kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

স্বপ্নপূরণে অক্লান্তে ছুটে চলা বাবা

২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্রিকেটাঙ্গনের প্রায় প্রতিটি অলিগলির খোঁজখবর জানা একজন কিছুদিন আগে গিয়েছেন শহীদুল ইসলামের বাসায়। সেখানে গিয়েই এক ক্রিকেটারকে দেখে তাঁর জিজ্ঞাসা, ‘এই প্লেয়ার আপনার বাসায় কেন?’ বাধ্য হয়েই তখন অত্যন্ত সচেতনে লুকিয়ে রাখতে চাওয়া ব্যাপারটি খোলাসা করতে হয়েছে শহীদকে।

যিনি বাংলাদেশের সেই যুগের ক্রিকেটারদের কাছে ‘শহীদ ভাই’। আর এ যুগের উঠতি ক্রিকেটাররা তাঁকে ডাকেন ‘শহীদ আংকেল’ নামেই। ‘সেই যুগ’ বলতে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার আগে-পরের সময়কার আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, হাবিবুল বাশার ও মাশরাফি বিন মর্তুজারা। এর পরের সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদ উল্লাহরাও ডাকেন ‘শহীদ ভাই’ বলেই।

আর এই তারকাদের আদর্শ মেনে ক্রিকেটখ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা আজকের খুঁদে ক্রিকেটাররাও বয়সভিত্তিক পর্যায়ে পা রেখেই পেয়ে যায় ‘শহীদ আংকেল’কে। একাধারে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বেশ কয়েকটি প্রজন্মের ক্রিকেটার হওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত শহীদ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) চাকরিতে থিতু হয়েছেন ২০০৪ সাল থেকে। এখন গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। চাকরির আগে বিসিবিতে কাজ করতেন দৈনিক ভিত্তিতে। সেই সময় তাঁর ভূমিকাটা ছিল মূলত জাতীয় দলের সমন্বয়কের। ২০০০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের সময়ও তা-ই ছিলেন।

নিজের ঘরেও একজন টেস্ট ক্রিকেটার তৈরির স্বপ্নের বীজ বোনা তখনই। নিজের দুই ছেলের সবচেয়ে বড়টির বয়স তখন সবে চার-পাঁচ বছর। কখনো কখনো নিয়ে গেছেন মাঠেও। আরেকটু বড় হতেই দিয়েছেন ক্রিকেটের পাঠ। অন্য বাবাদের মতো তিনিও ছেলের পিঠে স্কুলব্যাগ উঠিয়ে দিয়েছেন যেমন, তেমনি পাশাপাশি ক্রিকেট কিট ব্যাগও। আস্তে আস্তে সেই ক্রিকেট স্বপ্নের বীজ থেকে জন্ম নেওয়া চারাগাছ বড় হয়েছে একটু একটু করে। ১৮ বছর পর টেস্ট ক্রিকেটের বাংলাদেশ যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, তখন পায়ের নিচে জমিন খুঁজে নিয়েছে শহীদের স্বপ্ন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২২ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া সিরিজের প্রথম টেস্টের দলে যে জায়গা করে নিয়েছেন তাঁর ছেলে সাদমান ইসলাম। বাবা যেহেতু বিসিবিরই চাকুরে, তাই অনেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শহীদ-সাদমানের সম্পর্কটি জানে। যারা জানে না, শহীদ মনেপ্রাণে চেয়েছেন তাদের কাছে ব্যাপারটি অজানাই থাকুক। পাছে কেউ এই কথা বলার সুযোগ না পায় যে ‘বাবা আছে বলেই...’। তাই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের নানা পর্যায়ে বিভিন্ন দলে নিজের ছেলে থাকলেও সব সময় একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে গেছেন। তাই বলে নিজের ঘরে টেস্ট ক্রিকেটার তৈরির স্বপ্নপূরণে অক্লান্তে ছুটে চলা থামাননি।

বড় স্বপ্নের পিছু ধাওয়ায় ছেলেকে উসকে দিয়েছেন প্রতিনিয়ত। তাঁর চোখের সামনে দিয়ে ছোট থেকে বড় হওয়া ক্রিকেটারদের কতজনকে সাফল্যের চূড়া ছুঁতে দেখেছেন! কাছ থেকে দেখেছেন বলেই সেই সব ক্রিকেটারের সংযত ব্যক্তিজীবনের গল্প বলে ছেলেকে শৃঙ্খলার গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছেন নিয়মিতই। তারকা ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ারে আসতে পারে—এমন সম্ভাব্য ঘাত-প্রতিঘাত নিয়ে আগাম ধারণা দেওয়াটাও ছেলের ক্রিকেট ভবিষ্যেক মসৃণ করতে পারে।

ছেলেকে যে টেস্ট ব্যাটসম্যান হতে বলেছিলেন, সেটিও মাঠের ক্রিকেট থেকে নেওয়া শিক্ষা থেকে।

কী সেই শিক্ষা? শুনুন শহীদের নিজের মুখ থেকেই, ‘‘বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট চলছে। আমি তখন জাতীয় দলের কো-অর্ডিনেটর। সকালবেলা বাংলাদেশ ২-৩ উইকেট হারিয়েছে, এমন সময় ম্যানেজার লতিফ ভাই এসে বললেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ম্যানেজার তো মুসলিম। উনাকে একটা কোরআন শরিফ উপহার দেব। যাও, একটা কিনে নিয়ে আসো।’ বায়তুল মোকাররম থেকে সেটি কিনে আনতে আমার ঘণ্টা দেড়েকের মতো লেগেছিল। এসে দেখি বাংলাদেশ অল আউট। ছেলেকে উইকেটের মূল্য বুঝতে শেখানো এবং টেস্ট ব্যাটসম্যান হতে বলার পেছনে ওই ঘটনার অনেক বড় প্রভাব।’’

সেই প্রভাবে প্রভাবিত ছেলে সাদমানের গায়ে তাই অনেক আগে থেকেই সেঁটে আছে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ উপযোগী ব্যাটসম্যানের তকমা। যদিও ছেলের টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়ার আনন্দে বাবার প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ কোনো আবেগের সৌরভ মাখা নেই। এ জন্যই যে ‘‘দেখুন, বয়সভিত্তিক পর্যায়ের কোনো ক্রিকেটারকেই আমি ‘তুমি’ বলতে পারি না। সবাইকেই ‘তুই’ বলি। বলি সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাশরাফিদেরও। সবাইকেই আমার নিজের ছেলে মনে হয়। সাদমান টেস্ট দলে জায়গা পাওয়ার পর মনে হচ্ছে আমার আরেকটি ছেলে সুযোগ পেল।’’

অনুশীলন শিবিরে অনেক ক্রিকেটারকে পিতৃস্নেহে লালনের কত ঘটনাও জমা শহীদের স্মৃতিতে! তেমনই একটি এ রকম, ‘সামনে পরীক্ষা বলে মুশফিক কিছুতেই অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ক্যাম্পে যোগ দেবে না। ওর জন্য টিচার রাখা হবে বলে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ক্যাম্পে আনা হলো। কিন্তু টিচার রাখতেও তো সময় লাগে। এর আগ পর্যন্ত কখনো কখনো আমি নিজেই ওকে নিয়ে পড়াতে বসেছি।’ এমনিতে খুব ভদ্র মনে হলেও বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ‘দুষ্টুকুল শিরোমণি’ মাহমুদ উল্লাহকেও খুব মনে আছে শহীদের।

একটু বেশিই মনে আছে জেদি মুশফিককে, ‘‘বয়স পরীক্ষার জন্য মুশফিকসহ আরো বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে নিয়ে গেছি অ্যাপোলো হাসপাতালে। জানেন তো, ডাক্তারি পরীক্ষার সময় কাপড়-চোপড় খুলতে হয়। তা মুশফিকের পালায় দেখি ভেতর থেকে ধুপধাপ শব্দ। ভেতরে ঢুকে দেখি ও প্রায় ভাঙচুর শুরু করে করে অবস্থা। ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলছিল, ‘ক্রিকেট খেলছি বলে কি ইজ্জত বিকিয়ে দেব নাকি? খেলব না ক্রিকেট!’ সেই তখন থেকেই মুশফিকের আত্মসম্মানবোধ এ রকম প্রবল ছিল।’’

প্রবল শহীদেরও। তাই ছেলে সাদমানের উত্থান নিয়ে কোনো প্রশ্নই রাখতে চাননি। চাননি বলেই বাবা-ছেলের পরিচয়ও প্রকাশ্য ছিল না খুব। সে জন্যই তো তাঁর বাসায় সাদমানকে দেখে বিস্মিত হতে হয়েছে ক্রিকেটাঙ্গনের চেনামুখকেও!

মন্তব্য