kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বহুমাত্রিক শেখ হাসিনা

বিশ্বজিৎ ঘোষ

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বহুমাত্রিক শেখ হাসিনা

বর্তমান বিশ্বের অনন্য এক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতোই তাঁর সুযোগ্যা কন্যা শেখ হাসিনা এক সাহসী রাজনৈতিক প্রতিভা। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও মানবিক রাষ্ট্রদর্শন বাংলাদেশের ভূগোল পেরিয়ে আজ সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বীকৃত। শেখ হাসিনার গতিশীল ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে বিশ্বমানবের কাছে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আখ্যায়িত। দারিদ্র্য দূরীকরণ, পৃথিবীর সুরক্ষা এবং সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার প্রাতিস্বিক রাজনৈতিক দর্শন। এই রাজনৈতিক দর্শন এই প্রাতিস্বিক বিশ্ববীক্ষাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য শেখ হাসিনা যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, সেখানে প্রতিভাত হয়েছে তাঁর বহুমাত্রিক সমাজ ও রাজনৈতিক দর্শন।

শেখ হাসিনার বহুমাত্রিক সমাজ-রাজনৈতিক দর্শনকে দৈশিক ও বৈশ্বিক—এই দুভাবেই অবলোকন করা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য শেখ হাসিনা যেসব উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য : একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিনিয়োগ বিকাশ এবং পরিবেশ সুরক্ষা কর্মসূচি। এসব উদ্যোগ ও কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ এরই মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক আয় এখন দুই হাজার মার্কিন ডলারেরও ওপরে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি পৃথিবীর সেরা অর্থনীতিবিদদের কাছে একটা রহস্য বলে মনে হচ্ছে। অনেকেই বাংলাদেশকে এখন মিরাকল (অলৌকিক) অর্থনীতির দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এমনকি পাকিস্তানের সংসদে এমন কথা উচ্চারিত হয় যে কিভাবে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নতি করতে হয় সে জন্য শেখ হাসিনার বাংলাদেশের দিকে তাকালেই চলে।

শেখ হাসিনার দূরদর্শী রাজনৈতিক দর্শন থেকে উদ্ভূত ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর এই প্রকল্পের মূল কথা : ‘দিন বদলের স্বপ্ন আমার, একটি বাড়ি একটি খামার’। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো গ্রামীণ মানুষের নিজস্ব পুঁজি গঠন ও তা বিনিয়োগ করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচন। এই প্রকল্পের আওতায় সমগ্র বাংলাদেশে ৫০ হাজারের মতো গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গড়ে উঠেছে। শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সুনির্দিষ্ট পথরেখার (রোডম্যাপ) আলোকে এসব সমিতি গ্রাম উন্নয়নে দূরস্পর্শী ভূমিকা পালন করে চলেছে।

বঙ্গবন্ধু-আত্মজা শেখ হাসিনার একটি অনন্য উদ্যোগ আশ্রয়ণ প্রকল্প। নানামাত্রিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনে ছিন্নমূল অসহায় পরিবারের পুনর্বাসনই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। ঘূর্ণিদুর্গত মানুষের জন্য নোয়াখালীর রামগতিতে বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন ‘গুচ্ছগ্রাম’। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা গ্রহণ করেন আশ্রয়ণ প্রকল্প। স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় এই প্রকল্পের আওতায় ছিন্নমূল লাখ লাখ পরিবার পেয়েছে স্থায়ী আবাসন। শুধু স্থায়ী আবাস নয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণ প্রদান এবং নানা ধরনের প্রশিক্ষণদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলাও শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা গ্রহণ করেন সময়োচিত এক কর্মসূচি— ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রকল্প ‘রূপকল্প : ২০২১’ বাস্তবায়নের প্রধান সহায়ক শক্তি। শেখ হাসিনার এই কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধন করেছে। করোনা মহামারির সময়খণ্ডে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কর্মসূচির সুফল বাংলাদেশের মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে। সাধারণ মানুষের কাছে অনলাইন রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভোগান্তিহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জনগণের কাছে তথ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এখন ঘরে বসেই অনলাইনে সব কাজ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। শিক্ষাক্ষেত্রেও ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রকল্পের সদর্থক প্রভাব আজ ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীত করা এবং সব স্তরে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা শেখ হাসিনা উদ্ভাবিত শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

শেখ হাসিনার একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দর্শন নারীকে ক্ষমতার মূল স্রোতে নিয়ে আসা। নারীর প্রত্যাশিত ক্ষমতায়নে শেখ হাসিনা পালন করে চলেছেন অনন্য ভূমিকা। রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশ্রগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন শেখ হাসিনা। এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রণয়ন করেছেন ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১’। জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং দেশের আর্থ-সামাজিক ও মানব উন্নয়নে অন্যতম চালকশক্তি বিদ্যুৎ। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনা ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তাঁর দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্তের ফলেই দেশের সর্বত্র এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বিদ্যুতের উৎপাদন। প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, উইন্ডমিল ও বায়োগ্যাস থেকে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে—তাঁর সাহসী সিদ্ধান্তের ফলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পরমাণু বিদ্যুতের জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য শেখ হাসিনা গ্রহণ করেছেন ‘কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য প্রকল্প’। দেশের সব মানুষের জরুরি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধিতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

দৈশিক প্রেক্ষাপটের মতো বৈশ্বিক পর্যায়েও শেখ হাসিনা তাঁর অনন্য মেধা ও প্রাতিস্বিক রাষ্ট্রদর্শনের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। যেকোনো বৈশ্বিক সভায় তাঁর প্রস্তাব-অভিমত-চিন্তাধারা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে—গৃহীত হচ্ছে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রস্তাব। আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর মানবিক ভূমিকা বিশ্বব্যাপী নন্দিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী উদ্যোগের জন্য জাতিসংঘের পলিসি লিডারশিপ শ্রেণিতে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার তাঁর বৈশ্বিক চেতনারই অভ্রান্ত স্বাক্ষর। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিভাবে এগিয়ে যেতে হয়—সে সাহস ও কৌশল তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অর্জন বিশ্বের মানুষের কাছে অনুসরণীয় দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে এসডিজি অর্জন সম্পর্কে শেখ হাসিনার বক্তব্য, আইসিটি টেকসই উন্নয়নে ভূষিত হওয়া, সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া—সবই শেখ হাসিনার বৈশ্বিক নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বগুণ বিশ্বরাজনীতিতে সঞ্চার করেছে নবতর মাত্রা।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ অতি সম্প্রতি ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’ অর্জন করেছেন। বিশ্বসভার সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশন নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) এই পুরস্কার প্রদান করে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, পৃথিবীর সুরক্ষা, মানব উন্নয়ন এবং সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বজনীন আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য শেখ হাসিনাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের অনন্য গৌরব—এ দেশের মৃত্তিকায় জন্ম নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির নেতা ছিলেন না, ছিলেন বিশ্বের শোষিত মানুষের মহান নেতা। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ অনুসরণ করে তাঁর সুযোগ্যা কন্যা শেখ হাসিনা বহুমাত্রিক প্রতিভাগুণে পিতার মতোই আজ বিশ্বনেতৃত্বের আসনে উন্নীত। তাঁর জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় জেগে উঠেছে বাংলাদেশ, জেগে উঠছে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো। শেখ হাসিনার রূপকল্প-২০৪১ বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাবে—এ আমাদের আত্যন্তিক বিশ্বাস এবং সে লক্ষ্যেই এখন দেশপ্রেমিক সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, মেধা-মনন-ত্যাগ ও সততা নিয়ে কাজে নিমগ্ন হতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা