kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

হেমন্তে থেমে যাচ্ছে বসন্তদিনের গান!

নোমান মোহাম্মদ   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হেমন্তে থেমে যাচ্ছে বসন্তদিনের গান!

ছবি : মীর ফরিদ

বিষাদের বিউগল বাজছে অলক্ষ্যে। কিন্তু আয়োজনের আড়ম্বর নেই।

চাপা গোঙানি আছে আবহে। কিন্তু আর্তনাদের চিৎকার নেই।

কান্নার কাঁপন রয়েছে হৃদয়ের গহিনে। কিন্তু অশ্রুর আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ নেই।

অথচ এই হেমন্তদিনেই হয়তো দেশের মাটিতে থেমে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বসন্তদিনের গান। মাশরাফি বিন মর্তুজা যাঁর নাম।

নিশ্চিত করেননি তিনি। দিন কয়েক আগে তাঁর রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলনে ফাঁক রাখেন ‘বিশ্বকাপের পর পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকলে তা করব’ বলে। কাল সিরিজপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে প্রথম প্রশ্ন, ঘরের মাঠে এটি শেষ সিরিজ কি না। উত্তরে আগের অবস্থানে অবিচল মাশরাফি, ‘বলা কঠিন, আসলে ভবিষ্যতের কথা তো বলা যায় না।’ তা-ই যদি হয়, তাহলে কী মানসিকতা নিয়ে খেলবেন ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে—এমন সম্পূরক প্রশ্নেও চিত্রাপারের সন্তানের হৃদয়ের ঢেউ ঠাহর করা যায় না, ‘আমার কোনো দিন মাইন্ডসেট থাকে না। আগে থেকে ঠিক করে কিছু করি না। দেখা যাক, সামনে কী হয়!’

সেই সামনে বলতে আপাতত বাতিঘর ২০১৯ বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের সেই আসরের আগে নিউজিল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড সফরে যাবে বাংলাদেশ। মাঝের সময়টায় ঘরের মাঠে আর কোনো সিরিজের সূচি তো নেই লাল-সবুজের। ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে সিরিজটাই তাই দেশের মাটিতে নড়াইল এক্সপ্রেসের শেষ স্টেশন হয়ে যেতে পারে। ফর্ম এখনো আড়ি নেয়নি সত্যি। কিন্তু পঁয়ত্রিশ পেরোনা মাশরাফি, রাজনৈতিক অঙ্গনে নাম লেখানো মাশরাফি বিশ্বকাপের পরও জাতীয় দলে খেলা চালিয়ে যাবেন—আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তা কল্পনা করা কঠিন।

সে কারণেই তো নিজে নিশ্চিত না করলেও প্রকৃতির ওই আয়োজন। ১৭ বছর আগে ১৮ বছরের এক তরুণের পথচলার শুরুতে তাঁকে স্বাগত জানায় হেমন্তদিনের শিশিরমালা। আর কী আশ্চর্য, দেড় যুগ পরের বিদায়ের প্রস্তুতিও ওই রূপসী ঋতুর রুপালি কুয়াশার অলংকারে।

এক দিক দিয়ে অবশ্য বড্ড দুর্ভাগা মাশরাফি। বাংলাদেশ লাল-সবুজ জার্সির জন্য দেড় যুগে শ্রম-ঘাম সব নিংড়ে দিয়েছেন; কিন্তু বিদায়টা দেশের মাটিতে হলো না। আর তা তো শুধু ওয়ানডে নয়, সব ফরম্যাটেই। ৩৬ টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বশেষটি খেলেন ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে। আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেননি কখনো, তবে ৯ বছর আগের সেই ‘সর্বশেষ’ যে ‘শেষ’ টেস্ট হয়ে গেছে, এ নিয়ে সংশয় সামান্য। টি-টোয়েন্টি থেকে সরে দাঁড়ান অবশ্য ঘোষণা দিয়েই। গত বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের সময়কার সে সিদ্ধান্ত কতটা স্বেচ্ছায়, কতটা কর্তাদের ইচ্ছায়—এ নিয়ে প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি আজও। এরপর থাকে বাকি শুধু ওয়ানডে। কিন্তু ২০১৯ বিশ্বকাপকে লক্ষ্য ধরে এগোনোয় এই ফরম্যাটের শেষটাও এখন পর্যন্ত বিদেশের মাটিতেই দেখা যাচ্ছে।

ঘরের মাঠে নিজের সম্ভাব্য শেষটা রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য এ সিরিজে কি তাই সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবেন না মাশরাফি?

এমনিতে অনেক সময়ই তাঁর অধিনায়ক সত্তার আড়ালে পড়ে যায় বোলার সত্তা। অথচ ২০১৪ সালে এ দফায় অধিনায়ক হওয়ার পর ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি মাশরাফি। ৬০ ম্যাচে তাঁর ৭৮ উইকেট। ৫৬ ম্যাচে ৭৩ শিকারে দ্বিতীয়তে সাকিব আল হাসান। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজটি অবশ্য ভালো কাটেনি মোটেই। তিন ম্যাচে ২৮ ওভার বোলিং করে ১৬০ রান দিয়ে নেন মোটে এক উইকেট। এমন পারফরম্যান্সে এশিয়া কাপ থেকে বয়ে আনা ইনজুরির দায় অনেকখানি। তা ঝেড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শতভাগ ফিটনেস এবং শতভাগ ফর্মে ফেরার প্রত্যয় কাল জানিয়ে যান মাশরাফি, ‘এশিয়া কাপের ইনজুরি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে ভোগাচ্ছিল। এখন চেষ্টা করছি ১০০% ফিট হওয়ার। অনুশীলন করছি পুরোদমে। আশা করছি, সব ঠিক থাকবে।’

এশিয়া কাপের সেই ইনজুরি কোন ছার! এর চেয়ে কত ভয়ংকর সব গ্রহণকাল এসেছে তাঁর ক্যারিয়ারে। দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচারই তো সাতবার। কিন্তু ক্রিকেট মাঠে মৃত্যুঞ্জয়ীর প্রতীক হয়ে বারবার প্রত্যাবর্তন মাশরাফির। এই করতে করতেই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে আড়াই শ উইকেট নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির মুকুট হয়ে যায়। আজ দেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে দুই শ ওয়ানডে খেলার রেকর্ডের দুয়ারে যান দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে অবশ্য দুটি ম্যাচে এশিয়া একাদশের হয়ে আফ্রিকা একাদশের বিপক্ষে। রেকর্ডটির কথা মনে করিয়ে দিতেই কাল একটু যেন উচ্ছ্বাস খেলে যায় মাশরাফির কণ্ঠে, ‘ধন্যবাদ মনে করার জন্য। আমার আসলে এটি খেয়াল ছিল না।’ পরক্ষণেই সামলে নিয়ে গুরুত্বের আসন ছেড়ে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচটিতেই, ‘আগেও বলেছি, এসব রেকর্ড আমাকে তেমন স্পর্শ করে না। এদিক থেকে ভালো লাগছে যে, বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে ২০০ ম্যাচ হচ্ছে। পরবর্তীতে একটা সময় মানুষ যখন তা বলবে, তখন অবশ্যই ভালো লাগবে। কারণ এটি এক অর্জন। কিন্তু এখন কালকের (আজকের) ম্যাচের ওপরে আর কিছুর গুরুত্ব নেই। আমার নিজের রেকর্ডের কথা চিন্তা করে খেলার সুযোগ নেই। বরং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচটি জেতার দিকেই সব মনোযোগ।’

এটাই মাশরাফি। যাঁর কাছে সবার আগে দেশ। সব কিছুর আগে দল। এমন একজনের দেশের মাটিতে সম্ভাব্য শেষে কোনো বাহ্যিক আয়োজন থাকবে না সত্যি। কিন্তু প্রকৃতি ঠিকই বাজাবে তার বিদায়ের অর্কেস্ট্রা। হেমন্তের শিশিরে। কুয়াশার আদরে। সে শিশিরের টুপটাপ শব্দে মিলিয়ে যাবে হয়তো মাশরাফির কান্না। কুয়াশায় আড়াল হয়ে রইবে মাশরাফির ভেজাচোখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা