kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেই সড়কে আশার আলো

নওশাদ জামিল   

২ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজধানীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চার দিন ধরে চলছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও অবরোধ। সড়কে নিরাপত্তা ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবিতে তুমুল এই আন্দোলন গড়ে তুলেছে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এসব শিক্ষার্থীর পরনে ছিল বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের ইউনিফর্ম। যখন তাদের ক্লাসরুমে থাকার কথা, তখন তারা প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে ঢাকা কার্যত অচল, স্থবির। কোথাও শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে থামিয়ে দিয়েছে সড়কের সব ধরনের যান চলাচল। কোথাও তারা স্লোগান ধরেছে, ‘আমার ভাই কবরে/খুনি কেন বাইরে’। তাদের প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুনে লেখা : ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই।’

ক্রমেই এই আন্দোলনের ব্যাপ্তি বাড়ছে, সমর্থন বাড়ছে। গতকাল বুধবারও রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে চলেছে  অবরোধ-বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন শহরে। তাদের আন্দোলনে সমর্থন দিচ্ছে সড়কে ও যানবাহনে ভোগান্তির শিকার হয়েও সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। সমর্থন দিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও। ছাত্রদের আন্দোলনে ব্যাপক ভোগান্তি হলেও নানা শ্রেণির মানুষ এতে আশার আলো দেখছে। তারা বলছে, ছাত্রদের দাবি-দাওয়া আদায় হলে সড়কে ও গণপরিবহনে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরবে।

রাজধানীর কাকলী-বনানী মোড় অবরোধ করেছিল আশপাশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল ১১টা থেকে থেমে যায় গোটা রাজপথ। কাকলী মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ায় থেমে যায় চারদিকের যান চলাচল। দুপুরের কড়া রোদে দরদর করে ঘামছিলেন রাজধানীর বনানীর বাসিন্দা কাজী একরামুল হক। মহাখালী থেকে কাকলী মোড় হয়ে তিনি যাচ্ছিলেন বনানী। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে তো আন্দোলন ছাড়া কিছু হয় না। আর সেই আন্দোলন করতে হয় ছাত্রদেরই। ছাত্ররা নামলেই সরকারের টনক নড়ে। এ ছাড়া তো দাবি আদায় হয় না।’

ছাত্রদের আন্দোলনে বেশ ভোগান্তি হলেও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ঢাকা শহরে তো জান-মালের কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রতিটা সড়ক যেন জাহান্নামে যাওয়ার সিঁড়ি। রাস্তায় নামলে জান হাতে নিয়ে নামতে হয়। সড়কে এত বিশৃঙ্খলা, এত অনিয়ম তা মানা যায় না। ছাত্ররাই পারবে আন্দোলন করে বিশৃঙ্খলা দূর করতে।’

দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছে ছাত্রদের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-র শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ’৬৬-র ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন, নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতন আন্দোলনসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি ও আন্দোলন সফল করায় তৎকালীন ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা অপরিসীম। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্ররা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছে, তাদের আন্দোলনের ফলেই সড়কে শৃঙ্খলা আসবে বলে মনে করছে অনেকেই।

গত রবিবার বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সজীব, একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী মীমকে হত্যা করে বেপরোয়া বাসের চালক। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হয় ১৩ জন শিক্ষার্থী। এমন মর্মান্তিক ঘটনা মানতে না পেরে রাস্তায় নেমে আসে সহপাঠীরা। সহপাঠীর এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা শুরু করে আন্দোলন। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে গেছে পুরো রাজধানীতে।

গতকাল দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও অবরোধে অচল হয়ে পড়ে গোটা শহর। কড়া রোদ আর শ্রাবণের মুষলধারে বৃষ্টিতেও রাজপথ ছাড়েনি শিক্ষার্থীরা। দুপুরের পর কাকলী-বনানী মোড়, গুলশান লিংক রোড, মহাখালী মোড় ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি মোড়েই দাঁড়িয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী। বৃষ্টিতে ভিজে তারা স্লোগান দিচ্ছে। প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আরমান সাদিক বলেন, ‘রাজধানীসহ দেশের কোনো সড়কই নিরাপদ নয়। আমরা নিরাপদ সড়ক চাই। জীবনের নিরাপত্তা চাই। আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক।’

মহাখালী-গুলশান লিংক রোড অবরোধ করেছিল বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীরা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদিরা হোসাইনের হাতে লাল প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা ‘মানুষ মরে পথে পথে/ মন্ত্রী হাসে পদে বসে’। আদিরা হোসেন বলেন, ‘সারা দেশের গণপরিবহনে নৈরাজ্য চলছে। পথে মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। এভাবে দেশ চলতে পারে না।’

উত্তরা থেকে মতিঝিল যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী কামরুল হাসান। দীর্ঘক্ষণ ধরে পথ অবরোধ। অনেকক্ষণ কাকলী মোড়ে বসেছিলেন বাসে। পরে বাস থেকে নেমে হাঁটা ধরেন। অবরোধে যথেষ্ট ভোগান্তি হলেও তিনি সমর্থন করছেন এই আন্দোলনকে। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘ঢাকায় যারা চলাচল করে, তারা জানে, এ শহরের প্রতিটি সড়কই মৃত্যুফাঁদ। মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। ছাত্ররা শুধু শুধু তো আর পথে নামেনি! ছাত্ররাই পারে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে।’

একই কথা শোনা গেল অনেক যাত্রীর মুখে। ভুক্তভোগী যাত্রীরা বলেন, যত্রতত্র বাস থামানো, রাস্তার মাঝপথে গতি কমিয়ে চলন্ত বাসে যাত্রী ওঠানামা করানো, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, যাত্রী তোলার জন্য বাসে বাসে ভয়ংকর প্রতিযোগিতা, অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা ঢাকার গণপরিবহনের নিত্যদিনের চিত্র। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া বাস চালানো।

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আবদুল আজিজ বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ আছে চাঁদাবাজি নিয়ে। তাদের নাকের ডগায় চলছে ফিটনেসহীন গাড়ি। অসংখ্য চালক আছে, যাদের লাইসেন্স নেই। রুট পারমিট নেই। ট্রাফিক পুলিশ চাইলেই অনেক বিশৃঙ্খলা দূর করতে পারে।’

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, যত দিন দাবি আদায় না হবে, তত দিন অবরোধ চলবে। রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি সড়ক যেন নিরাপদ হয়, এর জন্য তারা আন্দোলনে নেমেছে। নিরাপদ সড়কের জন্য বিভিন্ন দাবি জানিয়ে তারা বলে, বেপরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে, এ বিষয়ে কড়া আইন করতে হবে। নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। প্রতিটি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে। বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না ইত্যাদি।

মন্তব্য