kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

‘লাইসেন্স দেখান আংকেল’

পুলিশের গাড়িতে তল্লাশি হয়েছে
জরুরি গাড়ি শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পার করেছে

এস এম আজাদ   

২ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘লাইসেন্স দেখান আংকেল’

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গতকাল রাজধানীতে বাস থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখে। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর ব্যস্ততম ভিআইপি সড়কের ফার্মগেট এলাকা অতিক্রম করছিল এলাইক ট্রান্সপোর্টের একটি বাস। কয়েকজন শিক্ষার্থী গাড়িটির পথরোধ করে। তাদের একজন চালককে বলে, ‘আংকেল, লাইসেন্স দেখান।’ চালক তখন বলেন, ‘লাইসেন্স আছে বাবা।’ শিক্ষার্থীদের অন্য দুজন বলে, ‘থাকলে দেখান।’ চালক তখন কাগজপত্র বের করে দেন। সেই কাগজ দেখে একজন বলে, ‘আপনার গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট কোথায়?’ চালক তখন নিচু গলায় বলেন, ‘আছে। আনি নাই।’ তখন সমস্বরে শিক্ষার্থীরা বলে ওঠে, ‘কাগজ নেই। এই গাড়ি যাবে না।’

গতকাল বুধবার সকালে ফার্মগেট এলাকায় তেজগাঁও কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ ও বিএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থীরা এভাবেই কাগজ যাচাই করে কয়েকটি বাস আটকে দেয়। সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে তারা তিনটি বাস আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। এর মধ্যে একটি বাসের চালকের লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ এবং একটির চালক হালকা যানবাহনের লাইসেন্স নিয়ে চালাচ্ছিলেন বড় বাস। শিক্ষার্থীরা বাসগুলোকে যখন আটক করে, তখন মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছিল।

শুধু ফার্মগেটে নয়, নগরজুড়ে এভাবেই বাস, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের চালকদের লাইসেন্স যাচাই করেছে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা। দুপুরে সড়ক থেকে বাস উধাও হয়ে গেলে ব্যক্তিগত গাড়িচালকরা পড়ে শিক্ষার্থীদের তল্লাশির মুখে। কারো কাগজপত্র ঠিক না থাকলে তার গাড়ি আটকে দেয় তারা। অনিয়মকারীদের কাউকেই ছাড় দেয়নি তারা। তাদের জেরার মুখে পড়েন পুলিশ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। শিক্ষার্থীরা অনেকের গাড়ির চাবি নিয়ে যায়। গতকাল ড্রাইভিং লাইসেন্স সামনে ধরে এবং যাতায়াতের কারণ জানিয়ে পথ চলতে হয়েছে চালকদের। বিস্ময় সৃষ্টি করে এসব ঘটনা। শিক্ষার্থীদের এই ‘আইনের লোক’ হয়ে ওঠাকে ইতিবাচক চোখেই দেখেছে অনেকে। তারা বলছে, পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে বা ম্যানেজ করে অন্যায়ভাবে রাস্তায় গাড়ি চালানো হচ্ছে। শিশুদের এই তল্লাশি দৃষ্টান্ত হতে পারে। তারা সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সড়কে ছোট থেকে বড় পর্যন্ত কত ধরনের অনিয়ম আছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা সড়কের নিরাপত্তা আনার দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে। এই নিরাপত্তার প্রয়োজনেই বৈধভাবে গাড়ি চালাতে হবে। এই চর্চা সবার মধ্যে তৈরি করার বিষয়টি দেখানোর জন্যই তারা সব ধরনের যানবাহনের লাইসেন্স তল্লাশি শুরু করেছে।

রাজধানীতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা শুধু রাস্তা অবরোধ করেই রাখেনি। তারা রাস্তায় চলাচল করা অসুস্থ রোগীদের রিকশাও হাসপাতালে যেতে সাহায্য করেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথমে ফার্মগেটে তেজগাঁও কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ ও বিএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থীরা বাসচালকদের লাইসেন্স যাচাই শুরু করে। এরপর সড়কে বাস কমে গেলে তারা ব্যক্তিগত গাড়িতে একইভাবে তল্লাশি শুরু করে। শিক্ষার্থীরা কারওয়ান বাজার হয়ে শাহবাগ ও সায়েন্স ল্যাব এলাকায় পথে পথে তল্লাশি করতে থাকে। পুলিশের সামনেই তারা যানবাহন থামিয়ে চালকদের কাছে লাইসেন্স দেখতে চায়। লাইসেন্স দেখাতে না পারলে চালকদের কাছ থেকে চাবি রেখে দেওয়া হয়। ফলে গাড়ি পড়ে থাকে রাস্তায়। শিশু-কিশোরদের এমন শাস্তিতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে অনেকে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধানমণ্ডিতে হারুণ আই হসপিটালের সামনে পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিওএম) একটি গাড়িও শিক্ষার্থীদের লাইসেন্স পরীক্ষায় আটকে যায়। স্কুল ড্রেস পরা ও পিঠে স্কুলব্যাগ নিয়ে পুলিশের ওই পিকআপের পথ আগলে থাকা এক শিক্ষার্থী বলে, ‘লাইসেন্স দেখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পুলিশের গাড়ির চালক তা দেখাতে পারেননি। এ গাড়ি আমরা যেতে দেব না।’ গাড়ির চালক পুলিশ কনস্টেবল অরবিন্দ সমাদ্দার বলেন, ‘আমরা লাইসেন্স নিয়েই সরকারি চাকরি করি। কাজের সময় আমরা লাইসেন্স নিয়ে বের হই না। কাগজ অফিসে থাকে।’ আধাঘণ্টা পর পুলিশের একটি দল এসে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে ওই পিকআপটি ছাড়িয়ে নেয়।

দুপুর পৌনে ২টার দিকে শাহবাগ থেকে বাংলামোটরের দিকে যাচ্ছিল বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি। উল্টো পথে যাওয়ার কারণে মন্ত্রীর গাড়িও আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। তখন তোফায়েল আহমেদ গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন এবং নিহত দুই শিক্ষার্থীর জন্য সমবেদনা জানান। শিক্ষার্থীরা মন্ত্রীকে বলে, তারা ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা বইতে পড়েছে। মন্ত্রীর কাছে তারা ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরে। মন্ত্রীর গাড়িবহর পরে ঘুরে চলে যায়। এ ব্যাপারে তোফায়েল আহমেদ পরে সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীরা তাঁর পথ আটকে দেয়নি। তিনি নিজেই গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।  দুপুরে শাহবাগের দিক থেকে উত্তর দিকে আসা স্বাধীন পরিবহনের একটি বাস কাওরান বাজার সিগন্যালে থামায় সাদা ইউনিফর্ম পরা কিছু ছাত্র। চালকের কোনো লাইসেন্স না থাকায় ছাত্ররা যাত্রীদের বলে, ‘আপনারা নেমে যান, আমরা গাড়ির কিছু করব না। এই গাড়ি নিরাপদ না।’ এরপর গাড়িটি রাস্তার পাশে পড়ে থাকে। দুপুরে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জড়ো হওয়া নটর ডেম কলেজ ও মতিঝিল আইডিয়ালের শিক্ষার্থীরাও একইভাবে লাইসেন্স যাচাই করছিল। নটর ডেমের শিক্ষার্থী মিশু বলে, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছি। কোনো গাড়ি ভাঙচুর করছি না। আমরা সড়কের সব হত্যার বিচার চাই। যেসব গাড়ির লাইসেন্স নেই, সেগুলো সড়কে নিরাপদ না হওয়ায় চলতে দেওয়া হচ্ছে না।’

দুপুর ১২টার দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে একটি মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে নেয় কয়েকজন শিক্ষার্থী। জানতে চাইলে এর চালক রাহাত হাসান বলেন, ‘আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স এখনো করা হয়নি। বাচ্চারা লজ্জা দিল। লাইসেন্স করে ফেলব।’ তিনি আরো বলেন, ‘এটা তো আসলে আইনের লোকের কাজ। ওরা তো করে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।’ পৌনে ১টার দিকে বনানী ফ্লাইওভারের নিচে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে আটকে দেয় ছাত্ররা। যাচাই করে তারা বলে, ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদই নেই। শেষে যাত্রীদের অনুরোধে ছেড়ে দেওয়া হয়নি অটোরিকশাটি। সেখানে আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চালকের পাশে বসে ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্যকে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদর্শন করতে দেখা গেল। ওই রাস্তায় পুলিশের সদস্য, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ডাইভিং লাইসেন্স দেখিয়েই রাস্তা পার হতে হয়েছে।   

নিজেরাই পার করে দিচ্ছিলেন গাড়ি : সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী, হজযাত্রী, নারী, শিশুসহ জরুরি কাজে যাওয়া ব্যক্তিগত গাড়িগুলো নিজেরাই পাহারা দিয়ে এগিয়ে দেয় ছাত্ররা। সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অন্তত ২০টি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্স ও ১২ থেকে ১৫টি প্রাইভেট কার, সিএনজি এবং শতাধিক রিকশা ছেড়ে দেয় তারা। একইভাবে বিমানবন্দর সড়কের কাকলী ও বনানী ফ্লাইওভারের নিচে তারা গাড়ি পার করেছে। সেখানে রামিম, তাসবিদ ও মাহিন নামে তিন শিক্ষার্থী বলে, আমরা হজের যাত্রী, রোগী, বৃদ্ধ, নারী, শিশুসহ যাদের জরুরি প্রয়োজন সেসব গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছি। অন্য কোনো শিক্ষার্থী যেন বাধা না দেয় সে জন্য গাড়ির সঙ্গে এক-দুজন ছাত্র থেকে নিরাপদে পার করে দেওয়া হচ্ছে।

‘এক লাইনে চলেন মামা’ : ধানমণ্ডির সায়েন্স ল্যাব এলাকায় শিক্ষার্থীরা রিকশাচালকদের উদ্দেশে বলে, এক লাইনে চলেন মামা, এক লাইনে! মুহূর্তেই এলাকার চিত্র পাল্টে যায়। সব রিকশাচালক রাস্তার দুই পাশে এক লাইনে চলে যায়। গতকাল বিকেলে সুশৃঙ্খলভাবে চলা রিকশার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। একটি ছবি শেয়ার করে গণমাধ্যমকর্মী আনিস আলমগীর লিখেছেন, ‘পোলাপাইন ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব নিয়েছে। ধানমণ্ডি হয়ে নিউ মার্কেট যাচ্ছি।’

মন্তব্য