kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

জোটের প্যাঁচে সুযোগ পাচ্ছে না তরুণরা

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে দিনে দিনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা লম্বা হচ্ছে। নতুন কাউকে সুযোগ না দিয়ে একই ব্যক্তিকে বারবার মনোনয়ন দেওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, একবার জয়ী হলে বা মনোনয়ন পেলে কেউ আর অবসরে যেতে চান না। বারবার তিনি মনোনয়ন চান। এসব কারণে দুই ্উপজেলায় জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন কিংবা দলীয় পদ-পদবি পাওয়া না পাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। থমকে আছে নেতৃত্বের বিকাশ। অথচ মাঠপর্যায়ের রাজনীতি ও মানুষের বিপদে-আপদে আওয়ামী লীগের তরুণ নেতারা সামনের কাতারে থেকে ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের দাবি, এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যতে রাজনীতি কিংবা নির্বাচন নিয়ে দলের ভেতরেই সৃষ্টি হবে মহাহাঙ্গামা। রাজনীতি বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।

গত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু মোট চারবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়ে আর ২০০৮ ও ২০১৪ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন তিনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ কারণে এবার খালি হাতে তরুণ নেতাদের ঘরে ফিরতে হবে বলে ধারণা সবার। অন্যদিকে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ড. মিজানুল হক আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এ আসন থেকে। এবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে মনোনয়নপত্রে ভুল থাকায় রিটার্নিং অফিসার তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন। পরে আপিল করেও তিনি আর নির্বাচনে ফিরতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক তরুণ নেতা বলেন, ১০ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে থাকা যথেষ্ট সময়। এরপর আর কারো এ পদ নিয়ে আগ্রহ দেখানো উচিত নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এমপি পদে এত ক্ষমতা, এত মধু যে কেউ এ পদের লোভ সংবরণ করতে পারেন না।

করিমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, মহাজোটের কারণে বৃদ্ধ প্রার্থীদের জটই তো ভাঙা যাচ্ছে না। তরুণদের জট ছুটবে কিভাবে? তিনি বলেন, মনে হয়, আসনটি জাপার জন্য সংরক্ষিত হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যদি মনোনয়ন পেতেন, তাহলে দলে এই লেজেগোবরে অবস্থা হতো নয়। নতুনরাও সুযোগ পেয়ে যেত।

কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করতে চেয়ে ১৯ জন দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। তাঁদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ড. মিজানুল হক, করিমগঞ্জ আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ, জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহসভাপতি এরশাদ উদ্দিন, আইটি ব্যবসায়ী মুক্তিযোদ্ধা শেখ কবীর আহমেদ, কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আসাদুল হক, জেলা বিএমএ নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহবুব ইকবাল, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এমরান আলী ভূইয়া, ড. আনিছুর রহমান আনিছ, ডা. মজিবুর রহমান আঙ্গুর এবং মাসুদ খান অন্যতম।

কিন্তু আওয়ামী লীগ এ আসনে কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। বর্তমান সংসদ সদস্য, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুই মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। 

করিমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ। তাঁকে ২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। পরে মহাজোটের স্বার্থে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করে দেওয়া হয় জাপা নেতা মুজিবুল হক চুন্নুকে। এতে আওলাদসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেয় নেতাকর্মীরা। এবারও আওলাদ দলের মনোনয়ন ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু এবারও তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।

জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহসভাপতি, তরুণ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী এরশাদ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তরুণ নেতাকর্মীরা সারা বছর তৃণমূলে মানুষের কাজ করি। ব্যবসা-বাণিজ্য ফেলে এলাকায় সময় দিই। দলের হয়ে কাজ করি। দলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করি। মাঠেঘাটে দলের হয়ে ফসল ফলাই। কিন্তু সেই ফসল ঘরে তোলে অন্য কেউ। আমাদের সেখানে কোনো হিস্যা থাকে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘করিমগঞ্জ-তাড়াইলে বারবার একই ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার যে প্রথা চালু হয়েছে এর শেষ দরকার। আমরাও তো একটা আশা নিয়ে রাজনীতি করি। তাহলে আমরা কী করব!’ 

করিমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তরুণ নেতা ইমরান আলী ভূঁইয়া এবার দলের মনোনয়ন ফরম কিনে জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এবার আওয়ামী লীগের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির পুরনো প্রথা থেকে বের  না হলে দল ও রাজনীতির বড় ক্ষতি হবে। কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে তরুণ নেতাকর্মীরা সুযোগ না পাওয়ায় রাজনীতির প্রতি অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তার ওপর আমাদের ঘাড়ে চেপেছে জাতীয় পার্টি। মহাজোটের হয়ে তিনি গত দুটি নির্বাচন করেছেন। দলীয় রাজনীতিটাও আমরা ভালোভাবে করতে পারি না করিমগঞ্জে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হিসেবে আমাদের মূল্যায়নও নেই। কাজেই আমি মনে করি, কাউকে দুবারের বেশি মনোনয়ন দেওয়া উচিত নয়। এটা একেবারে আইন করে বন্ধ করা দরকার।’

করিমগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও করিমগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘আমিও দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেউ তো আর আমাদের সুযোগ দেয় না। সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতি, কোথাও তরুণদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এ উপজেলায় ১৭ বছর ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে। তরুণ নেতাদেরও বয়স হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের অনেকেই আজ হতাশায় ভুগছেন। আবার আছে মহাজোটের প্যাঁচ।’ তিনি আরো বলেন, রাজনীতি ও নির্বাচনে এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে আসা দরকার যেখানে তরুণরা সুযোগ পাবে। তরুণরা যদি সুযোগ পেত, তাহলে এভাবে দলে প্রার্থীজট তৈরি হতো না। সবাই পর্যায়ক্রমে সুযোগ পেয়ে যেত।

করিমগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হুমায়ুন কবীর স্বপন বলেন, ‘বহু দিন ধরে এ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নির্বাচন করতে পারছেন না। এ কারণে দলীয় প্রার্থীদের লম্বা লাইন তৈরি হয়েছে। এবার দলের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়েছে। বাববার এক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে তরুণ নেতারা যেমন সুযোগ পান না, দলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দলের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা