kalerkantho

শনিবার । ২০ আষাঢ় ১৪২৭। ৪ জুলাই ২০২০। ১২ জিলকদ  ১৪৪১

খারাপে পুরস্কার ভালোতে তিরস্কার!

মাসুদ পারভেজ    

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খারাপে পুরস্কার ভালোতে তিরস্কার!

বাংলাদেশ দলের চাওয়া ছিল এক রকম, কিন্তু হয়েছে ঠিক এর উল্টো! মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট নিয়ে তাই জাতীয় ক্রিকেটারদের অভিযোগেরও অন্ত নেই কোনো। যদিও ক্রমাগত অভিযোগেও সুফল মেলেনি।

গত বছরের জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফাইনালসহ ত্রিদেশীয় সিরিজের দুটি ম্যাচে বেশ ভুগতে হয়েছিল বাংলাদেশ দলকে। অপ্রত্যাশিত টার্নে বিপর্যস্ত মাশরাফি বিন মর্তুজার দল চেয়েছিল উইকেটে ব্যাটসম্যানদের জন্য সহায়তা। সেই উইকেটেই লঙ্কান স্পিনাররা ছড়ি ঘুরিয়ে স্বাগতিকদের কাছ থেকে শিরোপা কেড়ে নেওয়ার গৌরবে ভাসিয়েছিল দলকে।

এর আগে-পরেও মিরপুরের উইকেট নিয়ে নিয়মিতই অসন্তোষ ছড়িয়েছে বাতাসে। গত অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগের দিনও অধিনায়ক মাশরাফিকে অনিশ্চিত চরিত্রের উইকেট নিয়ে এ রকম বলতে শোনা গেছে, ‘মিরপুরের উইকেট অনুমান করা খুবই কঠিন, আমরা সবাই জানি। এখানে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ শুরু করে উইকেট। আগে থেকে বলা তাই খুবই কঠিন। শুরুতেই যে স্লো হবে বা টার্ন করবে, এমন আশা অবশ্যই করছি না। ভালো উইকেটে খেলতে চেয়েছি, এখন ভালো উইকেট হলেই হয়। কিন্তু মিরপুরের উইকেট তো, আগে থেকে অনুমান করা একটু কঠিনই।’

তার আগের বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) চলাকালীন মিরপুরের উইকেট নিয়ে প্রকাশ্যেই বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন তামিম ইকবালও, ‘এমন নয় যে মিরপুরে কখনো ভালো উইকেটে খেলা হয়নি। ভালো উইকেট বানানোর সামর্থ্য আমাদের আছে। কিন্তু বিপিএল এলেই উইকেটের যে কী হয়, বুঝতে পারি না। উত্তরটা বোধহয় কিউরেটর গামিনি ডি সিলভাই দিতে পারবেন।’

যদিও অনিশ্চিত চরিত্রের উইকেটের ভুক্তভোগী বাংলাদেশ দলসহ বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি হলেও দেশের সর্বোচ্চ ক্রিকেট প্রশাসন এই শ্রীলঙ্কান কিউরেটরকে কখনো জবাবদিহির মুখে ফেলেছে বলে শোনা যায়নি। বরং বাংলাদেশে এই ভূমিকায় প্রায় এক দশক পার করে দেওয়া গামিনির চুক্তিও নবায়ন হয়েছে বারবার। সবশেষ নবায়ন হয়েছে ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে। এই বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত চুক্তিতে তাঁর মাসিক বেতনও বেড়ে গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৫ হাজার ইউএস ডলারে (৪ হাজার ৯২২ ডলার)। অথচ সদ্য সমাপ্ত বিপিএলেই উইকেটের র‌্যাংকিংয়ে সবার শেষে ছিল তাঁর পরিচর্যায় থাকা মিরপুরই। কিছুদিনের জন্য দেশে আসা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলামও তাই বলে গেছেন, ‘ফাইনাল ম্যাচটি বাদ দিলে মিরপুরের উইকেট ছিল জঘন্য।’

এখানেই হয়েছে একের পর এক লো-স্কোরিং ম্যাচ। রানখরা কিছুটা ঘুচেছিল বিপিএলের ষষ্ঠ আসরের সিলেট পর্বে। সেখানে কিউরেটর হিসেবে কর্মরত আছেন ভারত থেকে আসা সঞ্জীব আগরওয়াল। তবে সবচেয়ে বেশি রান হয়েছে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। যেখানকার উইকেটের পরিচর্যার দায়িত্বে আছেন দেশি কিউরেটর জাহিদ রেজা। কোন উইকেট কেমন, তার ভিত্তিতেই কিউরেটরদের পারফরম্যান্সের গ্রাফ নির্ধারিত হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) এ ক্ষেত্রেও আছে বেতনবৈষম্য। বিদেশি কিউরেটররা ইউএস ডলারে আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক পেলেও দেশিদের বেতনের সঙ্গে পার্থক্য অনেক। অনেকটা বিসিবিতে কর্মরত বিদেশি ও দেশি কোচদের বেতনের ফারাকের মতোই।

অবশ্য বিস্তর ডলার ব্যয়ে বিদেশি কোচ না এনেও কোনো উপায় থাকে না বিসিবির। কারণ বিশ্বজুড়ে ক্রমেই ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রিকেট আসরের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কোচের সংকটও। কারণ অল্প সময়ে বেশি উপার্জন করা যায় বলে বছরজুড়ে কোনো দেশের জাতীয় কিংবা অন্যান্য দলের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী হন না অনেক কোচই। যাঁরাও হন, তাঁরাও বড় অঙ্ক চেয়ে বসেন। কোচদের নিয়ে তাই টানাহেঁচড়া থাকলেও কিউরেটরদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তা নয়। নয় বলেই বিসিবিতে এই পদে কর্মরত দেশি-বিদেশিদের বেতনের অঙ্কও কম দৃষ্টিকটু নয়। গামিনি ছাড়াও দুই ভারতীয় কিউরেটর আছেন বিসিবিতে। কালের কণ্ঠের হাতে যে হিসাব এসেছে, তাতে এঁদের মধ্যে সঞ্জীবের মাসিক বেতন ৫ হাজার ইউএস ডলার। আর ৪ হাজার ৫০০ ডলার পান প্রাভীন হিঙ্গানিকার। তিন বিদেশি কিউরেটরের পেছনে সব মিলিয়ে বিসিবির ব্যয় ১৪ হাজার ৪২২ ডলার (১ ইউএস ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা)। অথচ বেতনভুক তিনজন দেশি কিউরেটর, দুজন সহকারী কিউরেটর এবং ১৪ জন গ্রাউন্ডসম্যানসহ ১৯ জনের পেছনে বিসিবির ব্যয় মাসে ৫ লাখ ১৯ হাজার টাকা। বিদেশি কিউরেটরদের মধ্যে সর্বনিম্ন পারিশ্রমিক যেখানে সাড়ে ৪ হাজার ডলার, সেখানে সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া দুই দেশি কিউরেটর শফিউল আলম ও জাহিদ রেজা পাচ্ছেন ৮৪ হাজার টাকার মতো। অথচ পরেরজনের পরিচর্যায় থাকা চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামেই বিপিএলের ষষ্ঠ আসরে হয়েছে সবচেয়ে বেশি রান।

সবচেয়ে কম যেখানে হয়েছে, সেই মিরপুরের দায়িত্বে থাকা গামিনির ভাগ্যে তিরস্কার নয়, জুটে আসছে পুরস্কারই!

মন্তব্য