kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জন্মদিনে বলতে এলাম শুভ তোমার জয়ন্তী

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুকন্যা বঙ্গবন্ধুর মতোই তাঁর ব্যক্তিত্বে ধারণ করেন দুস্থ মানুুষের জন্য কল্যাণ কামনা। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু বলি শুধু রোহিঙ্গাদের কথা। নিজ বাসভূমে পরবাসী হয়ে ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে আশ্রিত-অতিথি

 

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর মার্কিন সাপ্তাহিক টাইম ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রচ্ছদে ছিল বঙ্গবন্ধুর একটি আবক্ষ ছবি। বাঁ কোনায় আড়াআড়িভাবে লেখা ছিল, ‘জেলখানা থেকে বাংলাদেশ ক্ষমতায়’  (Bangladesh from Jail to Power)। উল্লেখ্য, এমন শিরোনামে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে সমার্থক বলা হয়েছিল, যা যুক্তি ও ইতিহাসম্মত। ১৯৭৫-এর পর ভারতে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন আওয়ামী লীগের নতুন নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে। সেদিন আমার বলতে ইচ্ছা হয়েছিল, নির্বাসন থেকে বাংলাদেশ অস্তিত্বে ফিরল (Bangladesh from exile to existence)| আমার এমন ভাবনা যে যুক্তি স্পর্শ করেছিল, তার প্রমাণ, কবি হাসান হাফিজুর রহমান শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ।’ ১৯৯১ সালের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর শেখ হাসিনা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু জননী সাহসিকা বেগম সুফিয়া কামাল তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘তোমাকে থাকতে হবে, এবং বাংলাদেশকে বাঁচাতে হবে।’ শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত পাল্টিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বলেই বাংলাদেশের অর্জন এখন সারা দুনিয়ার নজরকাড়া। নজর কেড়েছেন তিনিও। তিনি বিশ্বনান্দীর তালিকাভুক্ত।

শেখ হাসিনার ফেরায় এমন উচ্ছ্বাসের অন্তত দুটি কারণ নির্দেশ করা যেতে পারে। এক. বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমরা তাঁর কন্যাকে নেতৃত্বে পেয়েছি। কন্যার ধমনিতে প্রবাহিত পিতার রক্ত। হারানো বঙ্গবন্ধুকে যেন ফিরে পাই শেখ হাসিনাকে দেখে। সব মিলিয়ে তাঁর বড় পরিচয় তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা। দুই. ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশ নির্বাসনে ছিল; দেশটা তো ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিল। অবয়ব কাঠামোতে মুক্তিযুদ্ধ ছিল উধাও। বাংলাদেশ মিনি পাকিস্তান তকমা পেতে শুরু করেছিল। কাজেই শেখ হাসিনার ফেরা মানে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ফেরা।

শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে চার দশক, সরকারের নেতৃত্বে প্রায় ১৭-১৮ বছর। উল্লেখ্য, তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরে। তাঁর ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি। জীবনের ওপর আঘাত এসেছে ১৯-২০ বার। তাঁর বেঁচে থাকায় অলৌকিকত্ব আছে, আছে দৈব ব্যাপারও। তবে আমরা ভাগ্যবান, আমরা তাঁর নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হইনি। তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্ব পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা কিছু মন্তব্য করতে পারি।

সম্মোহনী নেতৃত্ব : সন্দেহ নেই, শেখ হসিনার নেতৃত্ব সম্মোহনী এবং তা ম্যাকস ভেবার যে অর্থে/নিহিতার্থে ধারণাটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে শেখ হাসিনার সম্মোহনী নেতৃত্ব মিশ্র; দুটি উপাদান আছে। প্রথমত, আহরিত সম্মোহন  (borrowed charisma)| তিনি সম্মোহনী বৈশিষ্ট্য আহরণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। তাঁর সম্মোহন যে তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার নিজস্ব সম্মোহনী সংযোজন, যার উৎস তাঁর বহুবিচিত্র জনগণলগ্ন কর্মকাণ্ড। এমন সম্মোহন সৃষ্টিতে একটি ঐতিহাসিক উপাদানও বিবেচ্য। তিনি যখন দেশে ফেরেন তখন তো ফিরেছিলেন স্বজন হারানো শ্মশানে। এমন একজন মানুষের জনগণলগ্ন হওয়ার বিকল্প কিছু নেই। কারণ তাঁর নিজস্ব চাওয়া-পাওয়ার জগৎ বলে কিছু নেই। আর সে কথা তো তিনি দেশে ফিরেই বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি এসেছি আপনাদের ভোট ও ভাতের অধিকার আদায় করতে।’ এই একটি কথায় জাদু ছিল, ছিল সম্মোহন।

শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ যে অনেক বদলে গেছে তার অগুনতি আর্থ-সামাজিক সূচক আছে। দেশ ও দেশের মানুষের দিনবদলের পালা চলমান। যেতে হবে এখনো বহুদূর। যাব অনেক দূর। কারণ আমাদের স্বপ্নসারথি শেখ হাসিনা।

সৃজনশীলতা : সৃজনশীল না হলে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না। জনতার কাজ করতে হলে সৃজনশীলতা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা দুই ধরনের নেতৃত্বের মিশেল-ঘটনাশ্রয়ী  (eventful) এবং ঘটনা সংঘটনকারী  (event-making)| আওয়ামী লীগের এক ক্রান্তিলগ্নে তিনি ঘটনাচক্রে সভাপতি হন। তিনি সভাপতি হয়ে দলকে রক্ষা করেছেন, দেশকে বাঁচানোর লক্ষ্যে নিবেদিত হয়ে অনেক ঘটনা সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ সৃষ্টিশীলতায় তিনি নিজেকে নিয়ত অতিক্রম করে যাচ্ছেন।

শেখ হাসিনার সৃষ্টিশীলতার দুটি উদাহরণ দিই। কমিউনিটি ক্লিনিক তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবন। তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর কিছু হতে পারে না।

আশ্রয়ণ প্রকল্প (১ ও ২) শেখ হাসিনার মস্তিষ্কপ্রসূত। ভূমিহীন-গৃহহীন ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা তো কম নয়। তাদের কথা শেখ হাসিনা ভেবেছেন। এই মানুষগুলো মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে শুরু করেছে। এমন করে এই অভাজনদের কথা আর কেউ তো ভাবেনি। এখানেও জনগণের টাকা জনকল্যাণে নিয়োজিত। সরকারি টাকা ভাবার এ দেশে শেখ হাসিনা যখন এই সরকারি টাকা দিয়ে ছিন্নমূল মানুষের দিনবদলে প্রয়াসী হন, তখন তাঁকে তার সৃজনী-ভাবনার জন্য তারিফ করতেই হয়। তাঁর নিজস্ব ভাষ্যে (সংসদে প্রদত্ত) এমন ১০ লাখ মানুষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পেয়েছে, ভবিষ্যতে আরো পাবে। তাঁর নিজের ঘোষণা, এ দেশে কেউ গৃহহীন থাকবে না। এ স্বপ্ন হলেও তা তো সত্যি হতে চলেছে।

মানবিকতা : বঙ্গবন্ধুকন্যা বঙ্গবন্ধুর মতোই তাঁর ব্যক্তিত্বে ধারণ করেন দুস্থ মানুুষের জন্য কল্যাণ কামনা। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু বলি শুধু রোহিঙ্গাদের কথা। নিজ বাসভূমে পরবাসী হয়ে ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে আশ্রিত-অতিথি। অতিথি সৎকারের জন্য তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ভাসানচর প্রকল্প। তাদের নিজ দেশে ফেরানোর কূটনীতিতে কমতি-ঘাটতি নেই। কাজেই শেখ হাসিনার জন্য অভিধা এসেছে ‘মানবতার জননী’  (Mother of Humanity) এবং তা-ও আবার বিদেশ থেকে।

সাহসিকতা : বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব ভাষ্যে তাঁর সাহসের কথা আছে; তাঁর কন্যার মধ্যেও সাহস থাকবে—সেটাই স্বাভাবিক। বিবেকি সাহসের উৎস আত্মবিশ্বাস, যা আমরা পিতা-পুত্রীর মধ্যে দেখেছি/দেখছি। বঙ্গবন্ধুর সাহসের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ; শেখ হাসিনার সাহসের ফসল অসম্ভবকে সম্ভব করা দিনবদলের হাওয়া লাগা আজকের বাংলাদেশ এবং তা করোনা অতিমারি সত্ত্বেও।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করা সম্ভব হয় শেখ হাসিনার সাহসের জন্য। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা কোনো দিন ভাবতে পারেনি যে তাদের বিচার হবে, রায় কার্যকর হবে। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে লন্ডনের আইটিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কর্নেল রশীদ দম্ভ নিয়ে বলেছিল, ‘আমি শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি। তোমাদের সাহস আছে আমার বিচার করার?’ তার দম্ভের কারণ ছিল দায়মুক্তি অধ্যাদেশ (সেপ্টেম্বর ১৯৭৫) ও পাকি-মার্কিন সমর্থন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সংসদে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করার অসম্ভব সাহস দেখিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। জাতিকে তিনি কলঙ্কমুক্ত করেছিলেন।

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের নাটকের কথা আমরা জানি। অর্থায়ন বন্ধ হলো এমন একটি মেগাপ্রকল্পের। এমন সংকটকালে শেখ হাসিনার সাহসী উচ্চারণ ছিল, ‘আমরা পদ্মা সেতু তৈরি করব নিজেদের টাকায়।’ পদ্মা সেতু হয়েছে।

নারী উন্নয়ন : শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশে নারী প্রগতি বোঝানোর জন্য পশ্চিমের সত্তর-আশির দশকের জনপ্রিয় গায়িকা হেলেন রেড্ডির গান থেকে কলি ধার করছি—‘আই অ্যাম উওম্যান, হিয়ার মি রোহর/ইন নাম্বারস টু-উ বিগ টু ইগনোর,/.../ইফ আই হ্যাভ টু, আই ক্যান ডু এনিথিং—/আই অ্যাম স্ট্রং,/আই অ্যাম ইনভিনসিবল,/আই অ্যাম উওম্যান!

(শেষ বাক্যটি খুব জোর দিয়ে গাইতেন)

২০১০-এ ঘোষিত নারী নীতি নিয়ে যাত্রা শুরু। তারপর তো অনেক পথচলা হয়েছে। শুধু রাষ্ট্রপতি বা নভোচারী হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের নারী এখন সব অবস্থানে পৌঁছে গেছে। নারীর অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হয়েছে শেখ হাসিনার আমলে।

প্রবৃদ্ধি/উন্নয়নের রূপকার : মনে আছে, বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ড. কিসিঞ্জারের অভিসম্পাত ছিল, দেশটি তলাবিহীন ঝুড়ি হবে। বঙ্গবন্ধুর আমলেই জাতীয় গড় প্রবৃদ্ধি সাতের ওপর হয়ে ঝুড়িতে জমা হয়েছিল বেশ কিছু। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৬ সালে দুজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ—জাআস্ট ফারল্যান্ড ও জে আর পার্কিনসন বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনটি তির্যক মন্তব্য করলেন। এক. বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্বের কঠিনতম সমস্যা। দুই. বাংলাদেশের উন্নয়ন হলে সব দেশেরই উন্নয়ন হবে। তিন. বাংলাদেশের উন্নয়ন হলেও অন্তত ২০০ বছর লাগবে। কিন্তু ২০১৬ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে তকমা দেয়। এখন তো দেশটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের অবস্থানে উন্নীত, সারা বিশ্বের বিস্ময়।

সংস্কৃত প্রবচন আছে—রত্ন কর্ষতি পুরঃপরমেক/স্তদগতানুগতিকো ন মহার্যৎ—অর্থাৎ একজনই আগে পথ তৈরি করে দেন। পরে সে পথ দিয়ে যাতায়াত করার লোক দুর্লভ হয় না। বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা পথে শেখ হাসিনা চলছেন; যদিও তাঁর পথচলা সহজ নয়, বেশ কঠিন।

শেখ হাসিনার জন্মদিনে আমরা বলতে বাধ্য—‘জন্মদিনে বলতে এলাম, শুভ তোমার জয়ন্তী।’

জয়তু শেখ হাসিনা।

লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)

 



সাতদিনের সেরা