় রেখে দিয়েছে। আশা করব, এবার উন্নয়ন ঘটবে। মন্ত্রণালয় নরম হবেন। ধন্যবাদ।

মেজর চাকলাদার (অব.)

(লেখক সাবেক জাতীয় হকি দল অধিনায়ক এবং জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খেলোয়াড়)।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা