kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিষণ্ন নাম শেখ রাসেল

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

১৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিষণ্ন নাম শেখ রাসেল

শেখ রাসেল : জন্ম ১৮ অক্টোবর ১৯৬৪, মৃত্যু ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। অঙ্কন: প্রসূন হালদার

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে শহীদ শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন আজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট ভাই শেখ রাসেলের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু ভবনে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছর থেকে দিনটি ‘শেখ রাসেল দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। আজ সরকারি অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গসংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে

রাজনৈতিক কারণে ১০ বছরের শিশু হত্যা দৃষ্টান্তরহিত। রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা নজিরবিহীন নয়। কিন্তু শিশু হত্যা? না, এমন কোনো ঘটনা ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর আগে বা পরে ঘটেনি। অবাক করা দেশ বাংলাদেশ; এ দেশে এমন ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাটি তো অমোচনীয় ইতিহাস—বাঙালির কলঙ্কের ইতিহাস। বাঙালির গর্বের ইতিহাস যেমন সত্য, তেমন সত্য বাঙালির কলঙ্কের ইতিহাস, যার সূচনা জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে। হত্যাকারীরা চেয়েছিল জাতির জনককে সবংশে নির্মূল করতে; যে কারণে রাসেল হত্যা। রাসেল আয়ু পেলে, পরিণত মানুষ হতে পারলে, সে নিশ্চয়ই হয়ে উঠত আরেক বঙ্গবন্ধু, যার প্রমাণ আজকের শেখ হাসিনা। জানা কথা, রাসেল ও শেখ হাসিনার ধমনিতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত-প্রণোদনা। হাসিনা-রেহানাকে নাগালের মধ্যে পেলে হত্যাকারীরা রাসেলের মতো তাঁদেরও লোকান্তরে পাঠিয়ে দিত। ভাগ্যিস তাদের কুিসত হাতে ট্রিগার টেপা বন্দুকের বুলেট জার্মানি পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি। বোধগম্য, রাসেলকে হত্যা করা হত্যাকারীদের জন্য বিকল্পহীন প্রয়োজন ছিল। বঙ্গবন্ধুকে বিনাশ করতে হলে শুধু ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে বিনাশ করলে চলত না, বিনাশ করতে হতো গোটা পরিবারসুদ্ধ, তাইতো হয়েছিল; রচিত হয়েছিল বাঙালি ইতিহাসের তমসাচ্ছন্ন অধ্যায়। তমসা দিন দিন গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছিল, বিরাজমান ছিল অনেক দিন। সে তো অন্য ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। তবে নিকষ কালো সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রশ্মির মতো হারানো বাংলাদেশ ফিরেছে সাম্প্রতিক সময়ে তা বেশ কিছু ব্যত্যয়-বিচ্যুতি সত্ত্বেও।

বঙ্গবন্ধুর খুনিরা পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। কাজেই তাদের মগজে-মননে পাকিস্তানি প্রশিক্ষণের রেশ ছিল। সুতরাং বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, এমনকি শিশু রাসেলকেও। তবে তারা ইতিহাসের শিক্ষা নেয়নি; হত্যায় তাৎক্ষণিক সফল হলেও চূড়ান্তভাবে তারা পাকিস্তানের মতো হেরে গেছে—তার প্রমাণ আজকের বাংলাদেশ। আজকের বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু, রাসেলসহ ১৫ই আগস্টের সব শহীদ অমর। আর আত্মস্বীকৃত খুনিদের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। শহীদরা পান আমাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা; আর খুনিরা পায় ঘৃণা, নিরন্তর ঘৃণা।

লক্ষণীয়, বঙ্গবন্ধুর অন্য সন্তানদের নাম বাঙালি-মুসলমানি; কিন্তু ছোট সন্তানের নাম ইংরেজি রাসেল হলো কেন? ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। আজীবন-অনুক্ষণ বাংলা ও বাঙালিলগ্ন বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলের নাম ইংরেজি হওয়ার কারণ ও পটভূমি আছে। বঙ্গবন্ধু পশ্চিমের ইংরেজ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত ছিলেন, প্রথম জীবনে ততটা না হলেও পরিণত বয়সে মানববাদী রাসেলের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করতেন। কারণ রাসেল ‘কমিটি অব হানড্রেড’ করে বিশ্বশান্তির পক্ষে কাজ করছিলেন। বঙ্গবন্ধু পড়তেন রাসেল, পড়াতেন স্ত্রীকেও। তবে স্ত্রীকে পড়াতে হলে ইংরেজি বাক্য বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক বাংলা অনুবাদ করতেন। কাজেই রাসেলচর্চা একক ছিল না; ছিল দ্বৈত, দাম্পত্যিক। এমন নজির আমাদের খুব কমই আছে। বার্ট্রান্ড রাসেল চেতনায় এমনভাবে আচ্ছাদিত মানসিকতার দম্পতির সন্তানকে যে

রাসেল নাম দেওয়া হবে—সেটাই স্বাভাবিক ছিল।

রাসেলের স্মৃতিচারণা করার এ পর্যায়ে তার জীবনের কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যেতে পারে। জন্মদিন ১৮ অক্টোবর ১৯৬৪। জন্ম ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাড়িতে। জন্মক্ষণ নিশুতি রাত দেড়টায়।

বাড়িতে পারিবারিক কুকুরটির নাম ছিল টমি। বাড়ির সবার আদরের কুকুর। টমিকে আদর করে, খাবারের ভাগ দিয়ে, খেলে রাসেলের বেড়ে ওঠা। একদিন খেলার সময় টমি ঘেউ ঘেউ করলে রাসেল ভয় পেয়ে যায়; বড়দের কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করে, টমি তাকে বকা দিয়েছে। ছোট্ট রাসেলের কাছে টমির ঘেউ ঘেউ বকাই ছিল। অবশ্য জন্মলগ্ন থেকে রাসেল তার হাসুপার  (শেখ হাসিনা) ন্যাওটা ছিল। যাকে বলে কোলে-পিঠে মানুষ করা, তা করেছিলেন এই হাসুপা। রাসেল হাসুপার চুলের বেণি ধরে নাড়াত আর খিলখিলিয়ে হাসত। হাসুপা তাকে এক দিনে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা জানাচ্ছেন এক বেদনাদায়ক কিন্তু হাস্যকর তথ্য। রাসেল জন্মের পর থেকে পিতার সান্নিধ্য খুব একটা পায়নি; বঙ্গবন্ধু তো হরহামেশা কারাগারেই থাকতেন। ১৫ দিন পর পর পারিবারিক সাক্ষাৎ হতো; তা-ও আবার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। সাক্ষাতের সময় রাসেল তার আব্বার সঙ্গে কী করত, সে কথায় পরে আসছি। ‘বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।’ (আমাদের ছোট্ট রাসেল সোনা)

রাসেলের মাছ ধরার শখ ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার, সে মাছ ধরেই আবার পুকুরে ছেড়ে দিত। মাছ ধরাই ছিল তার খেলা। মুক্তিযুদ্ধের সময় হাসিনাপুত্র জয়ের জন্ম হলে রাসেল মহাখুশি। কারণ জয় হয়েছিল তার খেলার সাথি। তখন ওর বয়স সাত। সদ্যোজাত জয় আর সাত বছরের রাসেলের মধ্যে সখ্য ছিল দারুণ।

 

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) বইয়ে রাসেলের কথা দুইবার লিখেছেন। ১১ জানুয়ারি ১৯৬৭-তে লিখলেন, ‘দেখা করতে এলে রাসেল আমাকে মাঝে মাঝে ছাড়তে চায় না। ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে কষ্ট হয়।’ (২০১) তিনি ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭ লিখেছেন, “... ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে,  ‘আব্বা বালি চলো।’ কী উত্তর ওকে আমি দেব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়! কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে।

দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনো বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।” (২৪৯) পিতা ও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রের আন্তঃসম্পর্কের যে দৃশ্যপট এ বাক্যগুলো তৈরি করে, তা মন ছুঁয়ে যায়।

১৫ই আগস্ট ভীতসন্ত্রস্ত রাসেল কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল। মায়ের মরদেহ দেখার তার আকুতি ছিল, আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দাও। এরপর যা ঘটেছিল তার বর্ণনা আছে ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মোহিতুল ইসলামের ভাষ্যে, “রাসেল দৌড়ে এসে আমাকে জাপটে ধরে। আমাকে বলল, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’ ওর সে কণ্ঠ শুনে আমার চোখ ফেটে পানি এসেছিল। এক ঘাতক এসে আমাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে ভীষণ মারল। আমাকে মারতে দেখে রাসেল আমাকে ছেড়ে দিল। ও তখন কান্নাকাটি করছিল যে ‘আমি মায়ের কাছে যাব, আমি মায়ের কাছে যাব।’ এক ঘাতক এসে ওকে বলল, ‘চল তোর মায়ের কাছে দিয়ে আসি।’ বিশ্বাস করতে পারিনি যে ঘাতকরা এত নির্মমভাবে ছোট্ট সে শিশুটাকেও হত্যা করবে। রাসেলকে ভিতরে নিয়ে গেল এবং তারপর ব্রাশফায়ার।” ১৯৮৫-তে অ্যান্থ্থনি ম্যাসকারেনহাস কর্নেল রশিদকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ছোট এই শিশুকেও আপনাদের কেন হত্যা করতে হয়েছিল?’ দাম্ভিক উত্তর ছিল, ‘শেখ মুজিবকে সবংশে নির্মূল করার জন্য রাসেলকে হত্যা করা দরকার ছিল।’

আমাদের কাছে এখন বিষণ্ন স্মৃতি হলেও বেঁচে থাকতে রাসেল ছিল মিষ্টি হাসির শিশু। এমন মিষ্টি হাসি বঙ্গবন্ধুরও ছিল। হাসির মিষ্টতা মনের মিষ্টিকে ফুটিয়ে তোলে। রাসেলের মিষ্টি হাসি দেখেই কী বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘শিশু হও। শিশুর মতো হাসতে শেখো। সারা দুনিয়ার ভালোবাসা পাবে।’ মিষ্টি হাসির রাসেল, তোমাকে আমাদের ভালোবাসা। সারা দুনিয়ার ভালোবাসাও তোমার জন্য। সারা দুনিয়ার মানুষ জানে এত কম বয়সে আর কেউ এমন মর্মান্তিকভাবে রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়নি। তোমার আকুতি ছিল মায়ের কাছে যাওয়ার, নিদেনপক্ষে জার্মানিতে হাসু আপার কাছে। ঘাতক তোমাকে পাঠিয়েছিল; তবে তোমার মিনতি করা কারো কাছে নয়, লোকান্তরে। লোকান্তরিত রাসেল তুমি চিরঞ্জীব, আমাদের মনের মণিকোঠায়।

লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)



সাতদিনের সেরা