kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

বাস খাত সংস্কারে প্রাণ পাবে ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাস খাত সংস্কারে প্রাণ পাবে ঢাকা

বিশ্বে সবচেয়ে ঘনবসতির মহানগরী ঢাকা প্রাণ হারাচ্ছে পরিবহনে ব্যবস্থাপনা না থাকা ও শৃঙ্খলার অভাবে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, এমনকি মহাপরিকল্পনায় বাস খাত সংস্কারে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশও ঝুলে আছে। পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুনাফালোভী মালিক ও চালকদের হাত থেকে ঢাকাকে বাঁচাতে বাস খাত সংস্কার করতে হবে। এ জন্য একটি কর্তৃপক্ষও গঠন করা যায়।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা মহানগরী এখন মৃতপ্রায়। বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বাঁচিয়ে তোলার জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে উন্নত করে এগোনো সম্ভব হয়নি। সড়ক, নৌ ও রেলপথের মধ্যে সমন্বয় করে সময়ের উপযোগী পথ তৈরি করতে হবে। ঢাকামুখী জনসংখ্যা ও গাড়ি কমিয়ে এই সমন্বয় করে গণপরিবহন খাতে সংস্কার করতে হবে। কোনো রুটে অতিরিক্ত গাড়ি চলবে না। সব বাস কম্পানি সীমিত কম্পানির মাধ্যমে চলবে, রুট থাকবে কম। নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট রঙের বাস চলবে—এ জন্য এক যুগের বেশি সময় ধরে আমরা শুধু সুপারিশই করছি। যারা বাস্তবায়ন করবে তাদের সেদিকে মনোযোগ নেই। আমি বলব, ঢাকা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে আছে। কোনো রকমে বেঁচে থাকা ঢাকাকে বাঁচাতে হবে গণপরিবহনে সৃশৃঙ্খলাবস্থা এনে। ঢাকায় ঢাকা চাকা ও হাতিরঝিলে চক্রাকার বাস কম্পানির ভিত্তিতে সফলভাবে চলছে। কাজেই পুরো ঢাকায় সীমিত কম্পানিভিত্তিক বাস চলাচলের ব্যবস্থাটি চালু করা কঠিন নয়।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহযোগী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ঢাকায় ব্যস্ত সড়কে বাসের রেষারেষিতে প্রাণহানি বাড়ছে। এটা উদ্বেগজনক। যানজট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলার বড় কারণ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব। এ জন্য গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে হবে। সে জন্য বাস খাত সংস্কার করতে হবে। ঢাকা পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। আইন অমান্য করে রাস্তার ডান দিকে মোড় নেওয়ার জন্য বাসচালকরাও দায়ী। এ জন্যও দুর্ঘটনা ঘটছে। বড় প্রচেষ্টা হওয়া উচিত বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন করা। তাতে একসঙ্গে অনেক মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে। ফুটপাত বাড়তে হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদের মতে, ঢাকায় দোতলা বাস বাড়াতে হবে। উন্নত ট্রাফিক সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ই-টিকেটিং ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। শৃঙ্খলা আনতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কেননা বিদেশের বিভিন্ন শহরে গাড়িচালকদের জরিমানা করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে। গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণেও আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা দরকার।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঢাকার রাস্তায় বাস মালিক ও চালকের সন্ত্রাস চলছে। তার জন্য পুলিশও দায়ী। একটি সিন্ডিকেট আছে, তারা চাঁদাবাজি করছে। রাস্তায় মানুষ মরছে তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কোনো সংস্থাই, কোনো মন্ত্রণালয়ই দায়িত্ব নিচ্ছে না। ঢাকা তাই মগের মুল্লুক। এ মুহূর্তে ঢাকায় গণপরিবহন বাড়াতে হবে। ঢাকায় দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালাতে পারছি। কিন্তু সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কোনো অবস্থায়ই পাঁচ-সাত কিলোমিটারের বেশি গাড়ির গতি থাকছে না। ঢাকার গতি বাড়াতে হলেও শৃঙ্খলা আনতে হবে গণপরিবহনে।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার আনিসুর রহমান বলেন, ঢাকা বাঁচাতে পারে সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা। বাসে শৃঙ্খলার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। বাসে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সমস্যা দূর করতে হবে। বাসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ডিটিসিএর সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনায় আমাদের সমীক্ষার অভাব নেই। ২০০৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমরা বেশ কয়েকটি সমীক্ষা করেছি। বাস চলাচলে বিশৃঙ্খলার কারণে ঢাকা আজকে বসবাসের অযোগ্য, প্রাণ যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। আমরা পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার অনুসারে, গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলছি না। এটার নিয়ন্ত্রক কোনো বডিও নেই। এ জন্য একটি কর্তৃপক্ষও গঠন করা যায়।

ঢাকায় পরিবহনে অরাজকতা বাড়ছে। ভবিষ্যতে মেট্রো রেল ও বিআরটি চালুর পরও বাসের চাহিদা থাকবে। বিভিন্ন সুবিধার বাস বাড়াতে হবে। ঢাকায় বাসগুলো যেখানে সেখানে রাখা হচ্ছে। প্রতিদিন সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার বাস আন্ত জেলা থেকে ঢাকায় ঢুকছে। আমরা বাস খাত সংস্কারের যে প্রকল্প হাতে নিয়েছি তাতে এই মহানগরী রক্ষা পাবে অরাজকতা থেকে, যানজট থেকে।

মন্তব্য