kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

সরেজমিন শাহবাগ ফুট ওভারব্রিজ

ব্যবহারে অনীহা তিন-চতুর্থাংশ পথচারীর

রফিকুল ইসলাম   

২ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গাড়ি চলাচলরত অবস্থায় মধ্যবয়সী নারী এক শিশু কোলে আরেক শিশুর হাত ধরে রাস্তা পার হতে শুরু করলেন। এ অবস্থায় চলন্ত গাড়িগুলো একে একে থেমে গেল। পরে দুই বাচ্চা নিয়ে তিনি দৌড়ে রাস্তা পার হলেন। জাতীয় জাদুঘরের পাশ থেকে রাস্তার ওপাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের দিকে পার হলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে গোটাদশেক মানুষও একই ভাবে পার হলেন। গত শনিবার দুপুর ১২টার দিকে শাহবাগ মোড়ের দৃশ্য এটি।

এভাবে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, এখান দিয়ে দ্রুত আসা যায়। পাশেই তো ফুটওভার ব্রিজ আছে, সেখান দিয়ে না আসার কারণ জানতে চাইলে বলেন, ব্রিজে উঠতে সময় লাগে, ওটাও ঝামেলার। কিছুদূর ঘুরে আসতে হয়। যদি দুর্ঘটনা ঘটে যেত? জবাবে বলেন, ‘কী আর করা, এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’

শত শত মানুষ প্রতিদিন এমন ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে রাজধানীর ব্যস্ততম শাহবাগ মোড়। মোড়টির চারপাশের ট্রাফিক পুলিশ এসব দেখেও দেখে না। আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও কেউ ব্যবহার করছে না। অন্যদিকে জেব্রা ক্রসিং থাকলেও মানুষের পারাপারে ট্রাফিক পুলিশ সহযোগিতা করে না।

শাহবাগে চারটি রাস্তা মিলেছে একসঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাহবাগ, মৎস্যভবন থেকে শাহবাগ, কাঁটাবন থেকে শাহবাগ আর বাংলামোটর থেকে শাহবাগ। এ মোড়ের আশপাশে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস থাকায় মানুষের যাতায়াতও বেশি। আর ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা পারাপারে তিন দিকেই রয়েছে ফুটওভার ব্রিজ। কাঁটাবন থেকে মৎস্যভবন রোডে দুটি। একটি বিএসএমএমইউ এবং জাতীয় জাদুঘরসংলগ্ন আর অন্যটি বারডেম হাসপাতাল ও জিয়া শিশু পার্কসংলগ্ন। তৃতীয়টি বাংলামোটর থেকে শাহবাগ রোডে বিএসএমএমইউ এবং বারডেম হাসপাতালকে সংযুক্ত করেছে।

সরেজমিনে কালের কণ্ঠের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও এর ওপর দিয়ে মানুষের যাতায়াত খুবই কম। ব্রিজ পার হয়ে রাস্তার ওপারে যাওয়ার চেয়ে ঝুঁকি নিয়েই পার হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সবাই। অথচ একটু হেঁটে ওভারব্রিজ হয়ে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই রাস্তা পার হওয়া যায়। শনিবার সকাল ১১টা থেকে তিনটি ওভারব্রিজ এক ঘণ্টা করে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রায় প্রতি চারজনের একজন ওভারব্রিজ হয়ে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে যাচ্ছে। আর তিনজনই চলন্ত গাড়ি কিংবা গাড়ির চাপ কম হলে মোড় দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ মানুষই ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করছে না। অথচ নিরাপদে রাস্তা পারাপারে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ওভারব্রিজ বানানো হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তিনটি ওভারব্রিজের মধ্যে দুই হাসপাতাল সংযোগকারী ব্রিজে মানুষের যাতায়াত বেশি। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, ওভারব্রিজে না উঠে নিচ দিয়ে রাস্তা পার হতে চাইলে ৫০ গজ ঘুরে যেতে হয়। কাজেই ব্রিজ দিয়েই অনেকে পার হয়। অন্য দুটি ব্রিজের মধ্যে জাদুঘর থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পাশেরটিতে মানুষের যাতায়াত বেশি আর বারডেম থেকে জিয়া শিশু পার্কের পাশের ব্রিজে মানুষের পদচারণ একেবারেই কম। প্রায় সময়ই হকার কিংবা ছিন্নমূল মানুষের দখলে থাকে এটি।

শাহবাগ থানা সূত্র জানায়, গাড়ি চলাচলরত অবস্থায় রাস্তা পার হতে গেলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গত বছর চলন্ত গাড়ির নিচে পড়ে কয়েকজন মারাও গেছে। আহত হয়েছে অনেকে। তবে হতাহতের সংখ্যাটি জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কেউ। ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার না হওয়ার ব্যাপারে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা পঞ্চাশোর্ধ্ব রহিম শেখ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজটা একটু দূরে। এই ব্রিজে উঠতে গেলে অনেকটা হাঁটতে হয়। এরপর সেটি পার হলে মোড়ে আসতে আবারও হাঁটতে হয়। এ কারণে শর্টকাটে নিচ দিয়েই পার হই।’

ঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চলন্ত গাড়ির মধ্য দিয়ে তো চলি না। গাড়ি না থাকলে পার হই। আর ট্রাফিক পুলিশও তো পার হওয়ার সুযোগ দেয় না। এক পাশ বন্ধ করে অন্য পাশ চালু করে। দুই পাশে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও পার হওয়ার সুযোগ দেয় না।’

মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করা সেলিম নামের একজন বলেন, ‘এই মোড়ে গাড়ির চাপ সব সময়ই বেশি থাকে। এ রাস্তায় ভিআইপি চলাচলও বেশি। যে জন্য দম ফেলার সময়ও নেই। প্রায় সময়ই দেখা যায়, চলন্ত গাড়ির মধ্য দিয়েই মানুষ চলতে শুরু করে। এ কারণে দুর্ঘটনাও ঘটে। তবুও মানুষ ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করছে না। সময় বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে মানুষ।’

মন্তব্য