kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

পুকুরের কথা

মৌলীনাথ গোস্বামী

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পুকুরের কথা

অঙ্কন : মাসুম

চোখের সামনেই অথবা প্রাত্যহিক রোজনামচার অগোচরে পুকুরটা মজে গেছে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ লক্ষ করল সে। এই রাস্তার ওপর দিয়েই যাওয়া-আসা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এত দিন চোখেই পড়েনি। কবে মজে গেল পুকুরটা! একখানা রুক্ষ খেজুরগাছের ছেঁড়া ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল পুকুরটার দিকে।

বিজ্ঞাপন

এখন জায়গাটা বিশ্বকর্মার প্রমাণমাপের লোহার কড়াইয়ের মতো দেখতে লাগছে। জীবনের অনেক স্বাদ-বিস্বাদ রান্না করে তাপে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া কড়াই। পোড়া রান্নার স্মৃতি জায়গায় জায়গায় খয়েরি হয়ে জমাট বেঁধে থাকে যে কড়াইয়ে। পুকুরটারও একই দশা। কালচে খয়েরি পলি আর পাঁকে থকথক করছে।

বিশাল পুকুর ছিল একসময়। এই কয়েক দিন আগেও তিন-মানুষ জল ছিল। জলে আকাশের নীল প্রতিফলন ছিল। তখন জলের মধ্যিখানের গায়ের রং নীল দেখাত। পুকুরে অনেক মাছ ছিল। রুই, কাতল, শোল। কোত্থেকে কুঁচো চিংড়িও জুটেছিল ক-খানা। মাছের টানে ডুব দিতে আসত পানকৌড়ি, মাছরাঙা আর জলের টানে আসত ছেলেছোকরার দল। পুকুরের বুকে চলত তাদের দস্যিপনা, দাপাদাপি। পুকুরের পার ঘেঁষে তখন ঝামা পাথর দিয়ে গোড়ালি ঘষতে বসত আইবুড়ো মেয়ে। পরনের তাঁতের শাড়িটা দিয়ে নিজের কুমারী শরীর ভালো করে ঢাকাঢুকি দিয়ে শাড়ির আড়ালে গায়ে গন্ধ সাবান ঘষত। জোয়ান পুরুষরা চলে গেলে পরে মেয়েরা নাইতে আসত। পারের ছায়া গল্প শুনত গেরস্তালির। বাসন মাজা, কাপড় কাচা—সবই হতো। বড় তাড়াতাড়ি পুকুরের সংসার স্মৃতি হয়ে গেল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। এইতো গেল বছরও দুগ্গা প্রতিমা ভাসান হয়েছিল পুকুরে। বহু বছর ধরেই হতো। আশপাশের পাড়াগাঁ থেকে ভ্যান-রিকশায় চাপিয়ে ঠাকুর আসত আলপথ ধরে। দূর থেকে দেখা যেত মানুষের লম্বা মিছিল। সামনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর সাদা ধুতি পরা ঢাকিরা ঢাক বাজাতে বাজাতে হেঁটে আসত, তাদের পেছনে দুগ্গা ঠাকুরের পরিবার আর তারও পেছনে গৃহস্থ মহিলাদের দল, বুড়ো, জোয়ান মদ্দ। বেশির ভাগই একচালার প্রতিমা। তারপর একেকটা গ্রামের মানুষজন মিলে ভ্যান থেকে ঠাকুর নামিয়ে, পারে পাক খাইয়ে জলে বিসর্জন দিত। পুকুরের পারে গমগম করে উঠত...

‘আসছে বছর আবার হবে’

...ঝপাং করে ভাসান হয়ে যেত! সেই পুকুরটারই ভাসান হয়ে গেছে। মজা পুকুরটার মতোই তার মনটা খাঁ খাঁ করে উঠল। কয়েকটা দস্যি ছেলে খালি গায়ে মজা পুকুরের পাঁকে নেমে শুকিয়ে আসা কাদার মধ্যে কী যেন খুঁজছে। উবু হয়ে মরা পুকুরের দেহ ঘেঁটে চলেছে সমানে। একটি ছেলে কিছু একটা খুঁজে পায় কাদার ভেতর। পারে রাখা গামলার জলে ধোয় হাতের জিনিসটা। একটা সোনালি ঝুমকো। কাদা ধুয়ে গেলে রোদে ঝকঝক করে ওঠে। একখানা। জোড়াটা নেই। খেজুরগাছের তলায় দাঁড়িয়ে ওর মনে পড়ে যায় ঠিক এমনই ঝুমকো ওরও এক জোড়া ছিল একদিন। পথের কোন বাঁকে কবে পড়ে হারিয়ে গেছে, আজ আর মনে নেই। বিয়ের দ্বিতীয় বছর চড়কের মেলা থেকে ওর স্বামী কিনে দিয়েছিল। কখন যে ঝুমকো পরার ইচ্ছেটা মরে গেল জানতেই পারল না সে। ঝুমকো পরবে কী, ওর জীবনের জোড়টিই আর নেই যে!

ডোম যেমন মৃতদেহের নাড়িভুঁড়ি ঘাঁটে, ঠিক তেমনি ছেলেগুলো পাঁক থেকে টেনে বের করল লম্বা একখানা কাপড়ের টুকরো। একটা শাড়ি। পুকুরের তলায় তলিয়ে ছিল। পাঁকে মুখ গুঁজে পড়ে ছিল। এত দিন ধরে একটু একটু করে জমতে থাকা কাদার ভারে ভারাক্রান্ত। তার নিজেরও তো শাড়ি ছিল কত। ছাপা শাড়ি, বাহারি শাড়ি। ডুরে পাড়, জলচুরি পাড়, জংলা বুটি। শাড়িগুলোর গা থেকে কিভাবে যে ভালোবাসার রংগুলো বিবর্ণ হয়ে গেল, বুঝতেই পারল না। কোথায় হারিয়ে গেছে সেই শাড়িগুলো। জীবনের ডুবজলে কোথায় তলিয়ে গেছে।

খুচরো পয়সা পেয়েছে ছেলেরা। গামলার জলে ভালো করে ধুয়ে যে যার মতো গুনতে বসল। কেউ চার টাকা, কেউ পাঁচ, কেউ দুই। এতেই কী আনন্দ ওদের। হাতে খুচরো পয়সা, তা সে যত সামান্যই হোক, মনে আনন্দ আনে। ইচ্ছে জাগায়। এক প্লেট ঘুগনি, দুটি অমৃতি, চারটি ফুলুরি কিংবা জিবেগজা। বিয়ে ও বউভাত মিলিয়ে এমন অনেক কাঁচা টাকা পেয়েছিল সে। গুনে রেখেছিল। তিয়াত্তর টাকা। একটা মাটির ঘটে রেখে দিয়েছিল। মনে হতো—ক-ত টাকা! নিজের টাকা! বহুদিন জমিয়ে রেখেছিল, কিন্তু হিসাব রক্ষা করতে পারেনি। সময় সব হিসাব ভণ্ডুল করে দিয়েছিল একদিন। ঘট ভেঙে, সেই টাকায় বাসে-ট্রেনে চেপে শ্বশুরঘর থেকে চিরকালের জন্য বাপের বাড়ি চলে এসেছিল সে। পরে পাওয়া চোদ্দ আনার দরজা সেই থেকে বন্ধ হয়ে গেল। এখন আর টাকা ধরতেও ইচ্ছে হয় না ওর, নিজের জন্য কিছু কেনা তো দূর-অস্ত।

ছেলেগুলো একটা করে টেনে টেনে বের করছে আবার পাঁকেই ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। বাতিল জিনিস সব। ঠাকুরের ভাঙা সিংহাসন, ভাঙা কলসি, ছেঁড়া চটির পাটি। আরো কত কী! সংসার যেমন পুরনো বাতিল জিনিসপত্র ঘরের অদৃশ্য কোনায় ধারণ করে রাখে, ঠিক তেমনি পুকুরের জল তার নিজস্ব সংসারের গভীরে যা কিছু অকেজো সব ধারণ করে রেখেছিল আর ধারণ করেছিল সেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতি মুহূর্তের ভেঙে যাওয়া টুকরো...

 

চূর্ণ গার্হস্থ্য

...যতক্ষণ সংসার কানায় কানায় ভরা থাকে, ততক্ষণ টুকরোগুলো চোখে পড়ে না। তারও একটা ঠাকুরের কুলুঙ্গি ছিল একদিন। সেখানে ছোট্ট একটা সিংহাসনে বসে নারায়ণ আর বালগোপাল গুড়ের বাতাসা খেত। একটা পেতলের কলসি ছিল, যেটা কাঁখে নিয়ে জল ভরতে যেত সে। হাতে চুড়ির গোছা খনখন করত। চুড়ি আছে এখনো, তবে একটা; তাই আর আওয়াজ করে না! টইটম্বুর সংসারটা একটু একটু করে কেমন শুকিয়ে গেল। কেন গেল, কিসের দোষে, কার দোষে ভেবে পায় না সে। আর কী হবে ভেবে!

ছেলেগুলো কী একটা টানতে টানতে নিয়ে আসছিল। একটা প্রতিমার কাঠামো। দেখে বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল ওর। বাখারির শুলে গুঁজে থাকা খড়ের অবয়ব। সেটাও পচে আসছে। এক নারীর আকৃতি। সব মাটি ধুয়ে গেছে গা থেকে। সব আভরণ, রং, সজ্জা মুছে গেছে। যেখানে টানা টানা চোখ আঁকা ছিল একদিন, ঢেউয়ের মতো ঠোঁট ছিল, সেখানে এখন খড়ের খসখসে শূন্যতা। প্রতিমা বিসর্জন হয়ে গেছে। সেই কবে। ঠিক যেমন তার বিসর্জন হয়েছে আজ বহুকাল হলো। দশ হাতের সংসার আর নেই। অনেক দিন বাদে তার আবার মনে পড়ে গেল—খেজুরগাছের নিচে খড়ের কাঠামোর মতো যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে-ও একসময় প্রতিমার মতো ছিল।

চোখে টানা কাজল ছিল

ঠোঁটে হাটুরের কাছ থেকে কেনা লিপস্টিক ছিল

হাতে ওলাইচণ্ডীর মেলায় কেনা চুড়ি ছিল

আর

ভরন্ত পুকুরের মতো একটা জীবন ছিল...

একদিন হঠাৎ পুকুরটা মজে গেল!



সাতদিনের সেরা