kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

টি-টোয়েন্টির ঝড়

টি-টোয়েন্টিতেও এগিয়ে বাংলাদেশ!

নোমান মোহাম্মদ, সিলেট থেকে   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টি-টোয়েন্টিতেও এগিয়ে বাংলাদেশ!

ছবি : মীর ফরিদ, সিলেট থেকে

বলের গায়ে যেন অদৃশ্য ডানা। উড়ে উড়ে বেড়ায় তা মাঠের চারদিকে। মাথা বাঁচাতে তটস্থ বাউন্ডারি লাইনের ওপারে থাকারা। সিলেট স্টেডিয়ামে কাল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সে অনুশীলনের সময় তা-ও পার হয়েছে নির্বিঘ্নে। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাওয়ার হিটিংয়ে এভিন লুইসের ব্যাট থেকে উড়ে আসা বল গিয়ে পড়ে বিসিবি মিডিয়াবয় মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের মাথায়। তাতে বড় কোনো অঘটন ঘটেনি; কিন্তু দুই দলের অনুশীলনের এ ভিন্ন পরিণতি যেন দুই দলের শক্তির পার্থক্যেরই প্রতিবিম্ব।

ছক্কা মারায় ক্যারিবিয়ানদের চেয়ে বাংলাদেশ যে ঢের পিছিয়ে! দেখুন না, গেল দুই বছরের টি-টোয়েন্টিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা যেখানে মারেন ১৪৭টি ছক্কা, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাট থেকে আসে মোটে ৯২টি ছয়।

ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটের সঙ্গে অন্য খেলাগুলোর তুলনা করলে টেস্টে খুঁজে পাওয়া যায় গলফ, যেখানে আভিজাত্যের ধ্রুপদি ঢিমেতাল ছন্দ। ওয়ানডে হয়তো ফুটবল, যেখানে গতির তোড়ে রোমাঞ্চের পসরা সাজানো। আর টি-টোয়েন্টি হয়তো বক্সিংয়ের দর্পণ। সেখানে শক্তির বড্ড বেশি উন্মত্ত প্রদর্শনী। ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট বনেদিয়ানা হারিয়েছে, রোমাঞ্চ ফিকে—সেসবের জায়গা নিয়েছে আসুরিক শক্তির অশরীরী প্রদর্শনী। এ জায়গায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে বাংলাদেশ যোজন যোজন পিছিয়ে।

কাল সিরিজপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এখানে উন্নতির তাগিদ বাংলাদেশ কোচ স্টিভ রোডসের কণ্ঠেও, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর টি-টোয়েন্টিতে উন্নতির বেশ কিছু জায়গা দেখেছি। যেমন পাওয়ার হিটিং। এ ক্ষেত্রে দারুণ উদাহরণ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওদের শক্তিশালী ক্রিকেটাররা মিস হিটেও ছক্কা মারতে পারে। এ জায়গায় উন্নতি নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি। এ জায়গায়ও বাংলাদেশ আমাকে আবার চমকে দিয়েছে। কারণ ওরা ভালো ছক্কা মারতে পারে। আজও তো দেখলেন, অনুশীলনে লম্বা লম্বা ছয় মেরেছে। এ জায়গায় অবশ্যই উন্নতি হয়েছে। তবে আমরা আরো অনেক উন্নতি করতে চাই।’

তবে বক্সিং তো শুধু শক্তি দিয়ে জেতা যায় না। ঠিক তেমনি টি-টোয়েন্টি জয়ের একমাত্র পূর্বশর্ত ছক্কা মারার ক্ষমতা নয়। বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজের গত দুই বছরের ম্যাচগুলোর কাটাছেঁড়ায় চমকে দেওয়ার মতো কিছু তথ্যও বেরিয়ে আসে। এই সময়ে যেমন বাংলাদেশের ওভারপ্রতি রান (৮.০৪) ওয়েস্ট ইন্ডিজের (৭.৫) চেয়ে বেশি। আবার স্ট্রাইক রেটে একমাত্র এভিন লুইস (১২ ইনিংসে ১৫৭.৭৩) ছাড়া বাকি সব ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানদের চেয়ে বাংলাদেশের মূল ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক রেট বেশি। ১২ ইনিংসে লিটন দাশের ১৩৭.০৫, ১৭ ইনিংসে মুশফিকুর রহিমের ১৩৫.০১, ১৯ ইনিংসে সৌম্য সরকারের ১৩২.৭৪, ২০ ইনিংসে মাহমুদ উল্লাহর ১৩০.৬২, ১৬ ইনিংসে তামিম ইকবালের ১২৮.০৮, ১৫ ইনিংসে সাব্বির রহমানের ১২৭.৪২ এবং ১৫ ইনিংসে সাকিব আল হাসানের ১১৭.৭৭। সেখানে সর্বশেষ দুই বছরে ১৬ ইনিংসে মারলন স্যামুয়েলসের স্ট্রাইক রেট ১১৪.৮৬, ওয়ালটনের ১৪ ইনিংসে ১১৩.০৮, রোভম্যান পাওয়েলের ১৩ ইনিংসে ১০৭.৮, কার্লোস ব্রাথওয়েটের ১১ ইনিংসে ১০৫.৬৯।

২০১৭ সালের শুরু থেকে ২১টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বাংলাদেশ ২০টি। এ সময়ে ছক্কায় ক্যারিবিয়ানরা ঢের এগিয়ে। ইনিংসপ্রতি সাত ছক্কায় মোট ১৪৭ ওভার বাউন্ডারি ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানদের। ইনিংসপ্রতি মাত্র ৪.৬ ছয়ে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বেলায় সংখ্যাটি ৯২। সবচেয়ে বেশি ৩৬ ছক্কা লুইসের, মাত্র ১২ ইনিংসে। স্যামুয়েলসের ২১ ছয় ১৬ ইনিংসে, আন্দ্রে রাসেলের ১৪ ছয় ৪ ইনিংসে এবং সমান ১০টি করে ছক্কা কার্লোস ব্রাথওয়েট (১১ ইনিংস), ফ্লেচার (৯ ইনিংস), দীনেশ রামদিন (৯ ইনিংস) ও ওয়ালটনের (১৪ ইনিংস)। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ১৭ ছক্কা মাহমুদ উল্লাহর, ২০ ইনিংসে। এ ছাড়া ১৯ ইনিংসে ১৪টি সৌম্যর, ১৫ ইনিংসে ১৩টি সাব্বিরের, ১৬ ইনিংসে ১২টি তামিমের, ১২ ইনিংসে ১১টি লিটনের এবং ১৭ ইনিংসে ১১ ছয় সাকিবের।

তবে ছক্কায় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা অনেক এগিয়ে থাকলেও চারে আবার বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জয়জয়কার। সর্বশেষ এই দুই বছরে বাংলাদেশের ২৭২-এর বিপরীতে ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানদের বাউন্ডারি ২১১টি। সবচেয়ে বেশি ৪০টি করে চার তামিম ও মাহমুদের। এ জন্য প্রথমজনের লাগে ১৬ ইনিংস, পরেরজনের ২০। সমান ৩৯টি করে চার মুশফিক (১৭ ইনিংস) ও সৌম্যর (১৯ ইনিংস)। সাকিবের ১৫ ম্যাচে ২৯, সাব্বির ১৫ ম্যাচে ২৭, লিটনের ১২ ম্যাচে ১৯ বাউন্ডারি। ক্যারিবিয়ানদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৮ চার স্যামুয়েলসের। ১২ ইনিংসে ২৫ চার লুইসের, চ্যাডউইকট ওয়ালটনের ১৪ ইনিংসে ২৩; ফ্লেচারের ৯ ইনিংসে ১৫ এবং পাওয়েলের ১৩ ইনিংসে ১২ চার।

দুই দলের তুলনামূলক ওভারপ্রতি এবং স্ট্রাইক রেটের পরিসংখ্যান যেমন কিছুটা অবাক করা, তেমনি সর্বশেষ দুই বছরে চার-ছক্কার শীর্ষে মাহমুদ উল্লাহর নামও বিস্ময়কর। আবার দেখুন এ সময়ে টি-টোয়েন্টিতে তিন ফিফটি মুশফিকের, দুটি তামিমের আর একটি করে লিটন, মাহমুদ, সাব্বির, সাকিব, সৌম্যর। সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লুইস এক সেঞ্চুরির পাশাপাশি তিন ফিফটিতে হয়তো সবচেয়ে এগিয়ে। কিন্তু বাকিদের মধ্যে শুধু ফ্লেচার, নিকোলাস পুরান ও স্যামুয়েলসের একটি করে ফিফটি থাকায় এখানেও লাল-সবুজের ব্যাটসম্যানদের খুব পিছিয়ে রাখার উপায় নেই। আবার ছক্কা-চার মিলিয়ে সর্বশেষ দুই বছরে বাংলাদেশের রান ১৬৪০, ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছে ১৭২৬। এখানেও তো আলোকবর্ষ পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ।

অস্বীকারের উপায় নেই, ক্যারিবিয়ান দানবরা নিজেদের দিনে টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ফয়সালা করে দিতে পারেন একাই। কিন্তু গত দুই বছরের পারফরম্যান্সের বিশ্লেষণে তো স্পষ্ট, অমন দিন খুব ঘন ঘন আসে না তাঁদের। আবার ছক্কায় পিছিয়ে থাকলেও চার, ওভারপ্রতি রান, স্ট্রাইক রেটে এগিয়ে বাংলাদেশ।

কুড়ি-বিশের ক্রিকেটে লাল-সবুজের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে তাই বারুদ লুকানো আছে ঠিকই। আজ তাতে আগুনের ছোঁয়া লাগলে আসুরিক শক্তির সঙ্গেও সমানে সমান টক্কর দিতে পারবে বাংলাদেশ।

মন্তব্য