kalerkantho

প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দিতে সেই ভোররাত

আশরাফ-উল-আলম   

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোর সাড়ে ৪টা-৫টার দিকে রাজধানীর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আক্রমণ করেন বিপথগামী কতিপয় সেনা কর্মকর্তা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমণ্ডি থানায় মামলা করেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী (আবাসিক) মোহিতুল ইসলাম। তিনি ওই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তৎকালীন পুলিশের বিশেষ শাখার ফোর্স উপসুপার (ডিএসপি) নুরুল ইসলাম (পরে এসপি), বঙ্গবন্ধুর দেহরক্ষী হাবিলদার কুদ্দুস সিকদার, নায়েক সুবেদার আবদুল গনি ও সেনা সদস্য সোহরাব আলী। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গৃহকর্মী আবদুর রহমান রমা ও সেলিমও প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাঁদের বর্ণনায় জানা যায় কী ঘটেছিল সেই রাতে।

মোহিতুল ইসলাম : বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মোহিতুল ইসলাম ঘটনার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর কেউ কিছু করতে পারছে না। চারদিকে থমথমে অবস্থা। কিছুদিন নিশ্চুপ থাকেন। কিন্তু অত্যন্ত নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যা তিনি দেখেছেন তার বিচার না হলে সেটি হবে জাতির জন্য কলঙ্কজনক। তাই ঘটনার ৪৭ দিন পর ১৯৭৫ সালের ২ অক্টোবর তিনি ধানমণ্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন। নিজের জীবনে কী ঘটবে না ঘটবে, সেটি চিন্তা করেননি তিনি। বিবেকের তাড়নায় একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রত্যাশায় তিনি মামলা করেন। ২১ বছর পর যখন বিচার শুরু হলো আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মোহিতুল জবানবন্দিতে বলেন, তিনি ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই দিন রাত ৮টা-৯টার দিকে বঙ্গবন্ধু বাসায় ফেরেন। তাঁর সঙ্গে রক্ষীরা চলে যান। রাত ১টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু বাড়িতে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে গল্প করেন। এরপর তিনি শুতে যান। ভোর অনুমান সাড়ে ৪টার দিকে বঙ্গবন্ধু টেলিফোন অপারেটরকে ফোন দেন। অপারেটর আবদুল মতিন ফোন ধরেন। মোহিতুল ইসলামকে ডেকে তোলেন মতিন। মোহিতুল ফোন ধরলে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেরনিয়াবাতের (আ. রব সেরনিয়াবাত) বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করছে। জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাগা।’ সঙ্গে সঙ্গে মোহিতুল পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাইন লাগানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু লাইন না পাওয়ায় গণভবনে ফোন করেন। সেখানে টেলিফোন রিসিভ করলেও কেউ কথা বলে না। এ সময় বঙ্গবন্ধু দোতলা থেকে নিচে নেমে আসেন। মোহিতুল হ্যালো হ্যালো বলে চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু মোহিতুলের হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি।’ ঠিক সেই মুহূর্তে একঝাঁক গুলি জানালার কাচ ভেঙে অফিস ঘরের দেয়ালে লাগে। অনর্গল গুলি আসতে থাকে। বঙ্গবন্ধু টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন। মোহিতুলকেও শুয়ে পড়তে বলেন। কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হয়। ওপর থেকে বঙ্গবন্ধুর কাজের ছেলে পাঞ্জাবি ও চশমা নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু তা পরেন। পরে তিনি বারান্দায় যান। তিনি বলেন, ‘আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি এত গুলি চলছে, তোমরা কি করো?’ এই বলে বঙ্গবন্ধু ওপরে উঠে যান। এর পরপরই শেখ কামাল নিচে বারান্দায় আসেন।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আর্মি, পুলিশ ভাই আপনারা আমার সঙ্গে আসেন।’ বলার সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারজন কালো ও খাকি পোশাক পরা লোক অস্ত্রসহ শেখ কামালের সামনে এসে দাঁড়ায়। ডিএসপি নুরুল ইসলাম ও মোহিতুল পেছনে ছিলেন। এ সময় মেজর বজলুল হুদা শেখ কামালকে গুলি করেন। শেখ কামাল পড়ে গিয়েও বলেন, ‘আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।’ তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে কামালকে আবার গুলি করেন। তিনি সেখানেই মারা যান। ডিএসপি নুুরুল ইসলাম ও মোহিতুলকে চুল ধরে টেনে নিয়ে বাড়ির ফটকে লাইনে দাঁড় করান। সেখানে পুলিশের লোক ও টেলিফোন অপারেটর মতিনকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসেরকেও সেখানে দাঁড় করান। রান্নাঘর থেকে বুড়ি (গৃহকর্মী) ও রাখাল আজিজকেও নিয়ে আসা হয়। অস্ত্রধারী লোকেরা গুলি করতে করতে ওপরে ওঠে। এ সময় বঙ্গবন্ধুর উচ্চকণ্ঠ শোনা যায়।

ফটকের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা শেখ নাসের খুনিদের বলেন, ‘স্যার, আমি তো রাজনীতি করি না। আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাই।’ তখন পাশে দাঁড়ানো একজন অস্ত্রধারী বলেন, ‘শেখ মুজিব ইজ ব্যাটার দ্যান নাসের।’ আরেকজন বলেন, ‘ঠিক আছে, নাসের সাহেব পাশের রুমে গিয়ে বসেন।’ নাসের পাশের কক্ষে যান। একটু পরেই তাঁকে সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে শেখ নাসের পানি চান। কিন্তু তাঁকে পানি না দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করতে আবার গুলি করা হয়। তিনি মারা যান। এ সময় শিশু শেখ রাসেল ও গৃহকর্মী রমাকে নিচে নিয়ে আসা হয়। শিশু শেখ রাসেল রমা ও মোহিতুলকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করে। সে বলে, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো।’ পরে খাকি পোশাকধারী একজন জোর করে রাসেলকে নিয়ে যান। রাসেল মায়ের কাছে যেতে চায়। মায়ের কাছে নেওয়ার কথা বলে তাকে ভেতরে নিয়ে যান। একটু পরেই গুলির শব্দ শোনা যায়। এদিকে ওপরের তলায় বঙ্গবন্ধু, শেখ ফজিলাতুন্নেছা, শেখ জামাল, কামালের স্ত্রী সুলতানা, জামালের স্ত্রী রোজী ও এসবির একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতকরা।

মোহিতুল তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, মেজর ফারুক, মেজর নূর, মেজর ডালিম ও মেজর বজলুল হুদাকে তিনি হত্যাকাণ্ডের সময় অন্যদের সঙ্গে ৩২ নম্বরের বাড়িতে দেখেছেন। হত্যাকাণ্ড শেষ হওয়ার পর বাড়ির ফটকের কাছে বজলুল হুদা মেজর ফারুককে বলেন, ‘অল আর ফিনিশড।’

নুরুল ইসলাম : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার নুরুল ইসলাম (তৎকালীন ডিএসবির প্রটেকশন ফোর্স হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাসার গার্ডদের চার্জে ছিলেন) সাক্ষ্যে বলেন, ১৪ আগস্ট দিবাগত রাত অনুমান ১টার সময় তিনি ও  একজন পুলিশ সার্জেন্ট বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে নিচতলার বৈঠকখানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর পিএ-কাম-রিসিপশনিস্ট মোহিতুল ইসলাম সেখানে ছিলেন। ভোর অনুমান ৫টার সময় দোতলা থেকে বঙ্গবন্ধুর গলার আওয়াজ শুনতে পান তিনি। এরপর মোহিতুলের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ঘটনার বর্ণনা দেন।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তোরা কী চাস? : আবদুর রহমান রমা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কাজ করতেন। বঙ্গবন্ধুর নিচে নামার পর আবার ওপরে ওঠার বর্ণনা দিয়ে রমা বলেন, একসময় বঙ্গবন্ধু তাঁর শোবার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। কিছুক্ষণের জন্য গোলাগুলি থেমে যায়। এরপর বঙ্গবন্ধু বের হন। তাঁকে খুনিরা ঘিরে ধরে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কী চাস? আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?’ খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে সিঁড়িতে নিয়ে যায়। সিঁড়ির দু-তিন ধাপ নেওয়ার পর তাঁকে গুলি করা হয়। রমা তখন বঙ্গবন্ধুর পেছনে ছিলেন। খুনিরা তাঁকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুই কে?’ রমা উত্তর দেন, তিনি এ বাসায় কাজ করেন। তাঁকে বলে, ‘তুই ওপরে যা।’ রমা ওপরে গিয়ে বেগম মুজিবকে বলেন, ‘আম্মা, আর্মিরা সাহেবকে গুলি করেছে।’ বেগম মুজিব এ সময় বাড়ির অন্য সবাইকে নিয়ে বাথরুমে আশ্রয় নেন। পরে বেগম মুজিব বলেন, ‘মরলে সবাই একসঙ্গে মরব। তোরা বের হয়ে আয়।’ এর আগেই খুনিরা বেগম মুজিবের কক্ষে ধাক্কা মারে। বেগম মুজিব বের হয়ে আসেন। সবাইকে তখন নিচে নামানোর চেষ্টা করে। বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে চিৎকার করেন। বলেন, ‘আমি নিচে যাব না। আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’ এরপর সবাইকে দোতলায় নিয়ে যায়। সবাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর কাজের ছেলে সেলিম শয়নকক্ষের সামনে করিডরে ঘুমিয়ে ছিলেন। তাঁকে বঙ্গবন্ধুর সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু এ সময় বলেন, ‘ছেলেটি অনেক দিন আমার কাছে আছে। তাকে কে গুলি করল। তোরা কেন বেয়াদবি করছিস?’ এর পরই বঙ্গবন্ধুকে গুলি করা হয়।

মহিলাদের আর্তচিৎকার : মোহিতুল বলেন, নারীদের আহাজারি আর আর্তচিৎকারও তিনি শোনেন। কিন্তু এসব খুনিদের মন গলাতে পারেনি। কুদ্দুস সিকদার, সেলিম, রমা, নুরুল ইসলামও তাঁদের সাক্ষ্যে বাড়ির মহিলাদের চিৎকারের বর্ণনা দেন জবানবন্দিতে।

বঙ্গবন্ধুর সেনা রক্ষী হাবিলদার কুদ্দুস সিকদার বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সিঁড়িতে নেওয়ার পর তিনি খুনিদের বিভিন্ন প্রশ্ন করার সময় মেজর নূর ও মেজর বজলুল হুদা ইংরেজিতে কী কী যেন বলতে শুনেন। তাঁদের হাতে থাকা স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করেন। আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেম বেগম মুজিব, শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে গুলি করে হত্যা করেন।

বঙ্গবন্ধুর পররে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি ছিল :  যখন গুলি করা হয় তখন বঙ্গবন্ধুর পরনে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি ছিল। চোখে চশমা, হাতে সিগারেটের পাইপ ও একটি ম্যাচ ছিল। কুদ্দুস সিকদার তাঁর জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন।

মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে খুনিরা : বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সবাইকে খুন করার পর সেনা জোয়ানরা ওই বাড়ির আলমারি ও আসবাবপত্র তছনছ করে। বিভিন্ন স্থান থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। আলমারির ড্রয়ার খুলেও জোয়ানরা কিছু মালামাল নেয়। সুবেদার মেজর ওয়াহাবও (আবদুল ওয়াহাব জোয়ারদার) জোয়ানদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি একটি ব্রিফকেস, সোনার গয়না, বিদেশি মুদ্রা, রেডিও, টেলিভিশন নিয়ে নিচে থাকা একটি গাড়িতে তোলেন। অন্যান্য জিনিসপত্র অন্য জোয়ানরা ব্যাগে করে নিয়ে যায়। ওই বাড়ি ও লাশ পাহারা দেওয়ার জন্য কুদ্দুস সিকদারকে রেখে যায়। এর মধ্যে কর্নেল জামিলের লাশ একটি গাড়িতে করে ওই বাড়িতে আনা হয়।

মন্তব্য