kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

E বর্ণ ছাড়া লেখা ভিনসেন্ট রাইটের উপন্যাস ‘গ্যেডসবি’

ডা. অপূর্ব চৌধুরী

১ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



E বর্ণ ছাড়া লেখা ভিনসেন্ট রাইটের উপন্যাস ‘গ্যেডসবি’

লেখকরা পৃথিবীতে মজার মজার লেখা লেখেন; বিশেষ করে বিশ্বসাহিত্যে।

ইংরেজি ভাষার অ্যালফাবেট বা বর্ণমালায় লেটার বা বর্ণের সংখ্যা ২৬। এর ৫ নম্বর বর্ণ হলো E। ইংরেজি ভাষায় এমন একটি উপন্যাস আছে, যেটি লিখতে একবারের জন্যও ঊ বর্ণটি ব্যবহার করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

উপন্যাসজুড়ে যত শব্দ এসেছে, তার একটিতেও E নেই!

উপন্যাসটির নাম ‘গ্যেডসবি’। লিখেছেন আর্নেস্ট ভিনসেন্ট রাইট। ১৯৩৯ সালে রাইট উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। এতে শব্দ আছে ৫০ হাজার ১১০টি। এর মধ্যে একটি শব্দের মধ্যেও একবারের জন্যও E বর্ণটি আসেনি! উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে কথিত আছে যে লেখক টাইপরাইটারে লিখতে গিয়ে E লেটারটি বেঁধে রেখেছিলেন, যাতে তাঁকে টাইপরাইটার সেটি লিখতে না দেয়।

মজার ব্যাপার হলো, ইংরেজি গ্রামারে এমন কিছু নিয়ম আছে, যেখানে আপনাকে E ব্যবহার করতেই হবে। অনেক শব্দের পাস্ট টেন্সে শব্দের শেষে ed যোগ করতে হয়; যেমন—expect-এর অতীত কাল লিখতে expected লিখতেই হবে, অথবা ask-এর পাস্ট টেন্স লিখতে asked লিখতে হবে। কিন্তু ভিনসেন্ট রাইট ‘গ্যেডসবি’ উপন্যাসটি এমনভাবে লেখেন, যাতে অতীত কাল বা পাস্ট টেন্সের কোনো শব্দ ব্যবহার করতে না হয়। আবার বেশির ভাগ Pronoun বা সর্বনামে e আছে; যেমন—he, she. লিখতে গিয়ে লেখক সর্বনামও এড়িয়ে গেছেন, যাতে ব বর্ণটি না আসে।

কোনো একটি নির্দিষ্ট বর্ণকে অথবা একাধিক নির্দিষ্ট বর্ণ বাদ দিয়ে একটি লেখা লিখলে তাকে বলে lipogram. শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক ভাষার leipogrammatos শব্দটি থেকে। এর অর্থ leaving out a letter, মানে কোনো বর্ণকে পরিত্যাগ করা। গ্রিক ভাষায় এমন লেখার উদাহরণ পাওয়া যায়।

লিপোগ্রামের কিছু নিয়ম আছে। কোনো অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, বাক্যগুলো ব্যাকরণের নিয়ম মেনে চলতে হবে, এমনকি শব্দ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অর্থহীন শব্দ হওয়া যাবে না। ওই সময়কালে গ্রিক ভাষার একটি সাধারণ বর্ণ সিগমাকে বাদ দিয়ে এমন লিপোগ্রাম লেখার চেষ্টা করা হতো। লেখকরা একে এক ধরনের ওয়ার্ড গেম চ্যালেঞ্জ মনে করে এমন পদ্ধতিতে লিখতে চেষ্টা করতেন।

আবার আরেক ধরনের লিপোগ্রাম আছে, যেটিতে আপনাকে একটি পূর্ণ বাক্য লিখতে হবে সব বর্ণ ব্যবহার করে, তবে নির্দিষ্ট একটি ছাড়া। এমন লেখার পদ্ধতিকে বলে pangrammatic lipogram.প্রাচীন গ্রিকে লিপোগ্রামে লেখার জন্য সর্বপ্রথম যাঁর নাম আসে তিনি হলেন লাসুস হার্মিয়ান। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে গ্রিক ভাষায় এই লেখকের দেখা মিলেছিল, যিনি লিপোগ্রামে কবিতা লিখতেন। তিনি বেশির ভাগ সময় গ্রিক বর্ণমালার সিগমাকে ব্যবহার না করে শব্দগুলো বাছাই করতেন। পরবর্তী সময়ে সিগমা ব্যবহার না করে সিস্টেমেটিক এমন লিপোগ্রামে লেখা গ্রিক ভাষায় প্রচলিত হয়ে ওঠে।

কেবল প্রাচীন গ্রিক কিংবা আধুনিক ইংরেজি ভাষায়ই লিপোগ্রামাটিক পদ্ধতিতে লেখা হয়নি। জার্মান ও ইতালীয় ভাষায়ও লিপোগ্রামাটিক পদ্ধতিতে কবিতা লেখার প্রচলন দেখা দিয়েছিল সতেরো শতকের দিকে। আবার স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষায় আরেক ধরনের লিপোগ্রামের সন্ধান পাওয়া যায়। একে বলে বাকলিক লিপোগ্রাম। এই পদ্ধতিতে শুধু যেকোনো vowel-কে বাদ দিয়ে লেখার চেষ্টা করা হতো।

ভিনসেন্ট রাইট তাঁর লিপোগ্রামাটিক পদ্ধতিতে ‘গ্যেডসবি’ লেখার ব্যাপারে প্রথম উৎসাহিত হয়েছিলেন আরেকটি লিপোগ্রাম লেখা পড়ে। সেটি ছিল একটি লিপোগ্রামাটিক কবিতা। যদিও ভিনসেন্টের দীর্ঘ ৫০ হাজারের বেশি শব্দে লেখা ‘গ্যেডসবি’ প্রকাশিত হওয়ার আগে স্প্যানিশ লেখক এনরিক জার্ডিয়াল ১৯২৬ সালে কয়েকটি ছোটগল্প লেখেন লিপোগ্রাম পদ্ধতিতে।

ইউরোপের অনেক ভাষায়ই লিপোগ্রামাটিক পদ্ধতিতে কবিতা, প্রবন্ধ ও গল্প লেখা হয়েছে। আমাদের উপমহাদেশেও এই পদ্ধতিতে লেখার নজির আছে। সংস্কৃত ভাষায় লেখা ‘দশকুমারীচরিত’-এর ৭ নম্বর অধ্যায়টি লেখা হয়েছিল লিপোগ্রাম পদ্ধতিতে। সেখানে পাঁচটি ব্যঞ্জনবর্ণ পরিহার করে পুরো অধ্যায়টি লেখা হয়েছিল।

সময় সময় বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে লিপোগ্রাম পদ্ধতিতে লেখার চেষ্টা হয়েছে। একুশ শতকেও অ্যালেন কোরির The Subversive Job Search কিংবা Christian Bok-এর পপুলার বই Eunoia এর সর্বশেষ উদাহরণ, যেখানে লিপোগ্রামাটিক পদ্ধতিতে কয়েকটি বর্ণ বাদ দিয়ে লেখাগুলো লেখা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা