kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

আইনজ্ঞরাই হতে পারেন ভালো আইনপ্রণেতা

এম বদি-উজ-জামান   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন হলো দেশের সংবিধান। ১৯৭২ সালে প্রণীত এই সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের (নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা) মধ্যে অন্যতম হলো আইন প্রণয়ন বিভাগ। বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম ভাগে আইনসভা তথা জাতীয় সংসদ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করা আছে। সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “‘জাতীয় সংসদ’ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে।” সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ থেকে এটা স্পষ্ট যে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সময়ে সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণীত হবে।

আইন প্রণয়ন করবেন কারা? সহজ উত্তর হলো সংসদ সদস্যরা। সংসদ সদস্যদের বলা হয়ে থাকে আইনপ্রণেতা। আমাদের দেশে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ৩০০ সংসদ সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনে ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই সাড়ে ৩০০ সদস্য জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নে জড়িত থাকেন। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা, আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, মানবাধিকার রক্ষা করার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে দেশকে একটি সভ্য ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করার লক্ষ্যেই আইন প্রণীত হয়ে থাকে। পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রেরই একই লক্ষ্য থাকে। আর এই কাজটুকু করতে হলে যাঁরা আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাঁদের আইন সম্পর্কে জ্ঞান থাকার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেটা যদি না হয় তবে জাতীয় সংসদে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় সদস্যদের।

আইন প্রণয়ন একটি জটিল ও সূক্ষ্ম কাজ। আইনের কূটকৌশলগুলো ভালোভাবে রপ্ত থাকা ব্যক্তিদেরই আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। এ কারণে জাতীয় সংসদে আইনজ্ঞরা নির্বাচিত হয়ে এলে রাষ্ট্র তাঁদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করতে পারে। যুগে যুগে যাঁরা বিখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান হয়েছেন তাঁরা আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তি ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার আবদুস সালাম, ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান, খন্দকার দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ প্রয়াতরা বিখ্যাত সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আর তাঁদের এই বিখ্যাত হওয়ার পেছনে ছিল আইনপেশায় ডিগ্রি থাকা। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং তাঁর পত্নী শেরি ব্লেয়ারও বিখ্যাত আইনজীবী।

বর্তমান সময়ের সংসদ সদস্যদেরও আইন পেশায় ডিগ্রিধারী। জাতীয় সংসদে আইনজ্ঞদের কদর বেশি হওয়ার কারণেই যাঁরা রাজনীতি করছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আইনজীবী। যাঁরা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাঁরা সুযোগ পেলেই আইনের ওপর ডিগ্রি নিয়ে রাখেন। কর্মজীবনে এসে ব্যবসা বা অন্য পেশায় গেলেও আইনজীবীদের কদর একটু অন্য রকম। 

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, দেশের উন্নয়নের সামগ্রিক ধারাকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ—এই তিনটি অঙ্গের গুরুত্ব অপরিসীম। এই তিন বিভাগের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গণতন্ত্র ও সুশাসন বিকাশে অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘বিচারক ও আইনজীবীরা হলেন সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। তিনি আরো বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিচারক, আইনজীবী ও আইনের শিক্ষার্থীদের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। একটি দেশের সরকারের কৃতিত্ব পরিমাপ করার সর্বোত্তম মাপকাঠি হচ্ছে তার বিচার বিভাগের দক্ষতা ও যোগ্যতা।

প্রধান বিচারপতির এই কথার সূত্র ধরে বলতে হয়, জাতীয় সংসদে আইনজীবীরা না গেলে সেখান থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। আর ভালো আইন না হলে দেশে কোনোভাবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামের অভিমত, জাতীয় সংসদ হলো আইন তৈরির জায়গা। সুতরাং আইনের সঙ্গে যুক্তরা অধিক হারে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াটা দেশের জন্য কল্যাণকর। কারণ আইন সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের ন্যূনতম জ্ঞান না থাকলে সেই সংসদে ভালো আইন প্রণয়ন হতে পারে না। তিনি বলেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে জাতীয় সংসদে যেমন আইন তৈরি হবে সেই আইন মেনেই নির্বাহী বিভাগ দেশ পরিচালনা করবে। আর বিচার বিভাগ বিচার কাজ করবে। আর ভালো আইন না হলে দেশ ভালোভাবে চলতে পারে না। সেখানে কালো আইন তৈরি হতে পারে। আর কালো আইন হলে রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। এমনটি হলে বিচার বিভাগ থেকে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না।  এতে বহির্বিশ্বেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এসব কারণেই জাতীয় সংসদে যাঁরা সদস্য হয়ে যাবেন তাঁদের আইন সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা