kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

গোলে গোলে রাঙিয়ে জীবনের গল্প

সনৎ বাবলা   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গোলে গোলে রাঙিয়ে জীবনের গল্প

গোলের রঙে রাঙিয়ে গেল জীবনের গল্প। আগে এই গল্প এতই রূপ-রসহীন ছিল যে অনাদরে-অনাগ্রহে সরিয়ে রাখতে এক পাশে। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও সাধারণে উৎসাহ জাগেনি নাবিব নেওয়াজ জীবনে। সেই স্ট্রাইকারই এ মৌসুমে পরম কাঙ্ক্ষিত, তাঁকে ছাড়া মাঠে নামার কথা ভাবে না চ্যাম্পিয়নরা। কারণ গোলের সঙ্গে সন্ধি হয়েছে নাবিবের। পুরনো ব্যর্থতা ভুলিয়ে পাঁচটি গোল যেন এই স্ট্রাইাকরের পুনর্জন্ম ঘোষণা করছে।

লিগের ৭ ম্যাচে তাঁর ৫ গোল, সঙ্গে একটি হ্যাটট্রিকও! যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্য এটা দারুণ সাফল্য। তা-ও আবার শেষ ৬ ম্যাচ খেলেছেন শুরু থেকে। আবাহনীর প্রথম ম্যাচের একাদশে থাকলেও পরের ম্যাচে খেলেন বদলি হয়ে। আসলে বদলি খেলাটাই তাঁর নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই বলে আগের মৌসুমগুলোতে মূল একাদশে খেলেননি, তা নয়। তবে সেই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে জায়গা পাকা করতে পারেননি একাদশে। বরং নিত্য গোল মিস তাঁর ক্যারিয়ারকে ফেলে দিয়েছিল ঝুঁকির মুখে। পেছন ফিরে নাবিব নেওয়াজও দেখতে পান গোল মিসের সেই বিভীষিকা, ‘গত মৌসুমে আমি এত মিস করেছি...। ওই রকম মিস না করলে আমি গত বছর ৩০ গোল করতে পারতাম। আসলে গোল করার মধ্যে থাকলে আত্মবিশ্বাস থাকে অন্য রকম, আর মিস হতে থাকলে সহজ সুযোগও নষ্ট হয়ে যায়।’ গত মৌসুমের সেই দিনগুলো এমনই বিবর্ণ ছিল যে লিগে ২১ ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ৪ গোল।

তাঁর সেই ছন্দহীন, গোলহীন ফুটবল ক্যারিয়ারে আবার গোলের প্রবাহ শুরু হয়েছে। সুবাদে আকার্ষণীয় হয়ে উঠেছে এক স্ট্রাইকার জীবন। এ জন্য তাঁর সাবেক সতীর্থ ঘানাইয়ান সামাদ ইউসুফের কাছে বেশ কৃতজ্ঞ ২৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড, ‘আমার পরিবর্তনের জন্য সামাদকে ধন্যবাদ দিতে হবে। সে একদিন বলেছিল আমার মধ্যে সব আছে। শারীরিক শক্তি বাড়াতে এবং প্র্যাকটিসে মনোযোগী হতে বলেছিল সে। সত্যি বললে, ফুটবল ও নিজের ক্যারিয়ারের দিকে আমার মনোযোগও কম ছিল। সামাদের কথার পর নিজেকে বদলাতে শুরু করি। প্র্যাকটিসে বেশি সময় দিই।’ সতীর্থের পরামর্শ পেয়ে মৌসুম শুরুর আগে অনুশীলনে ফাঁকি দেননি এতটুকু। নিজে নিজে শ্যুটিং প্র্যাকটিস করেছেন। বাড়তি সময় কাটিয়েছেন প্র্যাকটিস মাঠে। নিজের কাছেই নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, ‘সবাই পারে, আমি পারি না—এই লজ্জা থেকে বের হতে হবে আমাকে।’ বের হওয়ার তাড়না থেকেই প্র্যাকটিসে ফুটবলকে আলিঙ্গন করে নেন প্রবলভাবে। এরপর ফুটবলও ফিরিয়ে দিতে শুরু করে তাঁকে। গোলে গোলে সার্থক হওয়া শুরু হয় তাঁর স্ট্রাইকার জীবন। রহমতগঞ্জের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর ময়মনসিংহে আরামবাগের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়া আবাহনীকে জিতিয়েছেন দুই গোল করে।

তাঁর জীবনের রংবদলের আরেক কারিগর মারিও লামোস। আবাহনীর এই পর্তুগিজ কোচের ফরমেশন বদলে নাকি নাবিবের পায়ে গোল ফিরেছে। এটা খুব বিশ্বাস করেন তিনি, ‘আগের মৌসুমে আমরা খেলেছি ৪-৩-৩ ফরমেশনে। তখন আমি খেলতাম উইংয়ে, যেটা আসলে আমার জায়গা নয়। মারিও এসে নতুন ফরমেশনে আমাকে খেলাচ্ছেন ১০ নম্বর পজিশনে। এই পজিশনে খেলানোর জন্য আমাকে তৈরি করেছেন, আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন। তিনি না এলে আমার দুর্ভাগ্য হয়তো জারিই থাকত।’ ৪-২-৩-১ ফরমেশনে মূল স্ট্রাইকার নাইজেরিয়ান সানডে চিজোবার ঠিক পেছনে খেলেন এই দেশি স্ট্রাইকার। এখানে খেলাটা দারুণ উপভোগও করেছেন, ‘উত্তর বারিধারায় আমি খেলতাম নাম্বার নাইনে। এখন তার পেছনে খেলছি। সানডের সঙ্গে বোঝাপড়াটাও ভালো হচ্ছে। গোল পাচ্ছি, নিজেও উপভোগ করছি। এখন মনে হয়, বল পোস্টে মারলেই গোল হবে।’ আত্মবিশ্বাস বাড়লে এমনই হয়। কোনো কিছুই আর কঠিন মনে হয় না। ফ্রি কিকে অভ্যাস না থাকলেও আরামবাগের বিপক্ষে করেছেন দুর্দান্ত এক ফ্রি কিক গোল! ৫ বছর ধরে প্রিমিয়ারে খেলে হ্যাটট্রিক করেছেন এই প্রথম! সবই তো নতুন হচ্ছে তাঁর ক্যারিয়ারে!

এই স্ট্রাইকার যেন ফিরে গেছেন সেই ২০১১-১২ মৌসুমে। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে সেবার উত্তর বারিধারার হয়ে ১৫ গোল করে পেয়েছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন। তখন তাঁর পারফরম্যান্সে সবই ছিল। গোলের সামর্থ্য, আত্মবিশ্বাস—সবই ছিল। কিন্তু পরের বছর প্রিমিয়ারের দল বিজেএমসিতে নাম লিখিয়ে পুরো মৌসুমটা কাটিয়েছেন বসে। একদম না খেলে! তখন থেকেই অধঃপতন শুরু, অচেনা হতে থাকে গোলপোস্ট। সাত বছর পর আবার ঠিকঠাক চিনতে শুরু করেছেন, ‘মনে হচ্ছে, স্ট্রাইকার হিসেবে আমার পুনর্জন্ম হচ্ছে। গোলের এই ধারায় আমি পুরো লিগটা শেষ করতে চাই। গোলদাতার তালিকায় ওপরের দিকে থাকতে চাই।’ গোলের এই লড়াইটা অনেক কঠিন। প্রতি দলেই বিদেশি স্ট্রাইকার। তাদের সঙ্গে লড়ে শীর্ষস্থান না পেলেও ক্ষতি নেই। কাছাকাছি থাকলেও এক দেশি স্ট্রাইকারের পুর্নজন্ম সম্পন্ন বলে ধরা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা