kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৯ নভেম্বর ২০২২ । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

যতনে থেকো কবি চৈত্রে বোশেখে

মাহমুদ শাওন

৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যতনে থেকো কবি চৈত্রে বোশেখে

ঢাকার শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিন ব্লক। এর ৬০৩ নম্বর কেবিনে দুই সপ্তাহ ধরে ভর্তি আছেন কবি হেলাল হাফিজ। চোখের অসুখ তো আছেই, শরীরে বেঁধেছে বাসা আরো নানা রোগ। কথা বলতে পারছেন, তুখোড় স্মৃতি হাতড়ে স্বল্প পরিচিতদেরও চিনতে পারছেন।

বিজ্ঞাপন

তবু ভালো নেই তিনি। চিরযৌবনের কবি হেলাল হাফিজকে রোগীর শয্যায় শুয়ে থাকা কি মানায়?

আমাদের শৈশবে, তুমুল কৈশোরে আর এই যৌবনে; কবিতাযাপনের নানা গল্পে হেলাল হাফিজ তাঁর কবিতার মতোই চিরবর্তমান হয়ে থাকেন। ভবিষ্যতেও থাকবেন। তাঁর কবিতার মতোই বহুল চর্চিত কবির ‘যাপনের গল্প’, যদিও কবিজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে এক করে দেখতে নারাজ অনেকে। হেলাল হাফিজ এসবের কোনো তোয়াক্কা করেননি। বহমান স্রোতের মতো ‘জীবন’কে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন ‘যাপনের’ হাতে। অথবা ‘যাপন’কে ‘জীবনের’ হাতে।

‘প্রত্যাবর্তনের পথে

কিছু কিছু ‘কস্টলি’ অতীত থেকে যায়।

কেউ ফেরে, কেউ কেউ কখনো ফেরে না।

কেউ ফিরে এসে কিছু কিছু পায়,

মৌলিক প্রেমিক আর কবি হলে অধিক হারায়। ’

‘প্রত্যাবর্তন’ কবিতায় যে ‘মৌলিক’ প্রেমিকের কথা বলেছেন, তিনিই সেই প্রেমিক। যে কবির কথা বলেছেন, হেলাল হাফিজই সেই কবি; কিছু পেতে গিয়ে অধিক হারানোই যাদের নিয়তি। তবু কবির অভিযোগ থাকে না। বড়জোর ছোট্ট কোনো অনুযোগ, বড্ড উপেক্ষায় যা গন্তব্য পায় না।

১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায় জন্ম কবি হেলাল হাফিজের। ৭৪ বছর ছুঁয়েছেন কবি। শৈশবে মাকে হারানোর বেদনা থেকেই তাঁর কবি হয়ে ওঠা। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু হলেও হেলাল হাফিজ সেখানে স্থিতি হননি। দেশে ও প্রবাসে জড়িয়েছেন বিচিত্র নানা পেশায়। বহুপ্রেমে সিদ্ধ হয়েছেন, তবু কাউকে নিয়েই ঘর বাঁধেননি। একটা পুরো কবিজীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন হেলাল হাফিজ।

অনেক ভিড়েও মানুষ নিঃসঙ্গ হয়। আর নিঃসঙ্গতা কবিরা উপভোগ করেন বটে, কিন্তু জীবন এমনই, কখনো না কখনো পাশে কাউকে খুব প্রয়োজন হয়। সেটা কি কবিরা বোঝেন? কবিও কি উপেক্ষা করেন না? সেই মুখ, সেই চোখ, শুধু কবিকে ভালোবেসে যে সংসার সাজাতে চেয়েছিল, বুঝতে চেয়েছিল হয়তো; কবিও কি তাকে বা তাদের ফিরিয়ে দেননি? —

‘হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি/নয়তো গিয়েছি হেরে,/থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতায়/কে কাকে গেলাম ছেড়ে। ’

পাওয়া না পাওয়ার, চাওয়া না চাওয়ার দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, কিন্তু পিছুটান ছাড়ে না কবির। কোনো না কোনো অজুহাতে কবি জড়িয়ে থাকতে চান, ছড়িয়ে থাকতে চান অতীত থেকে ভবিষ্যতে।

‘এই নাও বাম হাত তোমাকে দিলাম।

একটু আদর করে রেখো, চৈত্রে বোশেখে

খরা আর খড়ের রাত্রিতে মমতায় সেবা ও শুশ্রূষা দিয়ে

বুকে রেখো, ঢেকে রেখো, দুর্দিনে যত্ন নিও

সুখী হবে তোমার সন্তান। ’

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় হেলাল হাফিজের প্রথম কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। মাত্র ৫৬টি কবিতা। এরপর কেটে গেছে ৩৬ বছর। শুধু বৈধভাবেই বইটির সংস্করণ হয়েছে ৩০ বারের বেশি। আর অবৈধ কয়েক শ সংস্করণের হিসাব কারো কাছে নেই। মাত্র কয়েকটি কবিতা লিখে জীবিতকালেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে এভাবে সমাদৃত হওয়া বাংলা ভাষার আর কোনো কবির ভাগ্যে জোটেনি। এক সাক্ষাৎকারে হেলাল ভাই আমাকে বলেছিলেন, পাঠকের এই ভালোবাসার ‘ভার’ নিতে না পারায় দীর্ঘদিন কবিতা লিখতে পারেননি। সব সময় আতঙ্কে থাকতেন, যদি তাঁর লেখা পরবর্তী বই সেভাবে পাঠক গ্রহণ না করে! অনেক পরে বুঝেছিলেন, তাঁর সেই ভাবনায় ভুল ছিল। আবারও কবিতায় ফেরেন তিনি। মদ-জুয়াকে অনেক আগেই ছেড়েছেন। তবে ‘নারীপ্রেম’ তাঁকে সব সময় সজীব রেখেছে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র ৫৬টি কবিতার সঙ্গে ১৫টি নতুন কবিতা নিয়ে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘কবিতা একাত্তর’। আর ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’ নামের আরেকটি কবিতাগ্রন্থ।

চিরপ্রেমিক, চিরসুন্দরের চিরকুমার কবিকে হাসপাতালের সাদা শয্যায় দেখা খুব কঠিন। বড্ড বেমানান। মনেপ্রাণে কামনা করি, দ্রুত সেরে উঠুন কবি। আপনাকে খুব প্রয়োজন এই অশ্লীল সভ্যতায়। যারা নিউট্রন বোমা বোঝে, মানুষ বোঝে না। দশকের পর দশক ধরে আপনার লেখা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে সূচনা সংগীতের মতো বাজে। সমস্বরে সবাই বলে ওঠে—

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। ’...

কবির একেকটি শব্দ বারুদের চেয়েও শক্তিশালী। একেকটি পঙক্তির সমান অস্ত্র নেই কোনো পরাশক্তির কাছে। অন্যায় আর অমানবিকতার বিপক্ষে মানুষকে উজ্জীবন ও সম্মোহন শক্তি, যুগে যুগে কবি ছাড়া আর কেউ দিয়েছেন কি? হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুসহ কোনো কোনো বিশ্বরাজনীতিক দিয়েছেন। কিন্তু তাঁরাও তো কবি, রাজনীতির!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যালে হেলাল ভাইয়ের চিকিৎসা চলছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। কবির আত্মমর্যাদা সম্পর্কে রাষ্ট্র জানে। নাগরিকরাও জানে। এর আগে কবির চোখের চিকিৎসায় স্বয়ং সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তুলে দিয়েছিলেন অর্থ।

আপনি নিশ্চয় সুস্থ হয়ে আবারও কবিতায় ফিরে আসবেন, হেলাল ভাই। আবারও আপনার ফেসবুক পেজে, সদ্য লিখতে আসা তরুণীর সঙ্গে ছবি দেখে ঈর্ষা করতে চাই। ঈর্ষা গোপন রেখে আপনাকে, শুধু আপনাকেই ভালোবাসতে চাই। শুভ জন্মদিন।



সাতদিনের সেরা