kalerkantho

গোয়ালার আর্তনাদ কেউ শুনবে না!

নোমান মোহাম্মদ, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে    

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গোয়ালার আর্তনাদ কেউ শুনবে না!

টিনের ছাউনির ছোট্ট হাফবিল্ডিং ঘর। মেরেকেটে আড়াই-তিন শ বর্গফুট। পলেস্তারা খসে পড়া সাদা দেয়াল। একদিকে পুরনো দিনের কিছু ছবি; কিছু ট্রফি। তাতেই শুধু অতীত গৌরবের ফিসফিসানি; বাকি পুরোটাতেই বিবর্ণ বর্তমানের চিৎকার। সাধারণ ঘরের অতি সাধারণ খাটে কাটে তাঁর দিনরাত্রি। মশারি খোলা হয় না কখনো, রাত পেরোলে শুধু তুলে রাখা হয় ওপরে। জীবনের ‘রাত’ ফুরোয় না যদিও।

বিরল কেশ আর ঝুলে থাকা চামড়ায় তাঁর বয়সের ঘোষণা। এই পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় ৮০টি বছর কাটিয়ে দেওয়ার আর্তনাদ। দুবার স্ট্রোক করায় কথা জড়িয়ে যায়। স্মৃতির সঙ্গেও সাপলুডু খেলা চলে অহর্নিশ। বন্ধুর দেওয়া হিয়ারিং এইড কানে গুঁজলেই শুধু শুনতে পান, নইলে শব্দহীন স্তব্ধ তাঁর পৃথিবী। হাতে লাঠি নিলেই শুধু হাঁটাচলা করতে পারেন কিছুটা, নইলে নিশ্চল তাঁর ভুবন। কথা বলার সময় ফোকলা দাঁতের ফাঁক গলে তাই বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। পুরু ফ্রেমের চশমার কাচ হয়ে যায় ঝাপসা।

চিকচিকে চোখের জলে দুঃখের বর্ষা কিছুতেই আড়াল করতে পারেন না কিংবদন্তি ক্রিকেটার রামচাঁদ গোয়ালা।

নাহ্, জাতীয় দলের হয়ে কোনো আইসিসি ট্রফি খেলেননি। খেলেননি আন্তর্জাতিক ম্যাচও। কিন্তু ৫৩ বছর বয়স পর্যন্ত ঢাকা লিগে খেলার যে কীর্তি গোয়ালার, তা আর নেই কারো। রকিবুল হাসান, শফিকুল হক হীরাদের প্রজন্ম থেকে শুরু করে গাজী আশরাফ হোসেন, জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা হয়ে আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম—তিন প্রজন্মের সঙ্গে খেলেছেন মাঠের ক্রিকেট। এই ক্রিকেটই তাঁর ভালোবাসার মন্দির। সেখানে পুজো দিয়েছেন পঞ্চাশ পেরিয়েও।

ব্যাট-বলের ওই ভালোবাসার মন্দিরে জীবন সঁপে দেওয়া ক্রিকেট-সাধক কাল পরাজিতের প্রতিচ্ছবি হয়ে বসে থাকেন মূর্তির মতো। ময়মনসিংহের ব্রাহ্মপল্লী সড়কের ৪ নম্বর বাসায় মাঘের মিষ্টি সকালটা তাতেই কেমন বদলে যায়! প্রকৃতির অর্কেস্ট্রায় অলক্ষ্যে বেজে ওঠে পাতা ঝরার বেদনামাখা করুণ সুর।

‘আমি ভালো নেই। বেঁচে আছি, কিন্তু ঠিক যেন বেঁচেও নেই। হাঁটতে পারি না, কথা বলতে পারি না, শুনতে পারি না। বড় কষ্ট, বড়ই কষ্ট’—হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে গোয়ালার কথায়। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে পড়ার সময় ১৪ বছর বয়সে ক্রিকেট খেলা শুরু করার কথা বলতেই শুধু সেখানে আনন্দের আভা। ঢাকায় ভিক্টোরিয়ার হয়ে খেলা শুরুর আলোচনায় উল্লাসের ঢেউ। ‘আবাহনীর গোয়ালা’ হয়ে মোহামেডানের অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে আউট করার গল্পে উচ্ছ্বাসের রেণু। বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনের শুরুটা যে তাঁর হাতে, সেটি বলার সময়ও কী গৌরব! ৫৩ বছর বয়সে ঢাকায় প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের পাট চুকিয়ে ময়মনসিংহে ফেরার পরও তো মন্দ ছিলেন না। বিয়ে-থা করেননি, তখনো সার্কিট হাউস মাঠ কিংবা পণ্ডিতপাড়া ক্লাবে গিয়ে পড়ে থাকতেন ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে। তাদের শেখানোতেই খুঁজে নেন জীবনের অর্থ।

সে সবই অর্থহীন হয়ে পড়ে দু-দুটি স্ট্রোকে।

‘ভাইয়ের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে থাকি। ওরা সাধ্যমতো দেখভাল করে। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, সে সাধ্য ওদের নেই। ক্রিকেটের সঙ্গে জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম, ওখান থেকে কেউ কি আমার জন্য কিছু করতে পারে না?’—গোয়ালার এ প্রশ্নের জবাব নেই কারো কাছে। একটু থেমে আবার পুরনো দিনের সতীর্থদের স্মরণ করেন তিনি, ‘ববি, জালালরা মাঝেমধ্যে ফোন করে। লিপুও আগে করত। ওরা তো ক্রিকেট বোর্ডে নানা সময় ছিল, আছে। আমার আবাহনীতে খেলার সময়ের সাথি সবাই। আকরামের সঙ্গেও তো খেলেছি। এই দাদার চিকিৎসার ব্যবস্থা চাইলে কি ওরা করতে পারে না? এখন যে বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, তিনিও শুনেছি আবাহনীর সঙ্গে জড়িত। তাঁর কাছেও কি আমি সাহায্যের আবেদন করতে পারি না?’

আর তাঁর বড় আবেদন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। সেটিও কী অধিকার নিয়ে! পুরনো দিনের স্মৃতির কারণেই অমন জোরালো দাবি গোয়ালার, “আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হলেই শেখ হাসিনা মিষ্টি খাওয়াতে ক্লাবে চলে আসতেন। অমনই একবার অন্যদের মিষ্টি খাওয়ানোর পর খোঁজ পড়ে আমার। সবাই জিজ্ঞেস করে, ‘দাদা কই? দাদা কই?’ শেখ হাসিনা জানতে চান, ‘দাদা কে?’ অন্যরা বলে, ‘গোয়ালাদা সবার বড় তো। এ কারণেই আমাদের সবার দাদা।’ এরপর উনি নিজ হাতে আমাকে মিষ্টি খাইয়ে বললেন, ‘আপনি যখন সবার দাদা, তাহলে আমারও দাদা।’ শেখ হাসিনার সেই দাদা চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরে যাচ্ছে—এ খবরটা শুধু আপনারা ওনাকে দিন। আমার বিশ্বাস, তাহলেই উনি আমার শেষ জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকার একটা ব্যবস্থা করবেন।”

তাঁর জীবনের সব স্বপ্ন পেছনে পড়ে গেছে। সব দুঃখ লেখা এখন কালো রাত্রির খামে। বুকের ভেতর একরাজ্য অন্ধকার নিয়ে বসে থাকেন। অসুস্থতা আর দারিদ্র্যে ডুবে যান বিপুল বেদনার অতল জলে। নোনা দেয়ালে ঝোলানো গণেশ ও সরস্বতীর কাছে খোঁজেন সান্ত্বনা। চার-পাঁচ বছর আগে একবার বাংলাদেশ ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থা পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল। সে কথা বলতে গিয়ে কালও কৃতজ্ঞতায় বুজে আসে গোয়ালার কণ্ঠ। আবার পরিচিতজনদের কাছ থেকে দুই-পাঁচ হাজার টাকা করে সাহায্য নেওয়ার সংকোচও পারেন না এড়াতে। শেষ জীবনটা তাই তাঁর ভালোবাসার মন্দির ক্রিকেটের দিকেই খুব করে তাকিয়ে তিনি।

দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আছেন, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় রয়েছে, ক্রিকেট বোর্ড রয়েছে, আবাহনী ক্লাব রয়েছে। কেউ কি রামচাঁদ গোয়ালার ওই আর্তনাদ শুনবেন না!

মন্তব্য