kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

আন্দোলনকারীদের পিষে পালাল পিকআপ

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আন্দোলনকারীদের পিষে পালাল পিকআপ

ঢাকার শনির আখড়ায় গতকাল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের চাপা দিয়ে পালিয়ে যায় পিকআপটি

‘বাসা থেকে বের হয়ে এক বন্ধুকে ফোন দেই। এরপর কলেজের দিকে যাচ্ছিলাম। যাত্রাবাড়ী শনির আখড়া এলাকায় আসতেই সামনে দেখি ছাত্ররা একটি পিকআপ দাঁড় করিয়ে কথা বলছে। কাছে গিয়ে দেখি পিকআপের চালকের সঙ্গে ছাত্রদের তর্কাতর্কি হচ্ছে। ছাত্ররা পিকআপটির চালকের কাছে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চায়। কিন্তু চালক খেপে গিয়ে ছাত্রদের গালাগাল করতে থাকে। তখন আমি পিকআপের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ চালক পিকআপ চালিয়ে দেয় আমার ওপর দিয়ে। হত্যার চেষ্টা চালায় আমাকে। আমি মুহূর্তের মধ্যে সরে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনি। পিকআপটি আমার বাঁ পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। আমি জ্ঞান হারাই। পরে দেখি আমি হাসপাতালে।’ এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দেয় নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের ছাত্র ফয়সাল মাহমুদ।

আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর দিয়ে পিকআপ চালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আহত এই কলেজছাত্রকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় প্রো-অ্যাকটিভ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত রাত পৌনে ১০টায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন, সে বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

গতকাল বিকেলে সরেজমিনে প্রো-অ্যাকটিভ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ফয়সাল মাহমুদের বাঁ হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ব্যান্ডেজে মোড়ানো। তার মুখ ও কোমরেও আঘাত লেগেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অপাতত সে আশঙ্কামুক্ত। বেশি আঘাত লেগেছে তার বাঁ পা ও কোমরে। তবে দীর্ঘ চিকিৎসায় সেটা সেরে যাবে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক ডা. সালাউদ্দিন ভুইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ফয়সালের অবস্থা শঙ্কামুক্ত। ডা. এ টি এম বাহার উদ্দিন ও এহতাশামুল হকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন সে।

ডা. বাহার উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ফয়সালের বাঁ পা, কোমরের জোড়া ও ঠোঁটে আঘাত লেগেছে। তাকে ১২টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আঘাতের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, শরীরের ওপর দিয়ে পিকআপটি যায়নি। পাশ থেকে আঘাত লেগেছে।

ফয়সালের চারপাশে স্বজন আর হাসপাতালের কর্মীরা ভিড় করে আছে। তার বাবা শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকালে কলেজে যাওয়ার কথা বলে রায়েরবাগের বাসা থেকে বের হয় ফয়সাল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জানতে পারি সে পিকআপের নিচে পড়েছে। তখন আমি মতিঝিলে ছিলাম। ওর মামা তাহের আমাকে ফোন করে বলে ফয়সাল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছে। তখন ছেলেকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলি। কিন্তু রাস্তা বন্ধ আর যানবাহন কম থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। পরে ছেলেকে সাইনবোর্ড এলাকার এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’

অশ্রুসিক্ত মা কাকলী বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকালে কলেজে যাওয়ার কথা বলে পোলা আমার বাইর হইছিল। এরপর খবর পাই হাসপাতালে। আমার পোলারে খোদায় বাঁচায়ে রাখছে, শুকরিয়া।’

গত রবিবার রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকায় বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস চাপা দিয়ে হত্যা করে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে। এ ঘটনায় গতকালও রাজধানীতে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন দাবি জানায়। চার দিন ধরে বিক্ষোভ করে আসা শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ করার। তারা যানবাহনের চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষাও করছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় দনিয়া কলেজের সামনের সড়কে একটি পিকআপের চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখার সময় চালক শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। এ ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করে দেখার জন্য পিকআপটিকে থামানোর চেষ্টা করে। পিকআপটি থামানোর চেষ্টায় পাদানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা যায় এক শিক্ষার্থীকে। আরেক শিক্ষার্থী লাঠি নিয়ে পিকআপটির সামনে মাঝ বরাবর এসে দাঁড়িয়ে সেটি থামাতে চায়। কিন্তু পিকআপটি না থামিয়ে চলে যায় শিক্ষার্থীর ওপর দিয়ে। পরে সেই ছাত্রের মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সাব্বির ঘটনাস্থল থেকে গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, সকাল ৯টা থেকেই শনির আখড়ার দনিয়া কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তা আটকে বিক্ষোভের পাশাপাশি যানবাহনের চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করছিল। পিকআপ ভ্যানটি আসার আগেও একটি বাসের চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করে ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। এরপর পিকআপটি আসে এবং চালককে থামতে বললেও চালক চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। উত্তেজিত ছাত্ররা তাকে আটকে পুলিশের কাছে নিয়ে যেতে চায়। তখন চালক শিক্ষার্থীদের ওপর দিয়ে পিকআপ চালিয়ে পালিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী আবু হানিফ বলেন, ‘আমি রাস্তায় একটি মাদরাসার টাকা উঠাই। প্রতিদিনের মতো সকাল থেকে এই সড়কেই ছিলাম। এ সময় ছাত্ররা রাস্তায় ছিল। তাদের সঙ্গে পিকআপের চালকের তর্কাতর্কি হলে ওই চালক ছেলেটিকে চাপা দিয়ে পালায়। আমি নিজের চোখে দেখেছি।’

সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে জানা যায়, এলাকার আরো অনেকে এ দৃশ্য দেখেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ছাত্রকে চাপা দেওয়ার পর ঘটনাস্থলের অদূরে ডাব্লিউজেড সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড সার্ভিসিং স্টেশনের ভেতরে ঢোকে পিকআপের চালক। গাড়িটি সেখানেই দাঁড় করে রাখা হয়েছে, সামনের কাচ ভাঙা। স্টেশনে থাকা একটি বাসের চালকের সহকারী আবু হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পিকআপটা শনির আখড়া মোড়ে একটা পোলারে চাপা দিয়াই এইহানে আসে। এরপর চালক পিকআপটি রাইখাই দ্রুত চইলা যায়।’

আবু হানিফ বলেন, ‘এর কিছুক্ষণ পর দেহি ছাত্ররা আইয়া পিকআপটি ভাঙতাছে। তহন আমরা সইরা পড়ি।’

শনির আখড়ার এই ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ফরিদ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের খবর শুনেছি আমরা। পিকআপটি আটক করা যায়নি। চালককেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।’ রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মো. মাসুম বলেন, তার (ফয়সাল) শারীরিক পরীক্ষা চলছে। আরো পরীক্ষার প্রয়োজন আছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য