kalerkantho

নূর চৌধুরীকে ফেরাতে মামলা ঝুলছে কানাডায়

► যুক্তরাষ্ট্রে রাশেদ চৌধুরীর ব্যাপারেও অগ্রগতি নেই
► বাকি ফেরারিদের অবস্থান নিয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই, সম্ভাব্য আশ্রয়দাতা দেশগুলোও তথ্য দিচ্ছে না

মেহেদী হাসান ও ওমর ফারুক   

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বঙ্গবন্ধুর খুনি ফেরারি নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দিচ্ছে না কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ওই দেশ দুটিকে বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলে যাচ্ছে; কিন্তু তাঁদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই।

জানা গেছে, রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পেতে তদবির করেও কাজ হয়নি। বাংলাদেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে—এমন আশঙ্কা জেনেও কানাডা নূর চৌধুরীর শরণার্থী মর্যাদা দেওয়ার কারণ খুঁজে পায়নি। কানাডা থেকে বহিষ্কারাদেশ এড়াতে নূর চৌধুরীর করা ‘প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ আবেদন ওই দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এক দশক ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে বাংলাদেশ গত বছরের ৭ জুন মামলা করে। বাংলাদেশের পক্ষে আইনি প্রতিষ্ঠান টরিস এলএলপি ওই মামলায় কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের পাশাপাশি ফেরারি নূর চৌধুরীকেও পক্ষভুক্ত করে।

গত ২৫ মার্চ অন্টারিওর ফেডারেল আদালতে সেই মামলার প্রথম শুনানির সময় বাংলাদেশপক্ষ কানাডায় নূর চৌধুরীর ‘লিগ্যাল স্ট্যাটাস’ জানতে চায়। তবে কানাডার অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষ আদালতকে বলেছে, নূর চৌধুরীর ‘লিগ্যাল স্ট্যাটাস’ না জানায় কানাডার জনগণের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

গত ২৫ মার্চ শুনানির পর আদালত এ বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কবে নাগাদ আদেশ দেবে বা আরো শুনানি করবে কি না, তা আদালতের ওপরই নির্ভর করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত ২ আগস্ট ব্যাংককে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডের সঙ্গে বৈঠকে নূর চৌধুরীকে ফেরত চেয়েছেন। ড. মোমেন ঢাকায় ফিরে সাংবাদিকদের জানান, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর দেশের আইন খুব স্পর্শকাতর। ফাঁসি হতে পারে—এমন কোনো ব্যক্তিকে কানাডা ফেরত দেয় না। নূর চৌধুরীর বিষয়টি এখন আর কানাডা সরকারের নির্বাহী বিভাগের হাতে নেই।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আদালতের রায় কার্যকরে ফেরারি ঘাতককে ফেরত পাঠানোর যুক্তি তুলে ধরলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে কথা বলে জানাবেন।

কোনো অগ্রগতি নেই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি ফেরারি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও। ব্যাংককে গত ২ আগস্ট দেখা হওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনকে বলেন, ‘ডোন্ট আস্ক মি ইওর রাশেদ চৌধুরী’ (আপনাদের রাশেদ চৌধুরীর বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না)। পম্পেও মনে রেখেছেন, ড. মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত চান।

ড. মোমেন সাংবাদিকদের বলেছেন, একবার এক বৈঠকে তাঁর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন যে বাংলাদেশ যাকে ফেরত চাইছে তিনি কি রাশেদ চৌধুরী, নাকি ডেভিড ওয়াটসন? ড. মোমেনের ধারণা, ফেরারি আসামিরা নাম পরিবর্তন করে থাকতে পারেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাঁদের নানা সুবিধা দেওয়া সরকারগুলোও তাঁদের বেনামে পাসপোর্ট করে দিয়েছে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। তবে সেই আশ্রয় বাতিলের জন্য অনুরোধ করেও এখন পর্যন্ত ইতিবাচক ফল মেলেনি।

২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর ফেরারি আসামিদের মধ্যে ছয়জন জীবিত আছেন বলে জানা যায়। তাঁদের মধ্যে শুধু নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীর অবস্থানের ব্যাপারেই সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। বাকি চার ফেরারি আসামি—মোসলেহউদ্দিন, শরীফুল হক ডালিম, খন্দকার আবদুর রশীদ ও আবদুল মাজেদের ব্যাপারে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এর বাইরে  ফেরারি আসামি আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা গেছেন বলে জানা যায়।

ফেরারি আসামি মোসলেহউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে জার্মানিতে পালিয়ে আছেন—এমন সন্দেহে জার্মান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেও বাংলাদেশ নিশ্চিত তথ্য পায়নি। শরীফুল হক ডালিম কেনিয়া ও জিম্বাবুয়েতে ব্যবসা করছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। খন্দকার আবদুর রশীদকে পাকিস্তানে দেখা গেছে—এমন খবরের ভিত্তিতে বাংলাদেশ কয়েক বছর আগে পাকিস্তানের কাছে তথ্য চেয়েছিল; কিন্তু পাকিস্তান এর কোনো জবাব দেয়নি। আবদুল মাজেদও পাকিস্তানে আছেন বলে ধারণা করা হয়। ওই ফেরারি আসামিদের ধরতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার রেড কর্নার নোটিশ জারি থাকলেও কোনো দেশ তা কার্যকরে সহায়তা করছে না।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিচারের উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে পাঁচ আসামি বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান ও সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ার পর একই পরিণতির আশঙ্কায় অন্য ঘাতকরা বিদেশে পালিয়ে আছেন।

১০ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও ফেরারি আসামিদের ফেরাতে না পারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সবাই মিলেই ফেরারি আসামিদের ফেরাতে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ অনেক। অতীতে দুজন ফেরারি আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আগেই দু-একজন ফেরারি আসামিকে ফিরিয়ে আনার জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

মন্তব্য