kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

[ খেলা ]

শেখ কামালকে হারানোয় দেরি হলো অনেক

সাবের হোসেন চৌধুরী

১৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শেখ কামালকে হারানোয় দেরি হলো অনেক

অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার কত স্বপ্ন যে বাংলাদেশ দেখতে শুরু করেছিল! বঙ্গবন্ধু নিজেই বলতেন, দেশ স্বাধীন হওয়া মানে শুধুই রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়। তিনি বলতেন সার্বিক মুক্তির কথা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি—সব কিছু নিয়েই তিনি সচেতন ছিলেন। সংস্কৃতির মধ্যে তো খেলাধুলাও চলে আসে। ওই সময়ে প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা আমাদের ছিল, সেটি ১৯৭৫-এর নারকীয় হত্যাকাণ্ডে থমকে যায়। বলা যায়, ঘাতকের বুলেট আমাদের জাতিগত স্বপ্নের মিছিলের পথই রোধ করে দাঁড়িয়েছিল

 

দেশের ক্রিকেট অগ্রযাত্রায় আমি একজন নগণ্য সৈনিক মাত্র। যদিও টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির জন্য লোকজন অনেকখানি কৃতিত্বই আমার জন্য বরাদ্দ রাখেন। আমি অবশ্য এ অর্জনকে ছন্দোময় এক ‘টিমওয়ার্ক’-এর ফলই মনে করি। যে সম্মিলিত প্রচেষ্টার শক্তিটা আমরা আরো আগেই দেখতে পারতাম। আরো আগেই পেতে পারতাম টেস্ট মর্যাদাও।

কেন বলছি এই কথা? মাঝখানে সুদীর্ঘ একসময় আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে বলেই বলছি। ওই সময়ে স্বপ্ন দেখার সাহসও আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এটি তো নিশ্চয়ই সবাই মানবেন যে টেস্ট মর্যাদার আবেদন ঠুঁকে দেওয়াটা ভীষণ দুঃসাহসী এক কাজ ছিল। সেই সাহস দেখানোর জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত।

অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার কত স্বপ্ন যে বাংলাদেশ দেখতে শুরু করেছিল! বঙ্গবন্ধু নিজেই বলতেন, দেশ স্বাধীন হওয়া মানে শুধুই রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়। তিনি বলতেন সার্বিক মুক্তির কথা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি—সব কিছু নিয়েই তিনি সচেতন ছিলেন। সংস্কৃতির মধ্যে তো খেলাধুলাও চলে আসে। ওই সময়ে প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা আমাদের ছিল, সেটি ১৯৭৫-এর নারকীয় হত্যাকাণ্ডে থমকে যায়। বলা যায়, ঘাতকের বুলেট আমাদের জাতিগত স্বপ্নের মিছিলের পথই রোধ করে দাঁড়িয়েছিল।

সেই পথ রুদ্ধ ছিল অনেক দিন। আমি শুধু ক্রীড়াঙ্গনের কথাই বলি। ইতিহাস ঘেঁটেও মিলিয়ে নিতে পারেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে খেলাধুলার মধ্যেও মৌলিক কোনো পরিবর্তন ছিল না। সব কিছুই হতো। কিন্তু এর কোনো স্বীকৃতি, এর কোনো অর্জন, এর কোনো সাফল্য আমরা সেভাবে লক্ষ করিনি। আবার সে ধারাটি শুরু হলো ১৯৯৬ সালে। সেটি আমরা শুরু করলাম ক্রিকেট দিয়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা অনেক কিছু করে ফেললাম। ওয়ানডে মর্যাদা পাওয়া, ঢাকাকে আন্তর্জাতিক ভেন্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলা এবং টেস্ট মর্যাদা আদায় করা—রাতারাতি হয়ে গেল সব। সেটি কেন সম্ভব হয়েছে? কারণ আমরা স্বপ্ন দেখার সাহস ফিরে পেয়েছিলাম। সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করতে বসলে ১৯৯৬ থেকে যেসব সাফল্য, এটি হয়তো অনেক আগেই চলে আসত। ২১ বছর এটার জন্য আমাদের অপেক্ষা করার দরকার ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সেই যে নতুন কিছু সৃষ্টি করার উদ্যম ছিল, এরই ধারাবাহিকতায় হয়তো আমরা এ কাজগুলো অনেক আগেই করতে পারতাম। আমরা কিসের ওপর ভিত্তি করে আমাদের টেস্ট মর্যাদা পেলাম? বাংলাদেশে ক্রিকেট সংস্কৃতি ছিল বলেই তো, না কি? পূর্ব পাকিস্তানের সময় থেকেই এখানকার মানুষের ক্রিকেটের প্রতি আকর্ষণ ছিল। সেটিকে পুঁজি করে তখনই আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে আমাদের থেমে যেতে হলো এবং পুনর্জাগরণের জন্য অপেক্ষা করতে হলো ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত।

বঙ্গবন্ধু নিজেই ফুটবল খুব ভালোবাসতেন এবং একসময় খেলতেনও। ওই সময়ই আবাহনীর জন্ম। আবাহন থেকেই আবাহনী নামটি এসেছে। মানে নতুনের প্রতি মানুষকে আকর্ষণ করা। একটি নতুন ধারা ও চেতনা তৈরি করা। আমি কিন্তু খেলাধুলার বিষয়টিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখি না। বঙ্গবন্ধুর যে ছক ও পরিকল্পনা ছিল, এর মধ্যে খেলাধুলাও ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন বাঙালিরা সব কিছু পারে। উনার স্বপ্ন পরিপূর্ণতা না পেলেও সব ক্ষেত্রেই কিন্তু এর শুরুটা আমরা তাঁর সময়ই দেখতে পেয়েছি। উনার সুযোগ্য সন্তান শেখ কামাল প্রতিষ্ঠা করলেন আবাহনী। তাঁর ঝোঁকই ছিল নতুন কিছু সৃষ্টি করার দিকে। মানুষকে আকৃষ্ট করা, মানুষকে টেনে আনা ও মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর নেশা ছিল তাঁর। ভাবতে পারেন, সেই ১৯৭৪ সালে তিনি আবাহনীতে বিদেশি কোচ এনেছিলেন। উইলিয়াম বিল হান্ট নামের সেই কোচের অধীন আবাহনী এমন এক ধারার ফুটবল খেলতে শুরু করেছিল, যে ধারায় বিশ্বের সেরা দলগুলো খেলত। সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ভাবনায় অভ্যস্ত ছিলেন শেখ কামাল। ভিন্ন এক মাত্রা এনেছিলেন ক্রীড়াঙ্গনে। নির্দিষ্ট গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন কিছু সৃষ্টির মাধ্যমে, বিশেষ করে যুবসমাজকে আকর্ষণ করা ও টেনে আনাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধুরও স্বপ্ন ছিল তরুণরা বাংলাদেশটা গড়বে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেই স্বপ্নের ধারক শেখ কামালকে হারানোর পর ক্রীড়াঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করার ব্যাপারটি শুধু আবাহনীর মাধ্যমেই টিকে ছিল। বিশ্বকাপে খেলা কোনো ফুটবলার ঢাকার মাঠে প্রথম নামে আবাহনীর হয়েই। সামির শাকির ও করিম মোহাম্মদের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। আবাহনীসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শেখ কামালের স্বপ্নটা বয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তবে দল যেহেতু ক্ষমতায় ছিল না, তাই ১৯৯৬ সালের আগ পর্যন্ত জাতীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব করার সুযোগ ছিল না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর আমরা আবার স্বপ্ন দেখার সাহস ফিরে পাই এবং নব উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

এই সুযোগে একটি কথা জানিয়ে রাখি। বঙ্গবন্ধু কিংবা শেখ কামাল—কারো সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নেই। তবে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ দিনটির কথা পরিষ্কার মনে আছে। তখন আমাদের পরিবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বেড়াতে এসেছে। আমার বয়স মাত্র ১০ বছর। রেসকোর্সে তাঁর ভাষণ দেখতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। তবে ঐতিহাসিক সেই ভাষণ নিয়ে পরিবারের সবার মধ্যে উত্তেজনা ও রোমাঞ্চের স্মৃতি এখনো স্পষ্ট। সংগঠক হিসেবে আবাহনীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর শেখ কামাল সম্পর্কে আরো বেশি জানার ও বোঝার চেষ্টা করলাম। এটি সম্ভব হলো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার তানভীর মাজহার তান্না এবং আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদের জন্য। তাঁদের মুখে গল্প শুনেই শেখ কামালের একটি প্রভাব আমার মধ্যেও চলে এলো। ঠিক করলাম, কোনো একটি জায়গায় গেলে নতুন করে কিছু করতে হবে। পুরনো গত্বাঁধা জিনিসের মধ্যে থাকা যাবে না। থাকিওনি। স্বপ্ন দেখলাম এবং সাহস করলাম। মাঝখানের সুদীর্ঘ সময়ে থমকে দাঁড়াতে না হলে নিশ্চিতভাবেই আমরা আরো এগিয়ে যেতাম, অনেক আগেই।

লেখক : রাজনীতিক এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা