kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বঙ্গবন্ধু সবার সব বাঙালির

আবদুল মান্নান   

১৫ আগস্ট, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু সবার সব বাঙালির

পদ্মা-যমুনা-মেঘনা বিধৌত এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের এক নিভৃত পল্লী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ মুজিব নামের যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল, কালক্রমে সেই শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু, পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের জনক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। অনেকে বলে থাকেন, বঙ্গবন্ধু কেবলই আওয়ামী লীগের নেতা। আসলে কি তাই? নিজেকে কী ভাবতেন তিনি? ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেন, 'নেতা হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি, আমাদের মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, খাবার না পায়, যুবকরা যদি চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে আমাদের এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে। ' অর্থাৎ তিনি সব সময় নিজেকে সাধারণ মানুষের কাতারেই দেখতে চেয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়কে তিনি বলেছিলেন, সেই জনককেই একদল ঘাতক ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁরই নিজ বাড়িতে সপরিবারে হত্যা করেছে। বিদেশে থাকার কারণে তাঁর দুই কন্যা- শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঘাতকদের বুলেট থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। সমসাময়িক ইতিহাসে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কোনো নজির নেই। অনেকেই ভ্রান্তভাবে মনে করেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডটি শুধু একদল বিভ্রান্ত বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা আর কিছু ষড়যন্ত্রকারী ক্ষমতালিপ্সু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনীতিবিদদের কাজ। অনেকে এই হত্যাকাণ্ডের অনেক অসত্য ও বানোয়াট কারণের সঙ্গে জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে সম্পৃক্ত করেন ও বলেন, বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর চেয়ে রক্ষীবাহিনীকে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং তাদের জন্য প্রতিরক্ষা বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ করতেন। কেউ কেউ এমন কথাও বলেন, বঙ্গবন্ধু একসময় সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে দেবেন। বাস্তবে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধফেরত ওই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে, যাঁদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। আর রক্ষীবাহিনীর জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল প্রতিরক্ষা বাজেটের মাত্র ৯ শতাংশ। আর যুদ্ধফেরত এই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যদি বঙ্গবন্ধু জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন না করতেন, তাহলে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বেকারের সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেত এবং তাতে চরম সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারত। অন্যদিকে একই যুক্তিতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানফেরত সিভিল মিলিটারি বাঙালি সদস্যদেরও স্বাধীন বাংলাদেশের সিভিল প্রশাসনে ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে আত্তীকরণ করেছিলেন; যদিও এদের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বেচ্ছায় পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, এটি বঙ্গবন্ধুর একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই ছিল এই পাকিস্তান ফেরত গোষ্ঠী। কিন্তু বাংলার মানুষের ওপর তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। তবে ষড়যন্ত্র যে তখন থেকেই শুরু হয়েছিল, তা তিনি বুঝেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১৫ জানুয়ারির ভাষণে তার উল্লেখ পাওয়া যায়। দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে শুরুতেই তিনি বলেন, 'কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চালাচ্ছে। ' ভাষণে তিনি আরো বলেন, 'আমি কখনো প্রধানমন্ত্রী হতে চাইনি। আমি শুধু আমার জনগণের জন্য স্বাধীনতাকেই চেয়েছিলাম। শত্রুর মোকাবিলার জন্য আমি যে আহ্বান জানিয়েছিলাম বাংলাদেশের জনগণ তাতে পুরোপুরি সাড়া দিয়েছেন। আমি জানতাম আমার জনগণ এমনটিই করবে। ' বঙ্গবন্ধুর বড় দুর্বলতা ছিল তিনি সহজে বাঙালিকে বিশ্বাস করতেন এবং কোনো বাঙালি তাঁকে হত্যা করবেন- তা ছিল তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য। খুনিদের অন্যতম মেজর ডালিমের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ও জানামতে ডালিম সস্ত্রীক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার দুই দিন আগে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বেগম মুজিবের রান্না করা রাতের খাবারও খেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ জেনারেল জিয়াকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানতেন, তিনি একজন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসার ছিলেন। তাঁর স্থলে জেনারেল সফিউল্লাহকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান করাতে জিয়া অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিলেন; কিন্তু ধুরন্ধর চালাক জিয়া তা কাউকে বুঝতে দেননি। জেনারেল সফিউল্লাহ বিষয়টি বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধুকে কয়েকবার অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন জিয়াকে সেনাবাহিনী থেকে অবসর দিয়ে কোনো কূটনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক কোনো গুরুত্ব দেননি। প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু জিয়ার জন্যই সেনাবাহিনীতে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ পদটি সৃষ্টি করেছিলেন। ওই পদে তিনিই ছিলেন প্রথম ও শেষ কর্মকর্তা। এটি ছিল বেগম জিয়াকে জিয়ার ঘরে তোলার পুরস্কার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিয়া একাধিকবার বেগম জিয়াকে ভারতে নিয়ে যেতে লোক পাঠিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বেগম জিয়া তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকাটা নিরাপদ মনে করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে এ নিয়ে তাঁর স্বামীর সঙ্গে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হলে বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে তা নিরসন হয়। বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন তাঁর দুই নয়, তিন কন্যা। জিয়াকে ডেপুটি চিফ করলেও তিনি তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না; কারণ সেনাবাহিনীর ওপর তাঁর তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু জিয়ার এই নাখোশ হওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করেন। তিনি নিহত হওয়ার কয়েক মাস আগে জিয়ার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। ঠিক হয়েছিল তাঁকে হয় পূর্ব জার্মানি অথবা বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হবে। এতেও জিয়া তাঁর নিকটজনদের কাছে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। জিয়া যে একজন ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন, তা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর যখন একপর্যায়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হন, তখন তা তিনি উপলব্ধি করেছেন, যা তিনি তাঁর At Bangabhaban-Last Phase গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। বিচারপতি সায়েম লিখেছেন, জিয়া শেষের দিকে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন যে তিনি তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিলেন। জিয়ার এই চরিত্র বোঝা যায় যখন তিনি ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে পঠিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রথমে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তীকালে রাজনীতিবিদদের চাপে পড়ে তিনি তাঁর ঘোষণায় পরিবর্তন এনে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধ কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। জিয়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাঁর চাকরি ন্যস্ত করার বিষয়টিকে পুনর্বিবেচনা করানোর জন্য আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের হাতে-পায়ে ধরা শুরু করেন। এ ব্যাপারে তিনি তাঁর কোর্সমেট ও বন্ধু ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন স্টেশন কমান্ডার লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদের সহায়তা নেন। হামিদ প্রকৃত পরিস্থিতি না বুঝে জিয়াকে সহায়তা করার চেষ্টা করেন। জিয়া বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। জিয়া রাষ্ট্রপতিকে আশ্বস্ত করেন তাঁর প্রতি জিয়ার আনুগত্য প্রশ্নাতীত এবং বাকি জীবন তিনি একজন সৈনিক হিসেবেই কাটিয়ে দিতে চান। উদার হৃদয়ের মানুষ বঙ্গবন্ধু জিয়ার কথায় বিশ্বাস করেছিলেন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর চাকরি আবার সেনাবাহিনীতে বহাল করার নির্দেশ দেন। সেই জিয়ার সঙ্গে ১৫ আগস্টের ঘাতকদের অন্যতম কর্নেল রশিদ (অব.) বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেন মার্চ মাসে। জিয়া ঘাতকদের প্রতি তাঁর প্রত্যক্ষ সমর্থন জানান। শুধু বলেন, একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে তিনি এই কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না; তবে তাঁরা তাঁদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারেন। শেষতক জিয়াই বঙ্গবন্ধু হত্যার সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রতক্ষ্যভাবে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁদের অধিকাংশই সরাসরি পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে অথবা অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। জিয়াও একসময় এই সংস্থার হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। ১৫ আগস্টের আগে সে সময় ডিজিএফআইয়ে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেনাবাহিনীতে যে একটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তা নোট আকারে বঙ্গবন্ধুর কাছে গোপন নথি হিসেবে তাঁরা পাঠিয়েছিলেন। সেই নোট বঙ্গবন্ধুর হাতে এক রহস্যজনক কারণে পৌঁছায়নি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগের দিনগুলোতে তিনি পাকিস্তানফেরত ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মাশরুল হক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জামিল ছিলেন পাকিস্তানফেরত সামরিক কর্মকর্তা। তাঁরা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধু) ভিজিলেন্স টিমের প্রধান ডিআইজি এ বি এস সফদার একাত্তরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। রাষ্ট্রপতির তিনজন এডিসি ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোশাররফ ও লেফটেন্যান্ট গোলাম রাব্বানী- কেউই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা নন। তাঁরা সবাই পাকিস্তানফেরত। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন আবদুর রহিম, যিনি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্পেশাল ফোর্সের পরিচালক ছিলেন। এই ফোর্স গঠিত হয়েছিল রাজাকার, আলবদর, আল শামস ও শান্তি কমিটির সদস্যদের নিয়ে। ১৯৭৫ সালে পুলিশের আইজি তসলিম উদ্দিন একাত্তরে পাকিস্তান পুলিশের আইজি ছিলেন। সেনা গোয়েন্দা ডিজিএফআইয়ের প্রধান আবদুর রউফ পাকিস্তানফেরত সেনা কর্মকর্তা। এসবির প্রধান ই এ চৌধুরী একাত্তরে ঢাকা জেলার এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসআইয়ের প্রধান আবদুল হাকিম একাত্তরে নোয়াখালীর এসপির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এনএসআইয়ের তিনজন ডেপুটি ডিরেক্টর- এম এন হুদা, মুসা মিয়া চৌধুরী ও এ কে এম মোসলেমউদ্দিন, সবাই একাত্তরে পাকিস্তানের সেবা করেছেন। বিডিআরের প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান একজন পাকিস্তানফেরত সেনা কর্মকর্তা। সুতরাং এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের জাল বিছানোর কাজ অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।

হত্যাকারীদের কেউ কেউ সরাসরি পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৭৩ সালের প্রথমদিক থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি (পরে প্রধানমন্ত্রী) জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করার জন্য গোপনে বঙ্গবন্ধুবিরোধীদের অর্থ জোগান দেওয়া শুরু করেন। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (এম-এল) সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবদুল হক ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোকে উদ্দেশ করে লেখেন, 'আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী...গণবিচ্ছিন্ন পুতুল মুজিবের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য আপনার নিকট অর্থ, অস্ত্র ও বেতারযন্ত্রের জন্য আবেদন করছি। ' আবদুল হকের এই আবেদন ভুট্টো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং তার ওপর মন্তব্য করেন, 'এই সৎ ও কার্যকর ব্যক্তিটিকে প্রার্থিত সাহায্য দেওয়া হোক। ' বর্তমানে বাংলাদেশে আবদুল হকের মৃত্যু দিন ঘটা করে পালন করা হয়। ভুট্টো পুরো অপারেশন পরিচালনা করার জন্য আবদুল মালেক নামের তাঁর একান্ত আস্থাভাজন একজনকে দায়িত্ব অর্পণ করেন। মালেক ভুট্টোর এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মাওলানা কাউসার নিয়াজিকে নিয়ে আরব দেশগুলো সফর করেন। মার্কিন গবেষক স্টানলি উলপার্ট তাঁর Zulfi Bhutto of Pakistan গ্রন্থে এসব তথ্য সবিস্তারে বিবৃত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সিআইএর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি। এ প্রসঙ্গে কয়েক বছর আগে প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেঞ্জ লিফসুলজ ধারাবাহিকভাবে একটি জাতীয় দৈনিকে বর্ণনামূলক ফিচার লিখেছিলেন। লিফসুলজ দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে অধুনালুপ্ত ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর হয়ে সাংবাদিকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কাছ থেকে দেখেছেন। লিফসুলজ কর্নেল তাহের হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এলে এ বিষয়টি নিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছি। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন এবং আগামীতে তিনি আরো লেখার ইচ্ছা রাখেন। তিনি এ-ও বলেন, অসত্য তথ্য পরিবেশন করা একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাজ নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের সঙ্গে তাঁর (ফিলিপ চেরি) নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব (মন্ত্রী) হেনরি কিসিঞ্জার অনুমোদন দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে কিসিঞ্জার ঢাকা সফর করেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগের সপ্তাহে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার একাধিকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ৩২ নম্বরের বাড়িতে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে বানচাল করতে তাঁরা তৎপর ছিলেন। তাজউদ্দীনের বিচক্ষণতায় তা সফল হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কিসিঞ্জার তাঁর ব্যক্তিগত পরাজয় মনে করতেন। বঙ্গবন্ধু হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে দেখা করতে গেলে কিসিঞ্জার দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে অস্বীকৃতি জানান। কিসিঞ্জার বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বঙ্গবন্ধুর বিদায় চাইবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা যে ক্ষমতায় আছেন, তা-ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমন একটা সুখকর নয়, যা তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দিবালোকের মতো পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্রের অভিপ্রায়, বাংলাদেশ একটি জঙ্গি রাষ্ট্র হয়ে উঠুক; ফলে এই দেশে তারা গণতন্ত্র রপ্তানি করতে সক্ষম হবে, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে করেছে।

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, "বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে। শোষকদের আর বাংলাদেশে থাকতে দেওয়া হবে না। কোনো 'ভুঁড়িওয়ালা' এ দেশে সম্পদ লুটতে পারবে না। গরিব হবে এই রাষ্ট্র এবং এই সম্পদের মালিক; শোষকরা হবে না। এই রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ থাকবে না। এই রাষ্ট্রের মানুষ হবে বাঙালি। তাদের মূল মন্ত্র হবে 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। '

বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু বাংলা ও বাঙালির কল্যাণ কামনা করে গেছেন। নিজেকে এ দেশের সাধারণ মানুষের একজন মনে করেছেন। দলের শীর্ষ নেতা, দেশের প্রধান ব্যক্তি হয়েও তিনি ছিলেন সবার, সব বাঙালির কাছের মানুষ। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান 'জয় বাংলা' মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। বাঙালি জাতির জনক 'বঙ্গবন্ধু' ও তাঁর দেওয়া স্লোগান সংরক্ষণে ভূমিকা নেয় আওয়ামী লীগ। একটা কৃষ্ণ সময় তো এসেছিল এই দেশে, যখন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা, জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া অপরাধ হিসেবেই গণ্য হতো। সেই অন্ধকার কেটে গিয়ে উজ্জ্বলতায় উদ্ভাসিত আজকের বাংলাদেশ, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির জাতিসত্তার প্রতীক তিনি। বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা অমর নায়ক। বাঙালির হৃদয়ে তাঁর অধিষ্ঠান। সব ষড়যন্ত্রের জাল চিহ্ন করে বঙ্গবন্ধু আজ বাঙালির অগ্রযাত্রার পথ প্রদর্শক, প্রেরণার উৎস। বাংলা ও বাঙালিকে তিনি প্রাণের অধিক ভালোবেসেছিলেন। মানুষের ভালোবাসার টানেই নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ছেড়ে থেকেছেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে। সেখানেই ঘাতকের বুলেটে প্রাণ দিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর যারা মোশতাকের উপদেষ্টামণ্ডলী ও পরবর্তীকালে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন তাঁরা সবাই বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের আস্থাভাজন মানুষ ছিলেন। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত আস্থাভাজন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, যিনি যুক্তরাজ্য সফর করছিলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শুনে মন্তব্য করেন, 'মোশতাক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন। তিনি দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। ' আবু সাঈদ চৌধুরী মোশতাক মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। মোশতাক মন্তব্য করেছিলেন, 'যারা এই কাজটি করেছে তারা দেশপ্রেমিক সেনা সদস্য ও সূর্যসন্তান। ' মওলানা ভাসানী ও আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ দুজনই একসময় আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁদের পিতৃবৎ সম্মান করতেন। তাঁরা দুজনই মোশতাকের সাফল্যের জন্য দোয়া করেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আবদুল মালেক উকিল, জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। লন্ডন থেকে মন্তব্য করেছিলেন, 'ফেরাউনের পতন হয়েছে। দেশ একজন স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে। ' তাঁর ছেলে বর্তমানে সরকারের একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। কেউ কেউ হয়তো বন্দুকের নলের ডগায় মোশতাক মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছিলেন। নেননি চার জাতীয় নেতা। তাঁরা নির্ভয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন। নিজের জীবন দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, তাঁরা মৃত্যুঞ্জয়ী।

বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতা মহাকালের মহানায়ক। ঘাতকদের হাতে মৃত্যু ইতিহাসে তাঁদের অমর করে রেখেছে। আজকের এই দিনে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা