kalerkantho

রবিবার। ১৮ আগস্ট ২০১৯। ৩ ভাদ্র ১৪২৬। ১৬ জিলহজ ১৪৪০

যাত্রা আরামদায়ক হলে বেশি ভাড়া সমস্যা না

শেখ শাফায়াত হোসেন   

২ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটের একটু দক্ষিণে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সাইফুল ইসলাম। সকাল ৮টা। সাইফুল যাবেন মতিঝিলে, এক ব্রোকারেজ হাউজে। ৮টা ৫ মিনিট বাজতেই রূপা রঙ্গের একটি বাস এসে দাঁড়ালো ফুটপাত ঘেষে। আগে আসা ১০-১২ জন যাত্রীর ওঠার পর সাইফুলেরও সুযোগ হলো। বাসের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে টিকেটের একটি অংশ ছিড়ে রাখলেন টিকিট চেকার।

বাসের ভেতরটা একেবারেই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। কোনো যাত্রীই বাসের রড ধরে দাঁড়িয়ে নেই। সিটগুলোর কোথায়ও ছেড়া বা ভাঙ্গা নেই। হাতল আছে প্রতিটি সিটের। এবার সিটে বসলেন সাইফুল। যথেষ্ট আরামদায়ক সিট। পাশের যাত্রী এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তখনও পরিচয় হয়নি সাইফুলের। আলাপচারিতায় জানা গেল নিয়মিত ওই বাসেই যাতায়ত করেন ব্রোকারেজ হাউজের ওই কর্মকর্তা। আগে মতিঝিল যেতে দুইবার বাস পাল্টাতে হতো। এখন ‘গ্রিন ঢাকা’ নামের এই বাস চালু হওয়ায় একবারেই মতিঝিল যেতে পারেন তিনি।

বাসটি শীততাপনিয়ন্ত্রত। বাসের চালক ও তার সহযোগীর গায়ে হাতাবিহীন ওভারকোটে লেখা ‘গ্রিন ঢাকা’। এই আন্তনগর বাসটি যাত্রীসেবায় নামিয়েছে নিটল মটরস লি.।

সাইফুল বলছিলেন, আগে বসুন্ধরা এলাকা থেকে মতিঝিল যেতে হলে, হয় কমলাপুর নামতে হতো, অথবা পল্টন বা গুলিস্তানে। বাসগুলোও খুব একটা ভালোও ছিলো না। তবে কমলাপুর হয়ে ‘রাইদা পরিবহন’ যেতো, ওই বাসগুলো তুলনামূলক ভালো ছিলো। গুলিস্তানগামী ‘স্পেশাল সুপ্রভাত’ সিটিং সার্ভিস চালু করলেও বাসের এবং সিটের অবস্থা ছিলো করুণ। ভালো বাস না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে অফিসযাত্রীরা এই বাসগুলোতেই চড়তে বাধ্য হয়েছেন। ভেঙ্গে ভেঙ্গে গিয়েছেন মতিঝিল। ভাড়া লেগেছে বেশি। ধকলও পোহাতে হয়েছে।

এখন কুড়িল বা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এসিবাসে ৬০ টাকা ভাড়া দিয়েও যাত্রীরা যাচ্ছে। উত্তরা থেকে রওনা দিলে ভাড়া পড়বে ১১০ টাকা। সাধারণ বাসেরতুলনায় এই ভাড়া কয়েক গুণ বেশি হলেও যাত্রীদের আপত্তি নেই। বরং তারা এমন আরামদায়ক ও পরিচ্ছন্ন বাস পেয়ে খুশি। এক যাত্রী বলছিলেন, ‘কোনো মতে বাসে একবার উঠতে পারলেই কিন্তু নিশ্চিন্ত। মতিঝিল পর্যন্ত যেতে ঘণ্টাখানেক বা বড়জোর দেড় ঘণ্টা লাগবে। ধুলোবালি নেই। ঘামতে হচ্ছে না। মোবাইল ফোনে পত্রিকা পড়া যাচ্ছে। ফেসবুক, টুইটার যা খুশি ব্যবহার করেন। কোনো ভিকারী বা হকার নেই। চাইলে ঘুমও পড়তে পারেন।’

বাসের আরামদায়ক আসনে বসে এক বৃদ্ধকে দেথা গেল স্মাটফোন দেখে দেখে একটি ভাষা লেখা শেখার চেষ্টা করছেন মোবাইল হাঁটুর ওপর রেখে। ঠিক বোঝা গেলো না ভাষাটি কোন ভাষা। এর মধ্যে কয়েকটি স্টপেসে বাস থামলো। কয়েক জন যাত্রী নামলেন, কয়েক জন উঠলেন। কিছু সময় দুই জন যাত্রীকে সিট না পাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলেও কোনো আপত্তি করলো না। দাড়ানো এক যাত্রী বলেন, ‘এই বাসটি না পেলে অফিসে ‘লেট কামার’ হতাম। সামনের স্টপেসে কেউ নেমে গেলে বসে পড়বো’।

দেখতে দেখতে রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে আবুল হোটেলের মোড়ের কাছে চলে এসেছে বাস। এতক্ষণ বাস দ্রুত গতিতে চললেও এখন ধীরগতি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশ থেকে সাইফুল ইসলাম নামের ওই যাত্রী বললেন, ‘এই ফ্লাইওভারে ওঠার আগেই একটু জ্যাম বাধে। অনেক সময় প্রাইভেট গাড়িগুলো এলোমেলোভাবে রাস্তার ওপর পার্ক করার কারণে এই জ্যামটা হচ্ছে। এটা চাইলেই ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে। তাহলে অফিসযাত্রাটা আরো সুখকর হতো। কাজ করতেও আরো ভালো লাগতো।’

ঘড়িতে ৯টা ছুঁই ছুঁই। বাস এগেচ্ছে না। প্রায় আধাঘণ্টা সময় একরকম ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের রামপুরা পয়েন্ট থেকে বাস উঠতে শুরু করলো। পরক্ষণেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো যাত্রীসকল। সাইফুল বললেন, ‘আর টেনশন নেই। এখন মনে হবে আপনি বিমানে আছেন।’ সত্যিই ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে বিমানের গতিতে কাকরাইল কর্নফুলি গার্ডেন সিটির সামনে এসে নামলো বাস। ওখানেও একটি স্টপেস আছে। আরেক দফা যাত্রী ওঠানার পর কিছু ক্ষণের মধ্যেই বিজয়নগর দিয়ে পল্টন, গুলিস্তান, অতপর মতিঝিল শাপলা চত্তর।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৯.৪০ ঘণ্টা। সাইফুলসহ প্রায় সব যাত্রীই নেমে গেছেন। রাজধানীর বাণিজ্যিক ওই এলাকায় অসংখ্য ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বহুজাতিক বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপুর্ণ কার্যালয়। ১০টার মধ্যেই কর্মীদের অফিস শুরু হয়ে যাবে। বাসের শেষ যাত্রী হিসেবে শাপলা চত্তর নেমে গেলেন এই প্রতিবেদক। গত সপ্তাহের একটি কর্মদিবসের অফিস যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিবেদকের এই যাত্রাটি মূলত অফিসযাত্রার একটি খণ্ডচিত্র তুলে আনার প্রয়াস। প্রতিদিন অফিসের উদ্দেশ্যে ঢাকা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুঁটে চলেছেন হাজার হাজার চাকরিজীবী মানুষ। পর্যাপ্ত বাসের অভাবে ভিড়ের মধ্যে ঠাশাঠাশি করে, কখনো বাসের রড ধরে ঝুলে ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ করতে হচ্ছে তাদের। এদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তিদায়ক ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এরকম এসি বাস সেবার ফলে। সমস্যা হচ্ছে, বাসের সংখ্যা অপর্যাপ্ত এবং ভাড়া তুলনামূলক বেশি।

মন্তব্য