kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

এবারও বঞ্চিত ছাত্রনেতারা

রফিকুল ইসলাম   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এবারও বঞ্চিত ছাত্রনেতারা

অঙ্কন : মাসুম

ছাত্ররাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়ানো ‘বাঘা বাঘা’ নেতাদের অনেকেই এবারও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। দীর্ঘদিন ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পর নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র কিনলেও দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাননি তাঁরা। যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের সংখ্যাও খুব কম।

দেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আগামী নির্বাচনে খুব কমসংখ্যক ছাত্রনেতাকে সংসদ নির্বাচনের সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও অনেকেই দলের টিকিটে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য নির্বাচনী এলাকায় প্রচার চালিয়েছিলেন।

মনোনয়নপ্রত্যাশী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে কথা বলে কালের কণ্ঠ জানতে পেরেছে, এবারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য অপেক্ষাকৃত তরুণ ও স্বচ্ছ (অভিযোগহীন) ভাবমূর্তির প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে—রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এমন ঘোষণায় ছাত্রনেতারা আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেশির ভাগই মনোনয়ন পাননি।

রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠে আসেন তরুণরা। ছাত্ররাজনীতি শেষ করার পর তাঁরা চান জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হতে। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে তাঁদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। তবু বছরের পর বছর দলের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকছেন তাঁরা। এ ছাড়া সংসদে জনপ্রতিনিধি হয়ে আসার জন্য তাঁরা এলাকার ভোটারদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূলত, বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা তরুণদের সুযোগ না দেওয়া এবং পুরনোদের বদলে নতুনদের মনোনয়ন দিয়ে দল ভরসা করতে না পারার কারণে সুযোগ পাচ্ছেন না ছাত্রনেতারা। অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে দলের হাল ধরে থাকা পরিবারটিই রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। আবার উত্তারিধকার সূত্রেই কারো কারো খুব সহজেই জাতীয় রাজনীতিতে আসার সুযোগ হয়ে যায়। সে কারণে অন্যরা বা তরুণরা উঠে আসতে পারেন না।

জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে যথাক্রমে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের শীর্ষসাথানীয় নেতারা মনোনয়ন চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ থেকে অর্ধশতাধিক তরুণ ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং বিএনপি থেকেও এই সংখ্যক ছাত্রনেতা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন।

ছাত্রদল সূত্র নিশ্চিত করেছে, সংগঠনে যাঁরা দলীয় মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন, তাঁরা মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি প্রতিটি আসনে দ্বৈত প্রার্থী দিয়েছিল। কোনো কারণে একজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়ে গেলে যাতে অন্যজন প্রার্থী হতে পারেন সে বিবেচনা থেকেই দলটি এই কৌশল অবলম্বন করে।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, ছাত্রলীগের বয়সসীমা ২৭ বছরের মধ্যে বেঁধে দেওয়ায় তরুণ নেতাদের সংখ্যা অনেক বেশি। আগামী নির্বাচনে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে মনোনয়ন পেয়েছেন খুব কম সংখ্যকই।

নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ১৬ জন নেতা ছাত্রলীগের শীর্ষ পদে (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) নেতৃত্ব দিলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পেরেছেন মাত্র দুজন। একজন দিনাজপুর-৩ আসন থেকে ইকবালুর রহিম ও অন্যজন নারায়ণগঞ্জ-২ আসন থেকে নজরুল ইসলাম বাবু। এবারও তাঁরা মনোনয়ন পেয়েছেন। অবশ্য সংসদ নির্বাচনে এবার প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়েছেন ১৯৮৮-১৯৯২ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা অসীম কুমার উকিল (নেত্রকোনা-৩) এবং ১৯৯৪-১৯৯৮ সালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এ কে এম এনামুল হক শামীম (শরীয়তপুর-২)।

এ ছাড়া এবার ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ইকবাল হোসেন অপু দলের মনোনয়ন পেয়েছেন শরীয়তপুর-১ আসন থেকে। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সাইফুজ্জমান শেখর মাগুরা থেকে নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন।

জানা গেছে, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্না (১৯৯৪-৯৮) পিরোজপুর-২ আসনে, অজয় কর খোকন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন (২০০৬-১১) গাইবান্ধা-৫ আসনে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ। তিনি বাগেরহাট-৪ আসন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, প্রচারে ছিলেন, কিন্তু মনোনয়ন পাননি। এ ছাড়া সাবেক সভাপতি বাহাদুর ব্যাপারী শরীয়তপুর-৩ আসন, লিয়াকত শিকদার ফরিদপুর-১ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। চাঁদপুর-৩ নির্বাচনী এলাকা থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন সুজিত রায় নন্দী, কিন্তু পাননি। আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছিলেন, কিন্তু পাননি। পিরোজপুর-৩ আসনে মঠবাড়িয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুর রহমানও মনোনয়ন পাননি। ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মারুফা আক্তার পপি জামালপুর-৫ আসন, ২০০৭ সালে এক-এগারোর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শেখ সোহেল রানা টিপু ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ সাকিব বাদশাও মনোনয়ন চেয়ে পাননি। ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক নুরুল আলম পাঠান মিলন। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য। কিন্তু দলের মনোনয়ন পাননি। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের মধ্যে এবার সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান আনসারী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), সাবেক সহসম্পাদক মাজহারুল ইসলাম মানিক (পাবনা-৫), সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শামসুল কবির রাহাত (নেত্রকোনা-৩), সাবেক অর্থ সম্পাদক মোর্শেদুজ্জামান সেলিম (ময়মনসিংহ-৩), সাবেক আইন সম্পাদক শেখ ওবায়েদুর রহমান (বাগেরহাট-৩), সাবেক সহসভাপতি তারিক আল মামুন (কুষ্টিয়া-১) ও খন্দকার তারেক রহমান (ঢাকা-৫) প্রমুখ। তাঁরা ছাড়াও আরো অনেকেই দলের মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন; কিন্তু দল থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাননি।

সূত্র জানায়, এবার অর্ধশতাধিক ছাত্রদল নেতা দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। হামলা-মামলার পর আত্মগোপনে থাকলেও মনোনয়ন নিয়ে তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় প্রচারও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাজিব আহসান বরিশাল-৪ আসন এবং সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান নরসিংদী-৩ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। সহসভাপতি মামুনুর রশিদ নোয়াখালীর চাটখিল-সোনাইমুড়ী আসনে নির্বাচনী কাজ করেছেন। সাবেক সভাপতি শফিউল বারী বাবু লক্ষ্মীপুর-৪ আসন থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আবদুল কাদির ভূইয়া জুয়েল নরসিংদী-৪ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। ঢাকা-৮ আসনে হাবিব উন নবী খান সোহেল, পটুয়াখালী-৩ আসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন মনোনয়ন নিয়েছিলেন। এ ছাড়া সংগঠনের সাবেক সহসভাপতি হায়দার লেনিন, শহিদুল্লাহ এমরান ও শহীদুল ইসলাম বাবুল, তালুকদার খোকন, সালাউদ্দিন, আরিফা সুলতানা রুমা, আজমল হোসেন পাইলট, সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ, শেখ মোহাম্মদ শামীম, আমিরুজ্জমান খান শিমুল মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

গত ৭ ডিসেম্বর ঘোষিত বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় সাবেক ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে রয়েছেন শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি (লক্ষ্মীপুর-৩), খায়রুল কবীর খোকন (নরসিংদী-১), আমিরুল ইসলাম খান আলিম (সিরাজগঞ্জ-৫), আজিজুল বারী হেলাল (খুলনা-৪), সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (টাঙ্গাইল-২), সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (ঝিনাইদহ-৪), সাইফুল ইসলাম নিরব (ঢাকা-১২)।

সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্যে আরো যাঁরা বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফজলুল হক মিলন (কিশোরগঞ্জ-৪), নাজিম উদ্দিন আলম (ভোলা-৪), জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১)। সাবেক ছাত্রদল নেতা হাসান মামুন যে আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন সেখানে দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ থেকে সদ্য আসা গোলাম মাওলা রনিকে।

ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমেই তরুণদের মধ্যে দেশ গড়ার ভিত্তি তৈরি হয়। ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের কোনো দূরত্ব নেই। দল যখন যাঁকে মনে করে তাঁকেই মনোনয়ন দেয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘বয়োজ্যেষ্ঠরা দীর্ঘ সময় ধরেই নিজ এলাকা গুছিয়ে রাখেন। নতুনদের দিলে জিততে পারবেন কি না, সেই ভয়ে থাকে দল। কিন্তু এটা উচিত নয়। বর্তমান তরুণ ভোটাররা তরুণ নেতৃত্ব চায়। তরুণ নেতৃত্ব এলে দলেও গতি বাড়বে। বর্তমান প্রজন্মকেও সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা