kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

[ কৃষি ]

আগেই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো

শাইখ সিরাজ

১৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আগেই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো

বঙ্গবন্ধু ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিজেদের বীজ নিজেদেরই উৎপাদনের ওপর জোর দেন। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এসে নিজেদের বীজ উৎপাদনের সাধ্য বাড়ানোর ওপর বারবার তাগিদ দেন তিনি। আজ আমাদের ফসল উৎপাদনে ব্যাপক গতিবৃদ্ধির পেছনে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত বীজ বড় অবদান রাখছে

 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্যঃস্বাধীন দেশটিকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছিলেন। এই ভূমিকে দেখেছিলেন সম্ভাবনার এক আধার হিসেবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মাটি আর খেটে খাওয়া তৃণমূল মানুষ তাঁকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, এই বাংলাদেশকে একদিন অবশ্যই জাগিয়ে তোলা যাবে। এই বাংলাদেশ একদিন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে পৃথিবীতে অনন্য আসন দখল করবে। কোথায় কতটুকু গুরুত্ব দিলে সম্ভাবনার আলো জ্বলে উঠবে, সেই জায়গাগুলো তিনি চিহ্নিত করে একে একে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। বিশেষ করে কৃষি ও কৃষকের চোখে কিভাবে স্বপ্নের বীজ বোনা যায়, এ চিন্তাটিই ছিল সবচেয়ে আগে। তিনি ঋণ বিতরণ, বীজ বিতরণ, সেচ পাম্প বিতরণ, ত্রাণ বিতরণের বিশাল এক কর্মসূচি হাতে নেন।

বঙ্গবন্ধু খাসজমিসহ ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করার জন্য পরিবারপ্রতি ১০০ বিঘা নির্ধারণ করে দেন। উন্নত বীজ, সার, সেচের নানা ধরনের পাম্প ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি ১৯৭২ সালে ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সারে ভর্তুকিমূল্য নির্ধারণ করে দেন যথাক্রমে ২০, ১৫ ও ১০ টাকা। এ ছাড়া পাকিস্তান আমলে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা মওকুফ করে দেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরতরে রহিত করে দেন। দরিদ্র কৃষকদের রক্ষায় নিম্নমূল্যে রেশনপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেন তিনি। গরিব কৃষক পরিবারের সন্তান যেন সরকারি খরচে লেখাপড়া করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়। তাঁর সরকার ইজারাদারি প্রথা বিলুপ্ত করে, ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয় স্থাপন করে এবং সেলামি ছাড়া জমি বণ্টনের ব্যবস্থা করে।

স্বাধীনতার দেড় বছরের মাথায় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) প্রণয়ন করা হয়। সেই পরিকল্পনায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি দেশের কৃষিসহ অন্যান্য খাতে নানা রকম ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু দেশের কৃষি উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেন সামগ্রিক জরিপ। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বোঝায় না; বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাক-সবজি এসবকে বোঝায়। সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্য উৎপাদনে উন্নতি করতে হবে। আমাদের আর্থ-সামাজিক কারণে দেশে দিন দিন জমির বিভাজন বেড়েই চলেছে। যদি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা না যায়, তাহলে আমাদের কৃষি উন্নয়ন ব্যাহত হবে। অধিক শস্য উৎপাদনের জন্য আমাদের সবার সমন্বিত কৃষিব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মাঠের ফসল, গবাদি পশু, মাছ, পরিবেশ—সব কিছুর মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় করতে হবে।’ তিনি বলেন ‘মানুষকে অধিক মাত্রায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। বিশেষ করে কৃষিশিক্ষা, কৃষি অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানে সংশ্লিষ্ট সবাইকে শিক্ষিত করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পুনঃসংস্করণ, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, ইক্ষু গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনসহ অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেন।

বঙ্গবন্ধুর উন্নয়নচিন্তাগুলো যদি পঁচাত্তরের কলঙ্কিত অধ্যায়ে বাধাপ্রাপ্ত না হতো, তাহলে আমাদের কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তার জায়গাটি বহু আগেই পাকাপোক্ত হয়ে যেত। অনেক আগেই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে রপ্তানিতে সাফল্য অর্জন করতে পারত। আশার কথা হলো, বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও চিন্তাগুলো সামনে নিয়েই এগিয়ে চলতে শুরু করেছে আমাদের কৃষি। ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার লক্ষ্যে সরকার সারের মূল্য চার দফা কমিয়ে কৃষকের ক্রয়সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শাহাদাতবরণের টানা ৩৪ বছর পর কৃষক আবার তাঁদের অনুকূল দামে সার কেনার সুযোগ পেলেন। কৃষি উৎপাদনব্যবস্থায় আমাদের সাফল্য সারা বিশ্বেই এখন দৃষ্টান্তমূলক। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে আমাদের স্থান এখন দশম। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে সপ্তম, আম উৎপাদনে সপ্তম এবং পেয়ারায় অষ্টম। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ইলিশে প্রথম, মুক্ত জলাশয়ে তৃতীয়, তেলাপিয়ায় চতুর্থ, বদ্ধ জলাশয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। সব ক্ষেত্রে উৎপাদনব্যবস্থা বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গতি যেমন বেড়েছে, একইভাবে পাল্টে গেছে গ্রামীণ জীবনব্যবস্থা। ঠিক এই পরিবর্তনটি যদি এখন থেকে কয়েক দশক আগে হতো, তাহলে কোথায় থাকত বাংলাদেশ।

কৃষিশিক্ষা, মানসম্মত বীজ উৎপাদন এবং বিতরণ, সুষ্ঠু সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষিতে ভর্তুকি, বালাই ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা, খামারভিত্তিক ফসল ব্যবস্থাপনা, সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ, ভেঙে যাওয়া অর্থনীতি পুনর্গঠন, মিল্ক ভিটা পুনর্গঠন, সার, সেচ, বীজবিষয়ক কার্যক্রম—এসবের ওপর সর্বাত্মক জোর দেন বঙ্গবন্ধু। ঠিক আজকের দিনেও কৃষি উন্নয়নের জন্য এ চিন্তাগুলোই সবচেয়ে কার্যকর। রাসায়নিক সারের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাদের যে সার কারখানাগুলো আছে সেগুলোকে নিশ্চিত উৎপাদনমুখী করতে হবে বেশি করে। প্রয়োজনে আরো নতুন নতুন সার কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে কৃষি বিপ্লব বাস্তবায়নের জন্য।’ কত দূরদর্শী এই চিন্তা!

বঙ্গবন্ধু ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিজেদের বীজ নিজেদেরই উৎপাদনের ওপর জোর দেন। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এসে নিজেদের বীজ উৎপাদনের সাধ্য বাড়ানোর ওপর বারবার তাগিদ দেন তিনি। আজ আমাদের ফসল উৎপাদনে ব্যাপক গতিবৃদ্ধির পেছনে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত বীজ বড় অবদান রাখছে। ব্যাপক হারে উচ্চ ফলনশীল ফসল ও হাইব্রিড সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এর ফলে একদিকে আমাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে জোরদার হচ্ছে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথ ধরে দেরিতে হলেও আমাদের কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও জীবনব্যবস্থায় প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে।

লেখক : উন্নয়ন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা