kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

শুরু থেকেই পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজরে ছিলেন শেখ মুজিব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



শুরু থেকেই পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজরে ছিলেন শেখ মুজিব

পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নথিপত্রে তাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘ভৃত্য’ (সবহরধষ) হিসেবে। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘটের পক্ষে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন তিনি ছাত্রনেতা, ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই আইন বিভাগে স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। আন্দোলনে সমর্থনের দায়ে শেখ মুজিব ও আরো কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে জরিমানা, বহিষ্কারাদেশসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছিল উপাচার্যের বাসভবনে। ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল সেখান থেকে গ্রেপ্তার করে তিন মাসের আটকাদেশ দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় তাঁকে। এতে বিক্ষোভ আরো ছড়িয়ে পড়ে, অচল হয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চলে আন্দোলন।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টায় পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরীকে পাঠানো হয়েছিল কারাগারে শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে। ফজলুল কাদের জানতে চান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি সমঝোতা চান কি না? শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের মতো—এ যুক্তি দেখিয়ে তিনি শেখ মুজিবকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইলে ক্ষতি কী! বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ছাত্ররা এমন কোনো অন্যায় কাজ করেনি যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। আর ছাত্রদের জন্য সম্মানজনক কিছু হলেই শুধু সমঝোতা হতে পারে। কারাগার থেকে তিনি নিজেই শর্ত জুড়ে দেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি নিঃশর্তভাবে শাস্তি প্রত্যাহার করে এবং আন্দোলনের দায়ে আটক সব শিক্ষার্থীকে যদি মুক্তি দেওয়া হয়, তাহলেই নিষ্পত্তির আলোচনা চলতে পারে।

জেল কর্তৃপক্ষ এসব শর্ত লিখিতভাবে পাঠিয়েছিল ফজলুল কাদের চৌধুরীর কাছে, যার প্রতিলিপি জমা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ফাইলে, যার নম্বর পি.এফ.৬০৬-৪৮। পাকিস্তানের শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীর দাবি, জমিদারি প্রথা বিলোপ, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য হিসসা, খাদ্য ও বস্ত্র সংকট, প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের ন্যায্য বেতনসহ গণমানুষের অধিকার প্রশ্নে আপসহীন শেখ মুজিবকে চোখে চোখে রেখেছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দারা। তাঁর প্রতিদিনের চলাফেরা, কাজকর্ম নিয়ে দৈনিক প্রতিবেদন, সাপ্তাহিক গোপন প্রতিবেদন, সাইড নোট, রেফারেন্স নোট, বিশেষ প্রতিবেদন স্তূপীকৃত হতে থাকে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অব ইস্ট বেঙ্গলের (আইবিইবি) ঢাকা শাখার অফিস। তাঁর নামে খোলা ‘ব্রিফ হিস্ট্রি’ হালনাগাদ হতে থাকল কয়েক দিন পর পর। দেড় বছরের মাথায় তাতে যুক্ত হলো ৩১ পয়েন্ট। ইংরেজিতে লেখা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাঁকে কোথাও ‘দ্য সাবজেক্ট’, কোথাও ‘সাসপেক্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি নিয়ে পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংকলিত হয়েছে ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ে। প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। এটি সম্পাদনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত নথির তথ্য স্থান পেয়েছে ৫৮২ পৃষ্ঠার এ খন্ডে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু আরো অনেক আগে। পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের কাছে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি নিজেই বলেছেন তাঁর রাজনীতি শুরুর ইতিহাস। ১৯৩৭ সালে জন্মস্থান গোপালগঞ্জ থেকেই ছাত্ররাজনীতি শুরু তাঁর। এরপর কলকাতা থাকাকালে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকায় নতুন করে ছাত্ররাজনীতির কাঠামো তৈরি করেন, জাতীয় রাজনীতির নতুন রূপরেখা প্রণয়নে সচেষ্ট হন।

ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট লিগ তখন ক্ষমতাসীন দলেরই সমর্থক ছাত্রসংগঠন। তবু শেখ মুজিব সরকারের সব অন্যায্য সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ করেছেন নির্দ্বিধায়। পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের দৃষ্টিতে তাঁর প্রতিবাদ, বক্তব্য, বিবৃতি, আন্দোলন সব সরকার পতনের ষড়যন্ত্র। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে দুই বাংলা এক করার ষড়যন্ত্র করছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির সাত মাসের মাথায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত অবস্থায় ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ গ্রেপ্তার হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থনের কারণে পরের বছরের ১৯ এপ্রিল আবার আটক হন।

প্রথমবার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গোপালগঞ্জ শহরে হরতাল পালিত হয়। এ নিয়ে ফরিদপুরের এসপির পাঠানো সাপ্তাহিক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুল-কলেজের ছাত্ররা মিছিল করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘নাজিমুদ্দিন নিপাত যাক’, মুজিবকে মুক্ত কর’ স্লোগান দেয়। ওই প্রতিবেদনের ‘সাইড নোটে’ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রশ্ন : মুজিবুর রহমান কি ‘ভাষা ষড়যন্ত্র’ মামলায় গ্রেপ্তার? গোপালগঞ্জের শিক্ষার্থীরা তাঁর পক্ষ নিল কেন?

গোয়েন্দারা যে তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করত, এর উল্লেখ তাদের প্রতিবেদনেই আছে। যেখানে ঢুকতে পারত না, সেখানকার তথ্য পেত নিয়োগ করা এজেন্টদের কাছ থেকে। তারা সত্য-মিথ্যা যেসব তথ্য দিত, সেগুলোও নথিভুক্ত করা হতো। এ রকম একটি প্রতিবেদনে রয়েছে : হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতার শরৎ বোসের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ পেয়েছেন দুই বাংলা একীভূত করতে। শেখ মুজিবও এ লক্ষ্যে কাজ করছেন।

১৯৪৯ সালের ১৯ মার্চ এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা লিখেছেন, তিনি ১৫০ মিটফোর্ড রোডে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত, আবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গোপনে অপেক্ষা করে শেখ মুজিবকে দেখেননি। একপর্যায়ে তাঁকে ১২ অভয় দাস লেন থেকে বের হয়ে সাইকেলে চেপে চলে যেতে দেখেছেন। সাইকেল না থাকায় তাঁকে ‘শ্যাডো’ করতে না পারার কথাও লিখে জানিয়েছেন ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

ওই সময় মুজিব অভয় দাস লেনের ওই ঠিকানায় থাকতেন। ২৮ তারিখ রাত ৮টা পর্যন্ত তাঁকে ওখানে ঢুকতে বা ওখান থেকে বের হতে না দেখে গোয়েন্দারা পরে জানতে পারে, তিনি সাংগঠনিক সফরে রাজশাহী ও দিনাজপুর গেছেন। পরে ওই দুই জেলার গোয়েন্দার তাঁর ওপর নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে তিনি জনসভায় কী বলেছেন তার বিবরণও যথারীতি এসে জমা হয় ঢাকার গোয়েন্দা অফিসে। এ প্রতিবেদনে তাঁকে ‘দ্য সাসপেক্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী আন্দোলনে সমর্থনের অভিযোগে দেওয়া আটকাদেশের ব্যাখ্যায় স্বরাষ্ট্র বিভাগ বলেছে, আপনি পূর্ববঙ্গ সরকারকে সহিংসতার মাধ্যমে উত্খাতের উদ্দেশ্যে বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রদের উসকে দিচ্ছেন, যা প্রদেশের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ জন্য আপনাকে বেঙ্গল স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্টের ১০সি ধারায় তিন মাসের আটকাদেশ দেওয়া হলো।

পূর্ববঙ্গের স্বরাষ্ট্র বিভাগের আরেক মেমোতে বলা হয়েছে, ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ লিগ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে তিনি ঢাকা, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন। শরৎ বোস-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের হয়ে তিনি দুই বাংলা একীভূত করার লক্ষ্যে সক্রিয়।

শেখ মুজিব ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সম্পাদক। ১৫০ মোগলটুলির অফিসে সংগঠনের মিটিংয়ে কী আলোচনা হচ্ছে, তিনি সাংগঠনিক সফরে কোন জেলায় যাচ্ছেন, সব কিছুতেই গোয়েন্দা নজরদারি। সেখানে জনসভায় তিনি কী বলছেন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত বিবরণ থাকত। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে না ঢুকতে পারলেও পরদিন পত্রিকায় কী রিপোর্ট বা বিবৃতি ছাপা হলো তার কপিও সংযুক্ত করা হতো ফাইলে।

তাঁর কাছে আসা চিঠিপত্র পোস্ট অফিস থেকেই গায়েব হয়ে যেত। সাংগঠনিক সংবাদ পত্রিকায় ছাপানোর অনুরোধ জানিয়ে জেলা থেকে পাঠানো অনেক চিঠি তাঁর হাতেই পৌঁছয়নি, সেগুলোও রাখা আছে তাঁর ব্যক্তিগত ফাইলে। কাগমারীর ঠিকানায় মওলানা ভাসানীকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠিও ইংরেজি তরজমাসহ পড়ে আছে সেখানে।

পাকিস্তানের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ছাত্র সম্প্রদায়ের কর্তব্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিবৃতির কপিও সংযুক্ত রয়েছে ফাইলে। তাতে তিনি বলেছেন, ’১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট আমরা যে আজাদী লাভ করিয়াছি সেটা যে গণ-আজাদী নয় তা গত একটি বছরে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইয়াছে।’

খুলনার এসপির সাপ্তাহিক গোপন প্রতিবেদেন উল্লেখ রয়েছে : শেখ মুজিব দৌলতপুর ও বাগেরহাটে জনসভা করে সরকারের খাদ্যনীতি, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন না দেওয়া ও মন্ত্রীদের প্লেনে চড়ে ঘোরাঘুরির সমালোচনা করেছেন।

১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা ডিআইবির সাপ্তাহিক প্রতিবেদেনে উল্লেখ রয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সভা করে শিক্ষার্থীদের সরকারের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন। গোপালগঞ্জের এক সভায় ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, শেখ মুজিব বাংলাকে আদালতের ভাষা হিসেবে ব্যবহার ও মন্ত্রীদের বেতন কমানোর দাবি জানিয়েছেন। খাদ্য সংকট সমাধান না করতে পারলে স্থানীয় এমএলএর পদত্যাগ দাবি করেছেন। রাজশাহী কলেজে ছাত্রদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না হলে প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভের কথা বলেছেন।

১৯৪৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গোপন প্রতিবেদনে বিভিন্ন জেলায় ছাত্রলীগের সংগঠন, কৃষক সমাবেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী আন্দোলনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বশীল ভূমিকার বৃত্তান্ত রয়েছে।

১৯৪৮ সালের ৫ মে ফরিদপুরের এসপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ মুজিব গোপালগঞ্জের এক জনসভায় কাপড় ও খাদ্যের সংকট ও ছাত্রদের ওপর জুলুমের প্রতিবাদে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। এতে বলা হয়েছে, নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য সোহরাওয়ার্দী বরিশাল বা যশোরে জমি কিনবেন, তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন শেখ মুজিব।

ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীর জনসভার গোপন প্রতিবেদনে গোয়েন্দারা বলেছেন, এসব জনসভায় মুজিব জমিদারি প্রথা রহিত করার দাবি জানিয়েছেন। গরিবের ওপর করের বোঝা চাপানোর সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেক বেতন, তাঁদের বেতন কমিয়ে নিম্নপর্যায়ের সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়াতে হবে। পুলিশের বেতন বাড়ালে ঘুষ কমবে। প্রাথমিক শিক্ষকদের সাত মাসের বেতন বকেয়া থাকার সমালোচনা করে তিনি অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি তোলেন।

ওই বছরের জুলাই মাসে আরেক প্রতিবেদনে ফরিদপুরের পুলিশ জানিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকেই মুজিব এর বিরোধিতা করে আসছেন। এসেম্বলিতে উর্দুর প্রতি সমর্থন জানানোয় করাচি থেকে ফেরার সময় মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনকে বিমানবন্দরে কালো পতাকা প্রদর্শনের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন মুজিব। ওই প্রতিবেদনে ১ মার্চ থেকে শেখ মুজিবের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ রয়েছে। ইংরেজি প্রতিবেদনে শেখ মুজিবকে ‘দ্য সাবজেক্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি ‘ভাষা ষড়যন্ত্রের’ পক্ষে ১১ মার্চ ধর্মঘটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন, ছোট ছোট দলে ছাত্র-ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভাঙবে এ সিদ্ধান্ত নেন ফজলুল হক হলের সভায়। এ জন্য ১১ মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ব্রিফ হিস্ট্রিতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সব সদস্যের বিবরণ, তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কারা সরকারি চাকরিতে আছেন তাঁদের তথ্যও আছে। তাঁর সহোদর শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রবের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তাঁর আয়ের উৎস নিয়েও খোঁজখবর নিয়েছেন গোয়েন্দারা। এক প্রতিবেদনে সেই তথ্য আছে। ১৯৪৯ সালের ২৫ মে গোয়েন্দা পরিদর্শক তাঁর প্রতিবেদনে জানান, শেখ মুজিবের বাবা শেখ লুত্ফর রহমান মুনসেফ কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত সেরেস্তাদার হিসেবে মাসে ৫০-৬০ রুপি পেনশন পান। তিনি তালুকদার ও সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁর ১০০ বিঘার মতো ফসলি জমি আছে। এ ছাড়া আর কোনো আয় নেই। শেখ মুজিব স্ত্রীর সূত্রে কিছু জমি পেয়েছেন, সেখান থেকে বছরে আয় দুই হাজার রুপি। তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে এবং নিজের জমির আয় থেকে খরচের টাকা পান।

তখন ‘কমিউনিস্ট’ জুজুর প্রবল ভয় ছিল পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের। ছাত্র আন্দোলনকে কটাক্ষ করে ‘পঞ্চম বাহিনী’ ও কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র বলা হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী আন্দোলনে কমিউনিস্ট প্রভাব কি না—ফজলুল কাদেরের এমন প্রশ্নে বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর ছিল তখনকার তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের। তিনি বলেন, কমিউনিস্টদের সঙ্গে তিনি আঁতাত করেননি। বরং কমিউনিস্টরা যাতে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে না নিতে পারে সে জন্য তিনি কর্মচারীদের পক্ষ নিয়েছেন। যদিও ছাত্র ও কর্মচারীদের আন্দোলনে ছাত্রলীগের পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনে কমিউনিস্ট সমর্থিত ছাত্রসংঠনও যে সক্রিয় ছিল, এর দৈনন্দিন প্রতিবেদন গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনেই রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা