kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আপনার প্রত্যাবর্তন আজও শেষ হয়নি

ড. আতিউর রহমান

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আজ আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জন্মদিন। করোনা সংকটকাল এখনো চলছে। তাই গতবারের মতো এবারও তাঁর জন্মদিন পালন করতে হচ্ছে মহামারির স্বাস্থ্যঝুঁকি আর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দ্বৈত সংগ্রামের মধ্যেই। তবে এই বিশেষ পরিস্থিতির কারণেই তাঁর জন্মদিনটি আমাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়। কারণ এই যে এমন ব্যাপকভিত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেও আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছি, আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাগুলো আমাদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করছে—এসবের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হচ্ছে শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও গণবান্ধব নেতৃত্বের গুণাবলি। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে প্রেরণাদায়ী এই নেত্রী সামনের সারিতে দাঁড়িয়েই অর্থনৈতিক মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আর সে কারণেই আমাদের আর্থ-সামাজিক ভিত্তি এবং সামাজিক পুঁজিগুলো এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে যে আমরা অন্য  বেশির ভাগ দেশের চেয়ে ভালোভাবে চলমান দুর্যোগ মোকাবেলা করতে সক্ষম হচ্ছি। তবে এই জাতির পুনরুত্থানে আশা-জাগানিয়া এই নেতৃত্ব দিতে তিনি শুরু করেছেন আরো অনেক আগে থেকেই। সেই ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে। ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে এ দেশ যখন বেপথু হয়ে গিয়েছিল, তখন আমাদের জন্য আশার আলো হয়ে দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নানা প্রতিকূলতা পায়ে দলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে। ক্ষমতায় এসেই শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর দেখানো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অভিযাত্রা। কিন্তু ২০০১-এ অপশক্তির চক্রান্তে তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন, তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তাঁকে অন্যায়ভাবে কারাবরণ করতেও হয়েছে। এ ছাড়া জঙ্গিদের আক্রমণসহ বহু বাধা মোকাবেলা করেই এগোতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে। এমন ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা নিয়েই এ জাতির হাল তিনি ধরেছিলেন। বিস্তর বাধা পারি দিয়েই গত এক যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু পদ্মা সেতুসহ এক গাদা মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন, মানুষের আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ও প্রবাস আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য নিরসন, জীবনের আয়ু বৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক সূচকের বিচারেই নয়, সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করার ক্ষেত্রেও তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বের সামনে নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয়েছে।

 ১৯৭১-এর ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু যেমনটি বলেছিলেন—‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’—তাঁর সেই কথাগুলোই যেন অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে দেখাচ্ছেন তাঁর কন্যা। বাঙালি আজ আর পিছিয়ে নেই কোনো ক্ষেত্রেই। বরং সব ক্ষেত্রে বাকি বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি করোনা সংকট মোকাবেলা করেই বাংলাদেশ এমন সাফল্য অর্জন করে চলেছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অভিযোজন ও প্রশমন—এই দুটি ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বাকি পৃথিবীর জন্য আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

তাঁর প্রণীত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা’ দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুবান্ধব উন্নয়নের পথনকশা হিসেবে বাংলাদেশকে যেমন এগিয়ে নেবে, তেমনি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারবদ্ধতার দৃষ্টান্ত হিসেবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনীতিতেই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামকের ভূমিকা পালন করবে। একই কথা খাটে খসড়া পর্যায়ে থাকা ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যানে’র ক্ষেত্রেও। আর এসব উন্নয়নের জন্য চাই টেকসই অর্থায়ন। সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অগ্রগামীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সত্যিই অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে টেকসই উন্নয়ন, সবুজ উন্নয়ন, জলবায়ুবান্ধব উন্নয়নের ধারণাগুলোকে জাতীয় নীতি ও অনুশীলনের মূলধারায় নিয়ে আসতে পেরেছেন, তথা ‘মেইনস্ট্রিমিং’ করেছেন, তা এককথায় অনন্য। তিনি শুধু বাংলাদেশের সবুজ নেত্রী নন। জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশেরও নেত্রী। তাইতো সর্বশেষ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আহ্বানে ‘মেজর ইকোনমিজ : ফোরাম অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি আবারও জলবায়ুবান্ধব উন্নয়নের প্রশ্নে নিজের দূরদর্শী ও সময়োপযোগী চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। বরাবরই তিনি বলে এসেছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোর কর্মকাণ্ড, অথচ এর ফলে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাই এ সম্মেলনেও তিনি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোকে আরো সক্রিয় হওয়ার জোর আহ্বান জানিয়েছেন। ওই বক্তব্যে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে ছয়টি প্রস্তাবও তুলে ধরেছেন। এগুলো হলো—১. বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখতে প্রধান কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ। ২. জলবায়ু তহবিলের জন্য উন্নত দেশগুলোর বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার পূরণ এবং ওই তহবিলে অভিযোজন ও প্রশমনের জন্য বরাদ্দ সমান রাখা। ৩. উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কার্যকর জ্বালানি সমাধান। ৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে জাতিরাষ্ট্রগুলোর উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও অভিজ্ঞতার আলোকে লাভ-ক্ষতির বিবেচনা। ৫. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, বন্যা ও খরার ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের দায় সব দেশের মধ্যে বণ্টন। ৬. নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কপ২৬ সম্মেলনে প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর আরো কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ছয় দফা প্রস্তাবনা থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায়, তিনি একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি সম্পর্কে খুবই সচেতন, অন্যদিকে এই হুমকি মোকাবেলার ক্ষেত্রে অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোরই যে প্রধান দায় এবং তাদের আন্তর্জাতিক জবাবদিহির মুখোমুখি করার বিষয়েও একই রকম সজাগ। এ কারণেই জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকিতে থাকা দেশগুলোর ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের নেতা হিসেবেও বৈশ্বিক পরিসরে তিনি খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে সব মহল আশাবাদী হতে পারছে। দূরদর্শিতা এবং গণমুখী চিন্তা ও কর্মের ধারাবাহিকতার কারণেই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজ শুধু আমাদেরই প্রিয় নন, বিশ্বের বিপন্ন মানুষের কাছেও আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

তা ছাড়া তিনি বিশ্বব্যাপী শান্তির ক্ষেত্রকে প্রসারিত করারও এক বিচক্ষণ নেত্রী। ঠিক যেন বাবার মতোই। উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে সাধারণ সভায় দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এই বলে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন যে ‘... আমরা তাকাবো এমন এক পৃথিবীর দিকে, যেখানে বিজ্ঞান ও কারিগরি জ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে মানুষের সৃষ্টি ক্ষমতা ও বিরাট সাফল্য আমাদের এমন এক শঙ্কামুক্ত উন্নত ভবিষ্যৎ গঠনে সক্ষম।’ ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রবক্তা বঙ্গবন্ধুকন্যা আজ দেশে-বিদেশে পিতার সেই স্বপ্নকেই যেন বাস্তবে রূপ দিতে নিরন্তর ব্যস্ত। উন্নয়নের পূর্বশর্ত শান্তি। সে কারণেই জাতিসংঘে শান্তি সৈনিকের অবদানে বাংলাদেশের নাম প্রথমেই চলে আসে। একমুখী উন্নয়নে দেশকে আটকে না রেখে উন্নয়ন ধারণার বহুমুখিতাকে গ্রহণ করেছেন বলেই তিনি সেই ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসে পার্বত্য শান্তিচুক্তি করে বহুকালের রাজনৈতিক সংকট সমাধান করেছিলেন। ছিটমহল আর সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধও তিনি একে একে মিটিয়েছেন শান্তিপূর্ণভাবেই। নিজ ভূমিকে কিছুতেই তিনি পড়শি দেশের অভ্যন্তরে শান্তিবিনাশী জঙ্গিপনার ক্ষেত্র হতে দেননি। তা না হলে সীমান্ত অঞ্চল হয়ে উঠত অশান্তির অঞ্চল। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সমাধানে বহুপক্ষীয় চাপ মোকাবেলায় তিনি যে অসম সাহসিকতা ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতা দেখিয়েছেন তা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শান্তিকন্যা শেখ হাসিনার শান্তির অন্ব্বেষণ থেকে বিশ্বনেতৃত্ব অনেক কিছুই শিখতে পারেন।

বাঙালির আর্থ-সামাজিক মুক্তির স্বপ্নপূরণের সারথি হয়ে দেশে ফিরেছিলেন শেখ হাসিনা। সেই থেকে বহু ত্যাগের বিনিময়ে স্বদেশকে সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার মানে এই নয় যে আমাদের সমাজে, প্রশাসনে ও রাজনীতিতে চ্যালেঞ্জের কমতি আছে। নিঃসন্দেহে আছে দুর্নীতি, সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক অনেক চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ আমাদের সবাইকে মোকাবেলা করে যেতে হবে। তবে তাঁর শত্রুর অভাব নেই। ন্যায়যোদ্ধাদের বেলায় তেমনটাই স্বাভাবিক।

তাই কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষা ধার করে তাঁকে আবারও বলতে চাই—‘আপনার প্রত্যাবর্তন আজও শেষ হয়নি।’ আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশকে আরো বহুদূর এগিয়ে নেবেন তিনি। কেননা তিনি অনেক দূরে দেখতে পান। তাই সুস্থিরভাবে পরিকল্পনা করে করে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। কথায় কথায় জাম্প করেন না। সারা বিশ্বও তাঁর এই শান্তিকামী, মানবিক ও সবুজ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার সুফল ভোগ করুক—সেই কামনা করছি। বঙ্গবন্ধুকন্যার জন্মদিনে এই আশাবাদ প্রকাশ করেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাই।

 

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের

সাবেক গভর্নর



সাতদিনের সেরা