kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১         

বিকশিত হয় না বিকল্প নেতৃত্ব

কিশোরগঞ্জের রাজনীতিতে ভিড়ছেন আমলা ও ব্যবসায়ীরা

নাসরুল আনোয়ার ও শফিক আদনান   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন কিশোরগঞ্জের প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নৃশংসভাবে খুন হওয়ার বছরই ৩ নভেম্বর জাতীয় আরো তিন নেতাসহ তিনি নৃশংস জেলহত্যার শিকার হন। কিশোরগঞ্জের আরেক ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ প্রয়াত মো. জিল্লুর রহমানও দেশের রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেছেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কিশোরগঞ্জ তথা হাওরের সন্তান। চলতি মেয়াদের পর তাঁর রাজনীতি থেকে অবসরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সুযোগ্য সন্তান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও কিশোরগঞ্জের মানুষ। তিনি বেশ অসুস্থ হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর পক্ষে দলীয় মনোনয়ন জমা পড়ে।

এরপর ‘কিশোরগঞ্জ থেকে জাতীয় নেতৃত্বে কে পদার্পণ করছেন’ অথবা ‘জাতির হাল ধরার মতো আর কে আছেন’ এবং ‘জেলার রাজনীতিই বা কার হাতে পড়ছে’—একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কিশোরগঞ্জজুড়ে এজাতীয় আলোচনা খুব শোনা যায়। অনেকে বলছে, ‘রাজনৈতিক দিক নেতৃত্বশূন্য হতে চলেছে দেশের আলোচিত জেলা কিশোরগঞ্জ।’ এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতারও আশঙ্কা করছে তারা।

রাজনীতিতে সদ্য আসা সাবেক আইজিপি, সাবেক রাষ্টদূত ও সচিব নূর মোহাম্মদ জেলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়ে শুধু বললেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে এটি মহাসংকট।’ এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘একটি আসনে এবার একটি দলের সর্বোচ্চ ৫২ জন পর্যন্ত প্রার্থী হতে চেয়েছেন। সবাই মনে করছেন, দাঁড়িয়ে পড়লেই এমপি হওয়া যায়! এর কারণ নেতৃত্বশূন্যতা। সেই অর্থে নেতাদের মধ্যে সমন্বয় নেই, কোনো রাজনৈতিক তত্পরতাও নেই। যার ফলে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।’ 

কিশোরগঞ্জের প্রবীণ এক আইনজীবী নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কিশোরগঞ্জের রাজনীতির অবস্থা ভয়াবহ। এখানে নতুন নেতৃত্বের বিকাশকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। স্বাভাবিক রাজনীতিচর্চার বদলে পরিবারতন্ত্র প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে। মোটকথা রাজনীতি এখন ব্যবসা ছাড়া কিছু নয়। এ বিষয়টি এখানকার রাজনীতিবিদরা বুঝে গেছেন। ফলে পরিণতি যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গা দখল করেছে।’

কিশোরগঞ্জের আওয়ামী লীগদলীয় সাবেক এমপি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের মূল বাধা পারিবারিক ও ব্যক্তিতান্ত্রিক রাজনীতি। গত ২৭ বছরে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন হয়নি। নেতৃত্ব তৈরির ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকলে নেতা হবে কোত্থেকে!’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহজাহান জেলার রাজনীতিতে এখন নেতৃত্বশূন্যতা বিরাজ করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অসুস্থ। তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে এলে তাঁর হাতেই যাবে কিশোরগঞ্জের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। যদি তিনি ফিরে না আসেন তাহলে নেতৃত্ব কে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে।’ তাঁর আশাবাদ, ‘সময়ই তৈরি করবে সেই নেতৃত্ব।’ 

দেখা যাচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের পক্ষে যাঁরা মনোনয়নপত্র কিনে জমা দেন, তাঁদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও আমলা। ব্যতিক্রম কিছু থাকলেও তা নগণ্য।

সৈয়দ আশরাফ কিশোরগঞ্জ-১ (কিশোরগঞ্জ সদর-হোসেনপুর) আসনের বর্তমান এমপি ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী । জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আগ্রহে মনোনয়নপত্রে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওয়ান-ইলেভেন ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে তাঁর বিশেষ অবদান আছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত রেখে ক্ষমতায় আনয়নে সৈয়দ আশরাফের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। অনেকের অভিমত, প্রকৃত রাজনীতিবিদের মূল্যায়ন করতেই প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফের প্রতি এ সম্মান দেখিয়েছেন।  জেলায় আরো দুই রাষ্ট্রপতির পরিবারের দুই সদস্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। তাঁদের একজন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ছেলে, কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক। ইনি একজন প্রকৌশলী। অন্যজন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জননেতা মো. জিল্লুর রহমানের ছেলে, কিশোরগঞ্জ-৬ ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের এমপি নাজমুল হাসান পাপন। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি এবং ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তা।  

এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করে সফল হওয়া আরো একজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি হলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব নূর মোহাম্মদ। তিনি কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান এমপি মো. আফজাল হোসেন। তিনি একজন ব্যবসায়ী। এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ও মহাজোট সরকারের শরিক দল জাপার মুজিবুল হক চুন্নু কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসন থেকে লাঙল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।

অন্যদিকে বিএনপি জেলার ছয়টি আসনে যাঁদের মনোনয়ন দিয়েছে, তাঁদেরও বেশির ভাগই ব্যবসায়ী বা আমলা। তবে এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম আছে। কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনে বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দুইবারের সভাপতি ও একবারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিনি। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও তিনি কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের (মিঠামইন ও ইটনা) বাসিন্দা। জানা যায়, মো. ফজলুর রহমান কিশোরগঞ্জ-৪ (সাবেক কিশোরগঞ্জ-৫) আসনে বারবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে পাননি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি এমপি হয়েছিলেন। পরে আর সুযোগ না পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাঁধেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। তিনি ১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্র, ২০০১ সালে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ প্রার্থী হিসেবে এবং ২০০৮ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচন করেন। সাধারণের মধ্যে এমন আলোচনা রয়েছে যে আওয়ামী লীগ তাঁকে ‘সুযোগ’ দিলে জাতীয় নেতৃত্বে তিনি বিশেষ অবদান রাখতে পারতেন।

ফজলুর রহমান বাদে বিএনপি বাদবাকি যে সাতজনকে প্রার্থী করেছে তাঁদের সবাই নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। এঁদের মধ্যে প্রায় সবাই দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা