kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৩০ সফর ১৪৪৪

আমাদের বশীর ভাই

আবদুস শাকুর শাহ

১৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমাদের বশীর ভাই

বরেণ্য শিল্পী মুর্তজা বশীর, আমাদের বশীর ভাই শিল্প সৃষ্টি, গবেষণা, লেখালেখি সব দিক দিয়ে ছিলেন এগিয়ে। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখনই তাঁর সম্পর্কে জেনেছি। তিনি স্কুলে পড়ার সময়ই একটু ডানপিটে ছিলেন। স্কুলের নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করতেন না।

বিজ্ঞাপন

তাঁর বাবা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সেই সময় আমার জন্মস্থান বগুড়ায় আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। করোনেশন স্কুলের পেছনে তাঁরা থাকতেন। বশীর ভাইয়ের সঙ্গে আমার এক বড় ভাই পড়তেন। তাঁর কাছেই বশীর ভাইয়ের দুরন্তপনার গল্প শুনেছি। ১৯৬৫ সালে আমি যখন চারুকলায় ভর্তি হলাম, তখন বশীর ভাই খুবই নামকরা শিল্পী। বশীর ভাইদের সঙ্গে যাঁরা পাস করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নামকরা শিল্পী ছিলেন। তখন আমরা শিল্পী ব্যাপারটা বুঝিনি। আর্ট কলেজে পড়তে এসেছি, পাস করে চাকরিবাকরি পাওয়া যাবে সেই চিন্তায়। পরে শিল্পী বিষয়টা শোনার পর ভাবলাম এটা আবার কী? বশীর ভাইয়ের মুখেই শুনেছি তাঁর ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা করার ইচ্ছা ছিল। কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়নি। তখন অনেকেরই হয়নি। শুনেছি, তখনকার অধ্যক্ষ বিখ্যাত শিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বলেছিলেন, ‘বশীর, তুমি শিল্পী হও, সেটা তোমার জন্য ভালো হবে। ’

বশীর ভাইয়ের ড্রয়িংয়ে খুব শক্তি আছে। আমরা এখন বুঝি, সিঙ্গল লাইনে ড্রয়িং করা খুব কঠিন। বশীর ভাই সিঙ্গল লাইনে পোর্ট্রেট করলে হুবহু মিলে যেত। ইউরোপে থাকাকালে তিনি প্রচুর সিঙ্গল লাইনে ন্যুড ড্রয়িং করেছেন। সিঙ্গল লাইন ড্রয়িং তাঁর শিল্পচর্চায় একটা বড় অবদান। ঢাকার সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। অবিভক্ত পাকিস্তানে তাঁদের পরিবার ছিল বনিয়াদি। তাঁর বাবা জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। পরে বশীর ভাই বেশ কিছু প্রদর্শনী করেন। একটা প্রদর্শনী দেখেছি জাতীয় জাদুঘরে। আরেকটা প্রদর্শনী দেখেছি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। সেটা ছিল এপিটাফ অব মার্টার বা মুক্তিযুদ্ধ বিষয় করে। বশীর ভাই অনেক সিরিজ ছবি এঁকেছেন। একসময় তিনি প্রজাপতির পাখা নিয়ে ছবি আঁকলেন। পুরনো দেয়াল নিয়ে দেয়াল সিরিজ করলেন। এগুলোকে দিয়ে তাঁকে সহজে চেনা যায়। একসময় শিক্ষকতা করার চিন্তা করলেন। সেই সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চারুকলা বিভাগ খুলেছে। সেখানে দায়িত্বে ছিলেন শিল্পী রশিদ চৌধুরী। তাঁরা দুজনই একই বছর পাস করেছেন এবং বন্ধু। বন্ধুর আহ্বানে বশীর ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করব—এমন একটা চিন্তা-ভাবনা করলাম। তখন আমি সরকারি চাকরি করি। মাস্টার্সে ভর্তি হলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে বশীর ভাইকে পেলাম। তিনি সব সময় ফিটফাট থাকতেন। দেখেই মনে হতো একজন পেইন্টার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে যাওয়া-আসা করতেন। বশীর ভাইকে তখন একনামে সবাই চিনত। তিনি যখন বাসে উঠতেন, সবাই তাঁকে সমীহ করত। দীর্ঘদিন সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। আমি তাঁর দু-একটা ক্লাস পেয়েছি, বিশেষ করে ছবির কম্পোজিশন নিয়ে। বশীর ভাই বলতেন যে যা করো, বুঝেশুনে করো।

অবসরগ্রহণের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তিনি একজন অলরাউন্ডার ছিলেন। ছবি আঁকার বাইরে সংগ্রহ, লেখালেখি, পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এটা অন্য শিল্পীদের মধ্যে কম দেখেছি।

২০০৭ সালে বশীর ভাইয়ের সঙ্গে একটা আর্ট ক্যাম্পে গিয়েছিলাম রাজস্থানের জয়সলমির। জয়সলমির জেলার একটা রাজবাড়িতে। দেশে তাঁর সঙ্গে সেভাবে মেশার সুযোগ হয়নি। রাজস্থানে গিয়ে আমাদের দুজনের একই রুমে জায়গা হলো। সেখানে পাঁচ দিন ছিলাম। সেটা ছিল সার্কের সাত দেশের শিল্পীদের একটা ওয়ার্কশপ। আমি এঁকেছিলাম সাত দেশের সাতটা পোর্ট্রেট। বশীর ভাই আঁকলেন একটা মেয়ে। সেই মেয়ের মাথার ওপর সাত দেশের সাতটা ফুল। অন্যরা সার্কের বিষয়টা ধরতে পারেনি। তারা একেকজন নিজের মতো করে আঁকল। একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো জয়সলমির মরুভূমিতে। ধু ধু মরুভূমিতে বালু আর বালু। মাঝেমধ্যে ছোট সবুজ ঘাস চোখে পড়ে। আমরা সবাই উটের পিঠে করে ঘুরে বেড়ালাম। উট চলার সময় দোলে। আরোহী ভালো করে না ধরলে পড়ে যায়। সেখান থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। সেখানে রাতে গানের অনুষ্ঠান হলো। রাজস্থান সন্ধ্যার পর ঠাণ্ডা। আমাদের সম্মানে রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান হচ্ছে। বশীর ভাই একবার ওদের সঙ্গে নাচার চেষ্টা করলেন। পরে এসে বসে নাচ-গান উপভোগ করলেন। অনেক সুন্দর একটা অনুষ্ঠান ছিল।  

ফেরার পথে দিল্লিতে এলাম। সেখানে দেখলাম মানুষের কত কিছু সংগ্রহের শখ থাকে। আমরা রং, ব্রাশ, কাগজ কিনি। জামাকাপড় কিনি। বশীর ভাই জামাকাপড় কিনলেন ঠিকই, একদিন সকালে বললেন, ‘শাকুর, চলো দেখি পুরনো কয়েন পাওয়া যায় কি না। ’ দুজন বেরিয়ে একটা দোকানে জিজ্ঞেস করলাম পুরনো কয়েন, চিঠিপত্রের দোকান পাব কোথায়? বলে দিল ওমুক মার্কেটে। সেখানে গিয়ে খুঁজে খুঁজে তাঁর পছন্দমতো কয়েন, চিঠিপত্র নিলেন। বশীর ভাই পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কয়েন কিনে ফেললেন। সংগ্রহের নেশাটা তাঁর ভেতর এত প্রকট ছিল, তা অন্য কোনো শিল্পীর ছিল না। দুই বছর হয়ে গেল বশীর ভাই নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কাজের মধ্যে।

 



সাতদিনের সেরা