kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

ঋণ দিয়ে উইন্ডিজ সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ

মাসুদ পারভেজ   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঋণ দিয়ে উইন্ডিজ সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ

দাওয়াত পেয়েছেন এবং সেটি খেতে যাওয়ার জোর প্রস্তুতির খবরও পাড়া-পড়শি জানে। কিন্তু দিন-ক্ষণ ঘনিয়ে আসতেই আয়োজক জানালেন তাঁর কাছে বাজার খরচের টাকাই নেই। দাওয়াত ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কায় নিমন্ত্রিত তাই সেই খরচের জোগান দিয়ে তবেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলেন। গত বছরের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়াও অনেকটা এভাবেই।

যে সফরে যাওয়ার মাস দেড়েক আগে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের (সিডাব্লিউআই) প্রেসিডেন্ট ডেভ ক্যামেরন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, এই দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের আর্থিক সংগতি তাঁদের নেই। তবে বিসিবি ঋণ দিয়ে সহায়তা করলে তাঁদের পক্ষে এটি আয়োজন করা সম্ভব বলেও জানান। অন্যথায় সফরটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেওয়ার আভাসও দিয়ে দেন সিডাব্লিউআই প্রেসিডেন্ট।

তাতে নড়েচড়ে বসতে হয় বিসিবিকেও। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ঠাসা ও ব্যস্ত সূচির মাঝে স্থগিত হওয়া সিরিজের ঠাই আবার কবে হবে, তারও কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। বিশেষ করে ২০১৮ সালেই বাংলাদেশের পাওনা অস্ট্রেলিয়া সফর আয়োজনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) অপারগতার কথা জানার ব্যাপারটিও তখন টাটকা। স্পন্সর পাওয়া যাবে না বলে বাংলাদেশকে টেস্ট সফরে আতিথ্য দিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চায়নি বিশ্বের অন্যতম ধনী এই বোর্ড। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরও অস্ট্রেলিয়ার মতো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে বিসিবি সিদ্ধান্ত নেয় সিডাব্লিউআইকে ঋণ দেওয়ার। ক্যারিবীয় বোর্ডের চাহিদা বিপুল হলেও শেষ পর্যন্ত দুই মিলিয়ন ইউএস ডলার ধার দিয়ে দুই টেস্ট এবং তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও যুক্তরাষ্ট্রে যায় বাংলাদেশ।

সফর শুরু হয় টেস্ট দিয়ে। ৪ জুলাই থেকে অ্যান্টিগায় শুরু হওয়া প্রথম টেস্টের বেশ আগেই কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সেখানে চলে যায় বাংলাদেশ দল। টেস্ট দল দেশ ছাড়ে ২৩ জুন রাতে। এর এক মাস আগে (২৪ মে) সিডাব্লিউআইয়ের প্রধান নির্বাহী জনি গ্রেভ আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ চেয়ে চিঠি পাঠান বিসিবিকে। সেই চিঠিতে জানানো হয়, নিজেদের মাঠে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ আয়োজনে তাদের আনুমানিক তিন মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয় হবে। যদিও ক্যারিবীয় বোর্ডের চাওয়া ঋণের অঙ্ক ছিল এর চেয়েও দেড় মিলিয়ন ইউএস ডলার বেশি। যা প্রতিবছর দুই কিস্তিতে আইসিসির কাছ থেকে বিসিবির পেয়ে আসা রাজস্ব আয়ের একটি কিস্তির সমান (সাড়ে চার মিলিয়ন ইউএস ডলার)। বলে রাখা দরকার, বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিবছর জানুয়ারি ও জুলাই মাসে এর রাজস্ব আয়ের অংশ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বণ্টন করে। সেই হিসাবে গত বছর মোট ৯ মিলিয়ন ডলার পাওয়া বাংলাদেশের প্রাপ্তি ২০১৯ সালে আরো বাড়বে বলে কাল জানালেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, ‘আশা করছি, এবার সব মিলিয়ে ১২-১৩ মিলিয়ন ডলার পাব আমরা।’

ক্যারিবীয় বোর্ডকে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও কথা বলতে দ্বিধা করলেন না তিনি। এতে বিসিবির আর্থিক গাঁথুনিও মজবুত বলে দাবি করতে পারছেন নিজাম, ‘আমাদের নগদ প্রবাহ বেশি। তাই ক্যারিবীয় বোর্ডকে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে বিসিবির আর্থিক শক্তিই প্রমাণিত হয়েছে।’ এই ঋণ আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ায় আইসিসিও যুক্ত ছিল, ‘এখানে আইসিসিকে সাক্ষী বলতে পারেন। নিজেদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সিডাব্লিউআই আমাদের অনুরোধ করে। আমরাও দেখলাম যে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এই অর্থ আইসিসির মাধ্যমেই দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় আইসিসিও একটি অংশ। ক্যারিবীয় বোর্ডের রাজস্ব আয়ের ভাগ থেকে কেটে আইসিসি আমাদের অর্থটা দিয়ে দিচ্ছে।’

২০১৮ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্য বার্ষিক দ্বিতীয় কিস্তির ৪.৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বিসিবির সম্মতিতে সিডাব্লিউআইকে দুই মিলিয়ন ডলার দিয়ে দেয় আইসিসি। এই শর্তে যে ২০১৯ সালে ক্যারিবীয় বোর্ডের প্রাপ্য দুই কিস্তির (জানুয়ারি ও জুলাই) প্রতিটি থেকে আইসিসি এক মিলিয়ন ডলার করে কেটে রাখবে। এবং সেই অর্থ জমা করবে বিসিবির কোষাগারে। তবে ধার দিয়ে আতিথ্য নিতে গেলেও বিসিবি যে বিনা সুদে দুই মিলিয়ন ইউএস ডলার দেয়নি, সেটিও নিশ্চিত করেছেন প্রধান নির্বাহী, ‘স্ট্যান্ডার্ড যে ইন্টারেস্ট রেট, সেটিই এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হচ্ছে। এটিকে বলতে পারেন জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিসিবি ৪.৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছে ক্যারিবীয় বোর্ডকে। যেটি দৈনিক ‘প্রো-রেটা’ ভিত্তিতে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পুরোটা পরিশোধে সুদের অঙ্ক আনুপাতিক হারে কমবে, নির্দিষ্ট সময়ের পর শোধ করলে আবার বাড়বেও। তবে আগামী জুলাইয়ে নির্ধারিত সময়েই ঋণের পুরো টাকা সুদসহ ফেরত পাওয়ার কথা আছে বিসিবির। 

গত জুলাইয়ে যে ঋণ না দিলে অস্ট্রেলিয়ার মতো বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরও অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেঁসে যেত!

মন্তব্য