kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

ভরাট দখল দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ব্রহ্মপুত্র

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ ও মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

২৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ময়মনসিংহের বুকচিরে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদ দিন দিন ভরাট হয়ে শীর্ণকায় হয়ে পড়ছে। বর্ষা মৌসুমে নদে থইথই পানি থাকলেও অন্য সময় নদের অনেক স্থানে হাঁটুসমান পানিও থাকে না। ধু-ধু বালুচরে ছেয়ে যায় নদের দুই পার। অন্যদিকে নরসিংদীতে ব্রহ্মপুত্রের দুই পারে গড়ে ওঠা বসতবাড়ি, হাটবাজার, বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য এবং আবর্জনায় বর্তমানে নদটি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের ভেতর জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের কাছে যমুনার সঙ্গে সংযোগস্থল ভরাট হয়ে যাওয়াই মূলত ব্রহ্মপুত্রের এই মরণদশার জন্য দায়ী। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নদে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সবার আগে ওই সংযোগস্থলে খনন করতে হবে। তারপর খনন করতে হবে ভাটির দিকে পলি পড়ে যাওয়া নদের ভরাট অংশ।

একসময় ব্রহ্মপুত্র ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান নদ-নদীগুলোর একটি। এর বিস্তৃতি ও অববাহিকা তিব্বত, চীন, ভারত ও বাংলাদেশে বিদ্যমান। ব্রহ্মপুত্র নদ মানস সরোবর লেক ও কৈলাস পর্বতের মাঝস্থান থেকে উত্পত্তি। নদটি ভারতের ভবানীপুর হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাটের প্রায় ১২ কিলোমিটার উজানে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার হরিচণ্ডী এলাকায় হাতের বাঁ দিকে মোড় নিয়ে জামালপুর ও ময়মনসিংহের দিকে চলে এসেছে। এরপর এটি কিশোরগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব বাজারের কাছে মেঘনা নদীতে গিয়ে মিশেছে। এটিই এখন পুরনো ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত।

জামালপুর জেলা সদর হয়ে ময়মনসিংহ জেলার ভেতর দিয়ে এবং কিশোরগঞ্জ জেলার প্রান্ত ছুঁয়ে মেঘনায় পতিত হওয়া মূল স্রোতটির নাম হয়ে যায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। শীতের সময় ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালী রেল সেতু ও পাটগুদাম সড়ক সেতুর নিচে নদের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে চর ভেসে ওঠে। প্রতিবছরই জেগে ওঠা চরের বিস্তৃতি বাড়ছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলায় এবং পরে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ও আরো পরে ভৈরবের কাছাকাছি অংশে ব্রহ্মপুত্র প্রায় মরেই গেছে।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ফয়জুর রহমান ফকির কালের কণ্ঠ’কে বলেন, যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা পলি পড়ে আজ ভরাট। ভরাটের স্থানটির উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ ফুট। ভরাটের কারণেই অক্টোবর মাস থেকে মে পর্যন্ত যমুনা থেকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রে পানি প্রবাহ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ভরা বর্ষায় যমুনার পানির উচ্চতা যখন বাড়ে তখনই ওই ১৫ ফুট উঁচু স্থানটির ওপর দিয়ে পুরনো ব্রহ্মপুত্রে পানি আসে। ব্রহ্মপুত্র নদে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হলে সেই উৎসমুখেই প্রথমে খনন করতে হবে।

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ খননের বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। নদ খননে ইতিবাচক সিদ্ধান্তও আছে।

অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদকে ঘিরেই একসময় গড়ে ওঠে পাইকারি কাপড়ের বাজার নরসিংদীর শেখেরচর বাবুরহাট। কিন্তু সেই নদ দখল করে কালভার্ট তৈরি করে নদকে ড্রেনে পরিণত করেছে অবৈধ দখলদার ও ক্ষমতাবানরা। নদের দুই পারে গড়ে ওঠা বসতবাড়ি, হাটবাজার, বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য এবং আবর্জনায় বর্তমানে নদটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদের বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তূপ জমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পবর্জ্য আর আবর্জনার কারণে পানি কালো রং ধারণ করেছে। দূষিত পানির দুর্গন্ধ আশপাশের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অপরিকল্পিতভাবে কলকারখানা স্থাপন, দোকানপাট, কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনার কারণে ব্রহ্মপুত্র ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

মাধবদী পৌরসভার মেয়র মোশাররফ হোসেন মানিক বলেন, ‘নগরীর পরিবেশের ভারসাম্য ধরে রাখতে নদটি পুনঃখনন ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আশা করছি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নদের পৌরসভার অংশটুকু সুদৃশ্য লেকে পরিণত করতে পারব। ’

পরিবেশ অধিদপ্তরের নরসিংদী জেলা শাখার সহকারী পরিচালক আকতারুজ্জামান বলেন, ‘যেসব কারখানা নদে বর্জ্য ফেলছে আমরা সেগুলোর তালিকা করে এনফোর্সমেন্ট বিভাগে পাঠাচ্ছি। আর এ ব্যাপারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। ’



সাতদিনের সেরা