kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

ঢাকা বদলে দিতে পারে পরিবর্তিত পথনকশা

পার্থ সারথি দাস   

২ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঢাকা বদলে দিতে পারে পরিবর্তিত পথনকশা

যানজটের ঢাকাকে বদলে দিবে সংশোধিত পরিবহন পরিকল্পনা বা আরএসটিপি। অন্তত এমন স্বপ্ন নিয়েই বাস্তবায়ন চলছে পরিকল্পনার। দ্রুত এগোচ্ছে মেট্রো রেল নির্মাণের কাজ। সড়ক তৈরি হচ্ছে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-বিআরটিএর জন্যও।

রাজধানীর জন্য নেওয়া কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা-এসটিপি ২০২৪ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না বোঝার পর তা ২০১৪ সাল থেকে সংশোধন করা শুরু হয়। ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয় রিভাইজড এসটিপি তথা আরএসটিপি। এ সংশোধিত পরিবহন পরিকল্পনার প্রতিবেদন মতে, ২০১৫ সালে ঢাকা ও আশপাশে এক কোটি ৭০ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। ঢাকায় দৈনিক ট্রিপের পরিমাণ ছিল গড়ে প্রায় তিন কোটি। তার মধ্যে বাস ও মিনিবাসে ৪৭, রিকশায় ৩২, ব্যক্তিগত গাড়িতে ৯, সিএনজি অটোরিকশায় ৯ ও মোটরসাইকেলে ৩ শতাংশ ট্রিপ হয়। আরএসটিপির প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে রাজধানীতে গাড়ির দৈনিক ট্রিপ হবে চার কোটি ২৭ লাখ। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ ট্রিপই দেবে বাস। ২০৩৫ সালে বাসের ট্রিপ বেড়ে হবে পাঁচ কোটিরও বেশি। তবে মেট্রো রেল ও বিআরটি চালু হলে বাসের ট্রিপ হার কমে যাবে।

সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা-আরএসটিপির সুপারিশ অনুসারে, দ্রুত জনপরিবহনের কাঠামো গড়ে তোলার অংশ হিসেবে প্রথম ধাপেই থাকতে হবে মেট্রো রেল ও বিআরটি।

আরএসটিপির চূড়ান্ত পথনকশায় বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ৫৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। এই সময়ের মধ্যে রাজধানী ও আশপাশে পাঁচটি মেট্রো রেল, দুটি বিআরটি ও ছয়টি উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হবে। যানবাহন চাহিদার ৬৪ শতাংশ পূরণ করতে পারবে এসব মেট্রো রেল ও বিআরটি। ঢাকার চারপাশে তিনটি বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ করা হবে। মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাসের রুট সমন্বয় করা হবে।

বাসনির্ভর দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বলা হচ্ছে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। এ ব্যবস্থায় বাসের দ্রুত চলাচলের জন্য আলাদা লেন থাকে। প্রশস্ত লেনে বিশেষ ধরনের বাস চলাচল করে। যার মধ্যে থাকে জোড়া বাস। কলম্বিয়ার বোগোটা, পেরুর লিমা, ভারতের আহমেদাবাদ, চিলির সান্টিয়াগোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন নগরীতে বিআরটি সফল গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

পাঁচটি মেট্রো রেলের মধ্যে একটি উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্পের কাজ চলছে। সুপারিশ অনুসারে, দুটো রুটে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি সড়ক নির্মাণ করতে হবে। তার মধ্যে গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণের কাজ চলছে।

আরএসটিপির মূল সুপারিশগুলোর মধ্যে পাঁচটি মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) বা মেট্রো রেল পথ নির্মাণ করার কথা আছে। এ জন্য এক লাখ ৫৯ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার হবে। এমআরটি-১ গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে বিদ্যমান রেলপথ ধরে কমলাপুর হয়ে ঝিলমিল পর্যন্ত। এমআরটি-২ আশুলিয়া থেকে সাভার, গাবতলী, মিরপুর রোড হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবনের (নগর ভবন) সামনে দিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত। এটি ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এমআরটি-৪ কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। এটি ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। এমআরটি-৫ ভুলতা থেকে বাড্ডা, মিরপুর সড়ক, মিরপুর-১০, গাবতলী বাস টার্মিনাল, ধানমণ্ডি, বসুন্ধরা সিটি (পান্থপথ) হয়ে হাতিরঝিল লিংক রোড পর্যন্ত। এমআরটি-১, ২, ৪ ও ৬-কে সংযুক্ত করবে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ। এমআরটি-৬ হচ্ছে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত, যার কাজ শুরু হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার।

আরএসটিপিতে অভ্যন্তরীণ (ইনার), মধ্যবর্তী (মিডল) ও বহিস্থ (আউটার) নামের তিনটি চক্রাকার সড়ক (রিং রোড) এবং ইনার ও আউটার রিং রোডকে সংযুক্ত করার জন্য আটটি রেডিয়াল সড়ক নির্মাণ করতে বলা হয়েছে। পরিকল্পিত আট রেডিয়াল সড়ক হচ্ছে ঢাকা-জয়দেবপুর, ঢাকা-টঙ্গী-ঘোড়াশাল, ঢাকা-পূর্বাচল-ভুলতা, ঢাকা-কাঁচপুর-মেঘনা সেতু, ঢাকা-সাইনবোর্ড-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-ঝিলমিল-ইকুরিয়া, ঢাকা-আমিনবাজার-সাভার ও ঢাকা-আশুলিয়া-ডিইপিজেড।

তিনটি বৃত্তাকার সড়কের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সড়ক হবে ৭৩ কিলোমিটার, মধ্যবর্তী সড়ক ১০৮ কিলোমিটার ও বহিস্থ সড়ক হবে ১২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। এগুলো নির্মাণের জন্য ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা।

নির্মাণ করতে হবে ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে। এসবের মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেতু বিভাগ। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কাজের উদ্বোধন হয়েছে। অন্য চারটি হলো ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা- চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-সিলেট এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা-ময়মনসিংহ এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকার ভেতরে ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ের (পূর্ণ বা আংশিক) দৈর্ঘ্য হবে ১২৬ কিলোমিটার; ব্যয় হবে ৩১ হাজার ৪২ কোটি টাকা। সড়ক উন্নয়ন ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে চার পর্যায়ে ৯৬ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব বা টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। প্রধান টার্মিনাল হবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, মহাখালী বাস টার্মিনাল, যাত্রাবাড়ী বাস টার্মিনাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল, গাবতলী সার্কুলার ওয়াটারওয়ে স্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল।

পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার আগেই মিডল বা আউটার রিং রোডের দক্ষিণ অংশের (মুন্সীগঞ্জের বাউরভিটা থেকে নারায়ণগঞ্জের কাইকারটেক পর্যন্ত) নির্মাণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। মেট্রো রেল রুট-১ নির্মাণ শুরুর আগে বালু নদীর পূর্ব পার থেকে ঢাকা বাইপাসের পশ্চিম পারের মধ্যবর্তী অংশে সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন করতে বলা হয়েছে।

ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য জেলার যোগাযোগের উন্নয়নে ২৯০ কিলোমিটার প্রাথমিক সড়ক ও ৪৭১ কিলোমিটার দ্বিতীয় ধাপের সড়কের জন্য ব্যয় হবে যথাক্রমে ১০ হাজার ৯৮৪ কোটি ও ১৮ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা।

সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ৩১ আগস্ট নিজ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, রাজউক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার ২০ বছরের (২০১৫-২০৩৫) পরিকল্পনা সমন্বিত করে সংশোধিত এসটিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, পরিকল্পনা প্রণয়নের পর এক দশক ধরে সমন্বিত কর্মযজ্ঞ হয়নি। তাই পরিকল্পনা সংশোধন করতে হয়েছে। আরএসটিপির সুপারিশ সময়মতো বাস্তবায়ন করলে যানজট থেকে, বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

রাজধানীকে যানজটমুক্ত করতে ২০০৪ সালে প্রণীত হয় ২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি)। এসটিপির লক্ষ্য ছিল ঢাকা মহানগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কের উন্নয়ন, মহানগরীর প্রবেশ ও নির্গমন পয়েন্টগুলোতে যানজট নিরসন ও পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০০৬ সালে অনুমোদনের পরবর্তী তিন বছরে এসটিপির সুপারিশ বাস্তবায়নে তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পর্যায়ক্রমে প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির মধ্যেই গত প্রায় এক দশকে ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের এলাকার জনসংখ্যা ও আয়তন অনেক বেড়ে গেছে।

মন্তব্য