kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জন্মশতকে ওয়ালীউল্লাহ্

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান দুই লেখক—কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও কবি আবুল হোসেন। দুজনেরই জন্ম ১৯২২ সালের আগস্টে। তাঁদের শততম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়ে শিলালিপির এই আয়োজন

ইমতিয়ার শামীম   

১২ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



জন্মশতকে ওয়ালীউল্লাহ্

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (জন্ম : ১৫ আগস্ট ১৯২২, মৃত্যু : ১০ অক্টোবর ১৯৭১)

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র জন্মশতবার্ষিকীর দিকে তাকিয়ে প্রথমেই মনে পড়ছে তাঁর ‘কেরায়া’ গল্পকে...।

মৃত্যুপথযাত্রী এক মুমূর্ষু বুড়ো উঠেছিল গঞ্জে মাল খালাস করে ফিরতি যাত্রার জন্য অপেক্ষারত কেরায়া-নৌকায়। সে নৌকা বায় দুজন মাঝি। তবে ফাইফরমাশ খাটার মতো ছোট এক এতিম ছেলেও তাদের সঙ্গে আছে।

বিজ্ঞাপন

মৃত্যু থেকে নিষ্কৃতি নেই—জানে সেই মরণযন্ত্রণায় গোঙানিরত বুড়ো। তা ছাড়া মরতে কোনো আপত্তিও নেই তার, তবে সে চায় আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে মারা যেতে। মনে হয়, স্বয়ং মৃত্যুই যেন এক জীবনতরিতে উঠে বসেছে জীবনের সন্ধানে। নিজের মৃতদেহ নিজেই টেনে বেড়ানোর মতো, টানতে টানতে সেটিকে স্বজনের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরিভ্রমণে নিমগ্ন হওয়ার মতো শক্তিমত্তা খুব বেশি মানুষের থাকে না যেমন; তেমন লেখকও খুব কম, নিমগ্ন লেখালেখির মধ্য দিয়ে যিনি পারেন অনাগতের কাছে পৌঁছে যেতে।

শূন্য নৌকা নিয়ে যাতে ফিরতে না হয় সে জন্য মাঝিরা অপেক্ষা করছিল গুড়ের কেরায়ার মহাজনের জন্য। কিন্তু মহাজন ফেরে না, সামান্য একটু আর্থিক উষ্ণতাও জোটে না মাঝিদের। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধের অপেক্ষার পাল্লাও ভারী হতে থাকে। মহাজন আসে না বলে মাঝিদের ক্রোধ ঘনীভূত হতে থাকে। কেরায়া-নৌকা কেরায়া ছাড়া ফেরে কী করে! একসময় তাদের ক্রোধ উৎকট শূন্যতা হয়ে গ্রাস করে নিজেদেরই। আর বৃদ্ধও পারে না নিজেকে ধরে রাখতে। নিজের গাঁয়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছে পৌঁছার আগেই রাতের তৃতীয় প্রহরে তার মৃত্যু ঘটে। তারপর সারাটা দিন খরচ করে সন্ধ্যার দিকে তার লাশ গাঁয়ে পৌঁছে দিয়ে নিজেদের গন্তব্যের দিকে যাত্রা করে মাঝিরা।

এই ‘কেরায়া’ই ঢেউ তুলে নাচে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র এই জন্মশতবার্ষিকীতে। কেননা মনে পড়ে যায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র সেই আকাঙ্ক্ষাকে, যা তিনি প্রকাশ করেছিলেন ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে শেষবার স্বদেশে এসে। তাঁর সত্মা বেগম আহমাদউল্লাহ্র স্মৃতিচারণা থেকে জানতে পারি, সেবার টাঙ্গাইলের করটিয়া কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরা এক অনুষ্ঠান করে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন তাঁকে। একটি মফস্বল শহরে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অথচ শ্রদ্ধা, উষ্ণতা ও আন্তরিকতায় ভরা অভ্যর্থনা পেয়ে অভিভূত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সেদিন বলেছিলেন, ‘বহুদিন আমি দেশের বাইরে, তবু আপনারা আমাকে ভোলেন নাই। আমার লেখা পড়েন। আপনাদের এত ভালোবাসার পর আর বেশিদিন বিদেশে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ’

ওই বৃদ্ধের মতোই আকুলতা জেগেছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র প্রাণে। ফিরতে চেয়েছিলেন। পার্থক্য এই, শারীরিকভাবে শেষ পর্যন্ত তিনি আর ফিরতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকলেও তাঁর মৃত্যুর পর স্বাধীন দেশের কোনো সরকার তাঁর অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। তাঁর স্ত্রী আন-মারী যোগাযোগ করেও কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। তাঁর স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকেও এ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী পাকিস্তান অবজারভারের সাংবাদিক আবদুল মতিন লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার পর পাকিস্তান সরকারের কাছে পাওনা প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তাঁর পরিবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তার কোনো প্রমাণ নেই! অতএব এই দাবি বা আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়! একই প্রসঙ্গে আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, তাঁর প্রতি খুব অন্যায় হয়েছে। ’ মুশকিল হলো, আমরা অন্যায়ের কথা স্বীকার করে নিতে যত পারদর্শী, সেটার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে কিংবা তা দূর করতে এর এক আনাও আগ্রহী নই।

 

দুই.

আবির্ভাবেই আলোড়ন তুলেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই গল্পের, নাম ‘নয়নচারা’। সেই ১৩৫৩ বঙ্গাব্দে এ বই নিয়ে পরিচয় পত্রিকায় পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখতে গিয়ে সুশীল জানা লিখেছিলেন, ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র মতো মুসলমান লেখকের আবির্ভাব বহুদিনের একটি মর্মান্তিক অভাব ক্রমে ক্রমে পরিপূর্ণ করে তুলবে, বাংলা সাহিত্য পাবে তার সমগ্ররূপ। ’ মানে, তাঁর আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যকে সামগ্রিকতার দিকে নিয়ে যাওয়ার দুয়ার খুলে দেয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র মতো শক্তিমান ‘মুসলমান লেখকের’ আবির্ভাবের কথা জানিয়ে সুশীল জানা মূলদৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন বাংলা কথাসাহিত্য সমৃদ্ধ হয়ে ওঠার দিকেই, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র লেখার গন্তব্য ও অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যের দিকে। সুশীল জানাকে লিখতে দেখি, ‘ওয়ালীউল্লাহ্ সাহেবের ঝোঁক মনঃসমীক্ষণের দিকেই বেশি। এতে বিপদ আছে, বিশেষ করে যে শ্রেণির মর্মকথা তিনি লিখেছেন সে ক্ষেত্রে। মধ্যভিত্তিক ভাবপ্রবণতা আবেগের ঝোঁকে ঘাড়ে চেপে বসে গিয়ে নিপীড়িত শ্রেণি-জীবনের ওপরে। জীবন আড়াল হয়ে যায়, যা বর্তমান সাহিত্যে খুবই সুলভ। এতে রচনা জীবনধর্মী না হয়ে, হয়ে পড়ে ভাবধর্মী। ’ সুশীল জানা যে সাহিত্যিকের মধ্যে ‘মনঃসমীক্ষণের’ লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিলেন, পরবর্তীকালের সমালোচক-আলোচক, বিশেষত ওয়ালীউল্লাহেক নিয়ে পিএইচডি থিসিসসম্পন্নকারী শিক্ষার্থীরা সেই সাহিত্যিককে পৌঁছে দিয়েছেন ‘চেতনার অন্তঃশীল প্রবাহে’। ‘মনঃসমীক্ষণের’ লক্ষণটুকু অতিক্রম করে তাঁরা সামনের গিয়ে এগিয়ে গেছেন ভীষণ দ্রুত পায়ে।

তা যা হোক, এ তো অস্বীকার করার উপায় নেই, কথাসাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ উদ্বোধন ঘটিয়েছেন ব্যক্তিচৈতন্যের। ব্যক্তি ও সমাজ সমগ্রতার মধ্যে যে অনিবার্য নৈকট্য ও দূরত্ব রয়েছে, কখনো সেটিকে কেন্দ্র করে, কখনো বা সেটির প্রান্তবর্তী অবস্থানে থেকে তিনি এক ধরনের নৈতিক মূল্যবোধ নিরীক্ষণের খেলায়ও মগ্ন থেকেছেন। সমাজচেতনা তাঁর লেখায় খুব স্পষ্ট হলে কী হবে, শেষ পর্যন্ত তাঁর গন্তব্য হলো মানুষের অন্তর্গত মানুষ, নৈতিকতার অন্তর্গত মানুষ, মানুষের অন্তর্গত নৈতিক মানুষ। তবে তাঁর এই যাত্রাপথে তিনি একেবারে নিঃসঙ্গও নন। কারণ তাঁর উপন্যাসগুলোতে যে মগ্নতা, নিরীক্ষা ও চৈতন্যপ্রবাহের দোলাচল রয়েছে, সেসবের অস্তিত্ব রয়েছে তাঁর পূর্ববর্তী ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার আর সতীনাথ ভাদুড়ীর বিভিন্ন লেখায়ও।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘অন্তঃশীলা’ (১৯৩৫), গোপাল হালদারের ‘একদা’ (১৯৩৫) এবং সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ (১৯৪৫) উপন্যাসের কথা। এসব উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্র বিকাশের ধরনকে অবলম্বন করে গবেষক-শিক্ষকরা সেগুলোকে চেতনার অন্তঃশীল প্রবাহধর্মী সাহিত্যকাঠামোতে ফেলেছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহেক অনেকে ‘অস্তিত্ববাদী লেখক’ও মনে করেন, যেমন মনে করা হয় মার্ক্সীয় চিন্তাধারার প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল তিনি। যদিও এ রকম মনে করার যেমন খুব একটা প্রয়োজন নেই, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্যও নয়। কিন্তু গবেষণা বা আলোচনা করতে গেলে আমাদের তো আবার তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কের দরকার হয়! আর সেই ফ্রেমওয়ার্কটি যদি পশ্চিমা পদ্ধতির সঙ্গে মেলে, তাহলে তা হালে বেশ পানিও পেয়ে যায়। বোধ করি তেমন সব কারণকে অবলম্বন করে অনেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহেক বিভিন্ন দর্শনের ফ্রেমওয়ার্কে ফেলে আলোচনা করে থাকেন, বিশেষত চৈতন্যস্রোতের প্রসঙ্গ টেনে আনেন, যা ওয়ালীউল্লাহ্ সংক্রান্ত আলোচনার বহুমাত্রিকতাকে সংকীর্ণ করে ফেলে। বাস্তবত ব্যক্তিচৈতন্যের উদ্বোধন ঘটিয়েছেন—এ ধারণাই ওয়ালীউল্লাহ্চর্চাকে সমৃদ্ধ করতে পারে, বহুমাত্রিকও করে তুলতে পারে। এতে তাঁর গল্প আর নাটক অবলোকনেরও নতুন দুয়ার খুলে যায়।

 

তিন.

পাঁচ দশক বয়সী মানুষ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ চোখে দেখেছেন ইতিহাসের তিনটি কঠিন ক্রান্তিকাল; যার একটি তেতাল্লিশের মন্বন্তর, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সাতচল্লিশের ভারত বিভক্তি, তৃতীয়টি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় বাংলাদেশের মানুষের সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধ। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের শেষ তিনি দেখে যেতে পারেননি। তবে এই তিন পর্বের বিষয়-আশয়গুলো নানাভাবে তাঁর লেখায় ছায়া ফেলেছে, তাঁর লেখাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং কখনো কখনো তাঁকে ব্যক্তিচৈতন্যের সীমারেখা অতিক্রমণেও উদ্বুদ্ধ করেছে।

‘লালসালু’র কথাই ধরা যাক, বেশির ভাগ পাঠকেরই ধারণা, এই উপন্যাস ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করেছে, গ্রামবাংলার জনমানসের গভীরে পীরবাদ যে শিকড় গেড়েছে, তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানীং কেউ কেউ আবার ‘লালসালু’কে এত বেশি সরলতার সঙ্গে দেখতে শুরু করেছেন যে তাঁরা মনে করছেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পীরবাদ, মাজারবাদ ইত্যাদি বিষয়-আশয় সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি; এসব সম্পর্কে তাঁর ধারণারও অভাব রয়েছে। কিন্তু গল্প-উপন্যাস নিছক কাহিনি বা তথ্যের আধার নয়, বরং আঙ্গিকেরও, ভাষারও, বোধেরও এবং কল্পনারও—এটি যদি মেনে নিই কিংবা যদি মেনে নিই যে গল্প হলো সত্যকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে মিথ্যার কুহকে উপস্থাপন করেও শেষ পর্যন্ত সত্যের কাছেই প্রত্যাবর্তন করা, তাহলে এমন ধারাভাষ্যকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ আর মনে হয় না। বরং ‘কুটিল’ মজিদের অসহায়তাটুকুই আমাদের প্রাণে তীব্র হয়ে বাজতে থাকে। এই চরিত্রটিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এত পরস্পরবিরোধী সরলতা ও গরলতা দিয়ে উপস্থাপন করেছেন যে মজিদের দিকে তাকালেই আমার মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার পঙক্তি, ‘পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে। ’ মজিদের কুটিলতা, প্রতারণা, ধর্মব্যবসা, ক্রূরতা আমাদের যতই ক্রুদ্ধ করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাকে ঘৃণা করা কিন্তু কঠিনই হয়ে ওঠে। বরং গোপন এক সহমর্মিতাই অনুভব করি আমরা পশ্চাতে পড়ে থাকা এই মানুষটির জন্য।

জীবনের তিন ক্রান্তিকাল আর নিজের অভিজ্ঞতাজাত উপলব্ধি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহেক বারবার ভাঙচুর করেছে। এই ‘লালসালু’র কথাই ধরা যাক। বাংলায় তিনি এর উপসংহার যেভাবে টেনেছেন, ইংরেজিতে অনূদিত ‘লালসালু’র সঙ্গে তার অমিল রয়েছে। আবার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’য় একেবারেই অন্যদিকে যাত্রা করেছে তাঁর কলম। এ উপন্যাস যেন কোনো ব্যক্তির নৈতিকতাহীনতার গল্প নয়, বরং মূল্যবোধ হারিয়ে ফেললে একটি পুরো সমাজ কী করে হিংস্রতায় একাট্টা হয়ে পড়ে, তারই আখ্যান। আর ওয়ালীউল্লাহ্র ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ই বোধ করি স্বাধীনতাপূর্ব সময়ের একমাত্র উপন্যাস, যা তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের সম্পর্ক ক্ষীণ হতে হতে মৃত হয়ে পড়ার রূপক ইঙ্গিত তুলে ধরে।

 

চার.

লেখা শুরু করেছিলাম ‘কেরায়া’কে দিয়ে। এর স্রষ্টা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ আজ আর নেই! কিন্তু মৃত্যুকে কিভাবে দেখেন তিনি? ‘কেরায়া’তে বলা হয়েছে, ‘মৃত্যু জানে তার পরাজয় নাই। তাই হয়তো কখনো বেড়াল যেমন ইঁদুর নিয়ে খেলে, তেমনি সে-ও মানুষের সঙ্গে খেলে। ’ মানুষ যে মৃত্যুর খেলার এক নিরুপায়, অনন্যোপায় সঙ্গী, সারা জীবনেও মানুষের তা জানা হয় না। যেমন তার জানা হয় না, এই যে প্রকৃতি—সেটি নিজেই এক শক্তিশালী চরিত্র। কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ্ সেটি জানতেন। আর সে জন্যই তিনি অনায়াসে লিখতে পারেন, ‘সূর্য ওঠে, অন্ধকার কাটে, তবু দিন আসে না। তবে সূর্যকে কে ধরে রাখতে পারে? তার নিত্যকার পরিক্রমা শুরু হয়েছে, দিন আসুক বা না আসুক, তার পরিক্রমা কেউ রুখতে পারে না। ’ তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্প থেকেই প্রকৃতির এমন বিশেষ চরিত্র হয়ে ওঠার উদাহরণ টেনে আনা সম্ভব।

দিন যত যাবে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উজ্জ্বলতা তত বাড়বে এবং এতে কোনো সংশয় নেই আরো শত শত বছর ওয়ালীউল্লাহ্ উদযাপিত হবেন। লেখাটি শেষ করতে গিয়ে হঠাৎ এও মনে হচ্ছে, তিনি আমাদের এই বাংলাদেশের একমাত্র সাহিত্যিক, যিনি বিপ্লবী চে গুয়েভারার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন, শিহরিত হয়েছিলেন, কথা বলেছিলেন। তাঁর সাহিত্য আলোচনার সঙ্গে এই তথ্যটির কোনো যোগ নেই ঠিকই, তবে আন-মারীর দেওয়া এই তথ্য প্রকারান্তরে এটিও জানিয়ে দেয়, পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে সাহিত্যিক ওয়ালীউল্লাহ্ কী নিবিড় একাত্ম বোধ করতেন।



সাতদিনের সেরা