kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৩০ সফর ১৪৪৪

আমার বাবা

সিরাজউদ্দিন আহমেদ

১৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আমার বাবা

অঙ্কন : মাসুম

করিমুন্নেসার শখ ছেলেকে পড়াশোনা শেখাবে।

গ্রামে একটি মাত্র পাঠশালা। হরিবাবুর পাঠশালা। সে যখন ছোট ছিল তখনো দেখেছে, বাপ-চাচাদের কাছে শুনেছে, তারাও হরিবাবুর পাঠশালায় দু-এক ক্লাস পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

হরিবাবু তখন যুবক ছিলেন, স্কুলটা সুন্দর ছিল, অনেক ছাত্র-ছাত্রী ছিল। এখন হরিবাবুর কালো চুল-দাড়ি সাদা হয়েছে। মাথার ওপর দোচালা ছাউনি ছাড়া পাঠশালার আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পনেরো-বিশজন ছাত্র-ছাত্রী আপনমনে পড়ে চলেছে।

করিমনের মনে সংশয়। তার ছেলেকে পাঠশালায় নেবেন তো? বিব্রত জড়সড় হয়ে বলল, মাস্টার মশাই, পোলাটারে আপনের পাঠশালায় নিয়া আসলাম।

মা-ছেলেকে দেখে বললেন, আজকাল আমার স্কুলে কেউ আসে না। স্কুলের অবস্থা দেখতেই পাচ্ছিস। কত নতুন স্কুল, সেখানে যা।

আপনার পাঠশালা আমার গ্রামের পাঠশালা। এই পাঠশালায় আমার হাতেখড়ি। একজন মুক্তিযোদ্ধার পাঠশালায় ছেলে পড়বে, এটাই আমার খায়েশ।

মাস্টার মশাই একটা খাতা টেনে নিলেন, ছেলের নাম বল।

পাঁচ বছরের বিজয়ের মনে আজ অন্য রকম আনন্দ। ওদের ছোট আঙিনা ছেড়ে এই প্রথম বাইরে এসেছে। মা বলার আগে বিজয় চটপট বলে ফেলল, আমার নাম বিজয় করিম।

এইটা কেমন নাম?

বিজয় দিবসে হইছে, তাই নাম রাখছি বিজয়। করিমুন্নেসার পোলা, তাই করিম। বিজয় করিম।

হরিবাবু মৃদু হেসে বললেন, তুই দেখছি খুব সাহসী মেয়ে! ছেলের নাম রেখেছিস নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে। ওর বাপে কিছু কয় নাই? বাপের নাম ক?

বাপ নাই।

মইরা গেছে? নাম তো মরে নাই। নাম ক?

করিমনের মুখ কালো হয়ে গেল। চোখে ক্রোধ। অপরাধীর মতো নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইল করিমন।

হরি মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, কোন বাড়ি?

সিকদারবাড়ি। মফিজ সিকদারের বড় মাইয়া করিমুন্নেসা।

চশমার কাচ মুছে ভালো করে তাকালেন। হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। মুখে আনন্দের আভা। বললেন, এইবার তোরে চিনবার পারছি। মুক্তিযোদ্ধা করিমন। এইটা বুঝি তোর সেই পোলা? বাবার নাম কী দিই ক তো?

করিমন বলল, আপনে যা ভালো বুঝেন তাই দেন। আপনে আমার গুরুজন, সবই জানেন। দেশ স্বাধীন হইল, বাপ-ভাই আমারে ঘরে জায়গা দিল না। আমার বাচ্চা হইচে বেপারিবাড়ির গোয়ালঘরে।

হায় ঈশ্বর, বিজয়ী বীরাঙ্গনা! কোথায় বিজয়ের জয়মাল্য পরিয়ে পরম শ্রদ্ধায় গ্রহণ করবে, তার আশ্রয় জুটল গোয়ালঘরে। দুঃখ করিস না মা, যিশুও গোয়ালঘরে জন্মেছেন।

আমি নিজে আর্মি ক্যাম্পে ধরা দিয়া গেরামের মাইয়াগো ইজ্জত বাঁচাইছি, এইটা কেউ বুঝতে চায় না।

ভেঙে পড়িস না করিমন, তুই একজন মুক্তিযোদ্ধা।

ভাঙি নাই মাস্টার মশাই। সেই জন্য পোলারে আপনার কাছে নিয়া আসছি।  

শোন করিমন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা। তোর, আমার, বাংলাদেশের সবার পিতা। তোর ছেলের বাবার নাম দিলাম শেখ মুজিবুর রহমান।

করিমন বলল, মাস্টার বাবু, সকলে হাসাহাসি করব।

 বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন, অনেক বাঙালি হাসাহাসি করে নাই? ব্যঙ্গ করে নাই? কইছে, ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার। পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করবে! হাসিতে কী হইছে? দেশ তো স্বাধীন হইছে।

করিমনকে নিয়েও গ্রামের মানুষ কম হাসাহাসি করে নাই।

ওই করিমন, বিয়া নাই পোলা পাইলি কই?

আল্লাহ দিছে।

সবই তো আল্লায়ই দেয়। তোর পোলার বাপের নাম কী?

আমারে পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে ধইরা নিছিল, সেইটা শুনো নাই?

শুনছি তো। সেই জন্য জানবার চাই পোলার বাপ একজন, না অনেকজন?

আমি কেমনে কমু, আমি কি ডাক্তার?

তয় পোলা তর সোন্দর হইছে। ফরসা ধবধবা। মনে হয় বাপ পাকিস্তানি পাঞ্জাবি।

ক্রোধে করিমন চেঁচিয়ে ওঠে, সন্তান হয় মায়ের পেটে। মায়ের রক্ত, মাংস, আদর, ভালোবাসা খেয়ে সে পৃথিবীতে আসে। সন্তান মায়ের। কোন হালার বীজে হইল কি না হইল, তাতে কী আসে যায়। তোমাগো পোলাপান যে তোমাগো বীজে হইছে, এইটা ঠিক জানো তো?

বেশ্যা মাগির মুখে এত বড় কথা!

সাবধান, আমি বাজারের মেয়েমানুষ না, মুক্তিযোদ্ধা করিমন। তিনজন পাকিস্তানি আর্মি খুন করেছি। আরো পাঁচজন রাজাকার খুন করতে আমার হাত কাঁপব না। বেগতিক দেখে রস নিতে আসা লোকজন কেটে পড়ে।

বিজয়ের মনে আজ আনন্দ থইথই করছে। এত দিন তার বাবা ছিল না কিংবা ছিল। বাবার নাম জানত না। বাবার অভাবে নত মাথায় ভয়ে গ্লানিতে পথ চলত।

গতকাল মা তাদের বেড়ার ঘরে বাবার একটি ছবি টাঙিয়ে দিয়েছে। কী যে সুন্দর! তাঁর আশপাশে কত ছেলেমেয়ের বাবাদের দেখেছে, তার বাবার মতো এত সুন্দর কারোর বাবা না। কিছুক্ষণ পর পর সে বাবার ছবির সামনে এসে দাঁড়ায়। ঘরে কেউ নেই। মা এখন ফসলের মাঠে। বিজয় বাবার ছবির সামনে এসে দাঁড়াল। মৃদু স্বরে ডাকল, ‘বাবা, ও বাবা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। ’

রাতে শুয়ে বিজয় মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে, ‘মা, তুমি আমার কত ভালো মা। ’

করিমন জিজ্ঞেস করল, আজ এত খুশি যে?

তুমি যে আইজ বাবারে আইনা দিছ।

বঙ্গবন্ধু তোমার একার বাবা না। যাদের বাবা নাই, উনি তাদের সকলের মা-বাবা। বঙ্গবন্ধু আমারও বাবা। আমার আপন মা-বাবা আমারে বাড়ি থেইকা বাহির কইরা দিছে। অথচ জাতির পিতা আমাগো সম্মান দিয়া বলছে, তোরা আমার মা। তোরা মুক্তিযোদ্ধা, জাতির গর্ব বীরাঙ্গনা। আমরা যাতে সম্মান নিয়া বাঁচতে পারি, সেই জইন্যে মাসে মাসে ভাতা দেয়। আমাগো জমি দিছে, ঘর দিছে।

মা, বীরাঙ্গনা কী?

করিমন থমকে গেল। কী বলবে ভেবে পেল না। পরে বলল, বাবা, এখন বুঝবা না। বড় হইলে বুঝতে পারবা। বড় হওয়ার পর যদি বাংলাদেশের সব বীরাঙ্গনাকে আমার মতো ভালোবাসতে পারো, মা ডাকতে পারো, বুঝব তুমি বঙ্গবন্ধুর উপযুক্ত ছেলে। আর তা যদি না পারো, বুঝব তুমি রাজাকারের ছেলে। আমার কেউ না।

মা, রাজাকার কী?

যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের খুন করেছে, ঘরবাড়ি লুট করছে, মা-বোনের ইজ্জত নিছে, বঙ্গবন্ধুরে খুন করছে, তারা রাজাকার।

ফুঁসে উঠল বিজয়, আমি রাজাকারদের কোনো দিন মাফ করব না। আমার বাবাকে যারা খুন করেছে, আমি এর প্রতিশোধ নেব।

করিমন ছেলেকে বুকে টেনে নিল, এ কাজের জন্য অনেক পড়াশোনা করে বড় হতে হবে। বড় হতে না পারলে তুমি রাজাকার তাড়াতে পারবা না।

মা, আমি অনেক পড়াশোনা করব। বাংলাদেশ থেকে রাজাকার তাড়িয়ে দেব। আমি বঙ্গবন্ধুর ছেলে।

করিমন বিজয়কে বুকে টেনে নিল।



সাতদিনের সেরা