kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

তিনি আছেন বাংলাদেশ আছে

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৭৫তম জন্মদিন। বাংলাদেশের গড় আয়ু থেকে তিন বছর পেরিয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় সবল ও সুস্থ আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে তিনি। ৪০ বছর বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে বিচরণের মাধ্যমে যোগ্য উত্তরসূরির পরিচয় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আমার বিবেচনায় এটা শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্কৃষ্ট অর্জন। বাংলাদেশ বলতে বাঙালি শেখ মুজিবকে চেনে। বাঙালি শেখ মুজিবের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে দেখতে চায়। সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে শেখ হাসিনা সংগ্রাম করে চলেছেন ৪০ বছর। শেখ মুজিবের বাংলাদেশ এখনো পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি—এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক, এ পথে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনেক দূর এগিয়েছে। প্রবল প্রতিকূলতা এবং দেশি-বিদেশি দানবীয় অশুভ শক্তির চরম বিরোধিতা শুধু নয়, ১৯ বার সরাসরি হত্যাচেষ্টার পথ পেরিয়ে আজ বাংলাদেশকে যেখানে এনেছেন তার তুলনা শুধু তিনি ও বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক স্বাধীনতা লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপলক্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সব মানুষ তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারবে; ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ-জাতি-উপজাতিভেদে কোনো রকম বৈষম্য থাকবে না এবং বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ একটি আধুনিক মর্যাদাশীল সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, কোনো শক্তি ও পরাশক্তির চোখ-রাঙানি সহ্য করতে হবে না। এই লক্ষ্য অর্জনের সঠিক পথ ও মন্ত্র বঙ্গবন্ধু ঠিক করে দেন, বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্যে তার প্রতিফলন আমরা পাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পথ ধরে পর পর দুই সামরিক শাসক ও তাঁদের উত্তরসূরিরা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় বসে বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথকে সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলে পরিত্যক্ত পরাজিত হুবহু পাকিস্তানপন্থী ধর্মীয় উগ্রবাদের পথে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তার ভয়াবহ পরিণতির কথা আমরা সবাই জানি। সেই পথে বাংলাদেশ এত দিন থাকলে কী হতো তার বর্ণনার প্রয়োজন নেই, শুধু পাকিস্তানের সার্বিক চিত্রটির দিকে এখন তাকালেই সেটা বোঝা যায়। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের সব সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ দ্বিগুণ উচ্চতায় অবস্থান করছে। অথচ ১৯৭২ সালে উল্লিখিত সব সূচকে এই চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সব জেনেবুঝেও বাংলাদেশের রাজনীতির এক বড় পক্ষ একাত্তরের পরাজিতদের সঙ্গে নিয়ে এখনো বাংলাদেশকে পাকিস্তানের পথে টেনে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও হিংসার বশবর্তী হয়ে কিছু ব্যক্তিসর্বস্ব দল মুখে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রপাগান্ডায় জামায়াত থেকেও অধম মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চীনপন্থীরা সবচেয়ে এগিয়ে আছে। তবে প্রতিষ্ঠিত সত্য এই—মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর পথ ও মন্ত্রই বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জনের মূল লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা সেই মন্ত্র ও পথের ওপর আছেন বলেই আমরা সমৃদ্ধির সড়কে উঠেছি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে গণ্যের মধ্যে রাখছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে বৈশ্বিক অঙ্গনের সব হিসাব-কিতাবে বাংলাদেশ এখন অন্যতম উপাদান। চলমান ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে উন্নয়নের একটা টেকসই স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হবে এবং সেই পথ ধরে ২০৩৫ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতির দেশ। তখন বৃহৎ এক মধ্যবিত্ত জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ভোগ্য পণ্যের বিশাল এক বাজার সৃষ্টি হবে এখানে। ওয়ালমার্ট, অ্যামাজন, আলীবাবার মতো বৃহৎ খুচরা বিক্রেতারা এসে ভিড় করবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তখন বৃহৎ শক্তির বহু রকম স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা থাকবে। সে সময়ে জাতীয় কোনো স্বার্থের প্রতি অন্য কোনো শক্তি যেন হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য সময়োপযোগী একটা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার কাজেও তিনি একইভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। অন্যান্য সেক্টরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীও এখন আধুনিকতার সড়কে যাত্রা শুরু করেছে, যে যাত্রাটি শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে। গত ১২ বছর সশস্ত্র বাহিনীর সব শাখার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম আসছে। পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে যত রকম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার তার সব কিছুই এখন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর রয়েছে। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচ অফিসার ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার সারা জীবনের স্বপ্ন একটা মর্যাদাশীল সশস্ত্র বাহিনী আমাদের থাকবে। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, আমাদের সশস্ত্র বাহিনী অন্য কোনো দেশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না। কিন্তু কেউ যদি আমাদের জাতীয় স্বার্থে আঘাত করতে চায়, তাহলে সেটি প্রতিরোধ করার সক্ষমতা আমাদের থাকতে হবে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার ভূমিকা এখন বিশ্বস্বীকৃত। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭৬ সাল থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে ভয়ংকর এক ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ চলছে। ৪০ হাজার মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিদিন সেনাবাহিনী সদস্যদের লাশ আসছে স্বজনদের কাছে, নিরীহ পার্বত্যবাসী জীবন দিচ্ছে। এর শেষ কোথায় ২০ বছরে কেউ বলতে পারেনি। কিন্তু ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে মাত্র দেড় বছরের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যেভাবে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করলেন তার উদাহরণ বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে দেশের ভেতরের এক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তৈরি হওয়া হুমকি থেকে তিনি বাংলাদেশকে মুক্ত করলেন। ৪০ বছর রাজনীতিতে থেকে দেশকে যেমন উন্নয়নের সড়কে এনেছেন, তেমনি রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তার হুমকিগুলোর সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সমাধান করেছেন। এর জন্য তাঁকে জীবন বাজি রেখে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু সেই অশুভ শক্তির পাঁয়তারা এখনো থামেনি। আরো দীর্ঘ সংগ্রাম সামনে। এই সংগ্রামে শেখ হাসিনা আছেন তো বাংলাদেশ আছে।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

 



সাতদিনের সেরা