kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

সাক্ষাৎকার

আমরা দুরন্ত দুর্বার পদ্মাবতীর কণ্ঠে পরিয়ে দিয়েছি এই স্বর্ণসেতুহার

কবি নির্মলেন্দু গুণ গত ২১ জুন আটাত্তরে পা দিয়েছেন। জন্মদিন উপলক্ষে সাম্প্রতিক বাংলাদেশ, তাঁর সাহিত্যকর্ম ও জীবনকথা নিয়ে মুঠোফোনে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি গিরীশ গৈরিক

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমরা দুরন্ত দুর্বার পদ্মাবতীর কণ্ঠে পরিয়ে দিয়েছি এই স্বর্ণসেতুহার

প্রশ্ন : গত ২১ জুন আপনার জন্মদিন ছিল। কেমন উপভোগ করলেন?

নির্মলেন্দু গুণ : জন্মগ্রহণের পবিত্র স্মৃতি মানুষের মনে থাকে না, তখন সেভাবে মস্তিষ্ক তৈরিও থাকে না। কিন্তু মানুষ জন্মদিনকে ভালোবেসে স্মরণে রেখে উদযাপন করে। জন্মদিন পালন করা আমার কাছে ক্লান্তিকর ও অস্বস্তিকর।

বিজ্ঞাপন

এই ভাবনা থেকে কয়েক বছর ধরে জন্মদিন পালন করা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি।

প্রশ্ন : ২৫ জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধন করবেন। এ বিষয়ে আপনার অভিমত জানতে চাই।

নির্মলেন্দু গুণ : আমি কবিতার মানুষ। তাই পদ্মা সেতুর অভিব্যক্তি গত ১৬ জুন ‘এই স্বর্ণসেতুহার’ নামক কবিতাটি ফেসবুকে পোস্ট করে জানিয়েছি। সেই কবিতাটি আবার বিটিভিতে পাঠ করেছি, যা প্রচারিত হবে ২৫ তারিখে। কবিতাটি উৎসর্গ করা হয়েছে পদ্মা সেতুর রূপকার শেখ হাসিনাকে। কবিতার তেষট্টি চরণে আমার যা কিছু বলার বলে দিয়েছি।

প্রশ্ন : এরই মধ্যে আপনার ‘এই স্বর্ণসেতুহার’ কবিতাটির শেষ চরণগুচ্ছ ফেসবুকে ভাইরাল।

নির্মলেন্দু গুণ : তাই নাকি? এটা তো জানতাম না।

প্রশ্ন : শেষের সাত লাইন। ‘আমরা দুরন্ত দুর্বার পদ্মাবতীর কণ্ঠে/পরিয়ে দিয়েছি এই স্বর্ণসেতুহার। /তুমি তাকে দেখে রেখো, প্রিয়তমা। /এখন আর অপেক্ষা কিসের?’ ...যান, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে/এখন মহানন্দে, মহাসুখে/চোখের পলকে হোন পদ্মাপার।

নির্মলেন্দু গুণ : তাই বলো। আমার এখন অবসরজীবন। করোনা সেই যে চার দেয়ালে বন্দি করে দিয়েছে, তাতে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সময়-সুযোগ করে মাঝেমধ্যে দুই-চার লাইন মোবাইলে লিখি। টেলিভিশনের পর্দায় তাকিয়ে সময় কাটিয়ে দিই। এখন নিউজ দেখলেই শুধু বন্যার খবর। বানভাসি মানুষের অসহায়ত্ব দেখে খুব ব্যথিত হই। এখন আমার নতুন বই ‘নির্মলেন্দু গুণের কথামৃত’ নিয়ে কাজ করছি।

প্রশ্ন : আপনি ভীষণভাবে টেকনোপ্রিয়। একদা এসএমএসে কবিতা লিখতেন বলে জানি। এত টেকনো আসক্তির কারণ কী?

নির্মলেন্দু গুণ : টেকনোলজির প্রতি আমার বরাবরই বাড়তি দুর্বলতা। মুঠোফোনের কাব্যটি তো এসএমএসের মাধ্যমে লেখা। জাপানে যখন এসএমএস লিটারেচার শুরু হয়, তখন আমি বাংলা ভাষায় শুরু করি। টেকনোলজি এখনকার মানুষের পার্ট অব লাইফ। ইন্টারনেটে আমি সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে চ্যাটিং করি। আমি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের জয় করাটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করি। সময় কাটানোর জন্য এটা ভালো পথ। ওয়ান কেন মেক দিস ভেরি একসাইটিং। নারীকে কিভাবে প্রলুব্ধ করা যায়, মুগ্ধ করা যায়—সেই কথা বলা-কলাকৌশল নিয়ে ভাবি। নারীর মন জয় করতে ভালোবাসি, নারীরাও তাই চায়। আমার মনে হয়, নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ যত তীব্র, পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ তার চেয়েও তীব্র।

প্রশ্ন : কিছুদিন আগে একুশের অমর গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর সঙ্গে আপনার স্মৃতিকথা জানতে চাই।

নির্মলেন্দু গুণ : সম্ভবত ২০০৮ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত সংহতি কবিতা উৎসবে তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়। ওই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছিলেন লন্ডনপ্রবাসী সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ওই কবিতা উৎসবে গাফ্ফার ভাইকে আমি সর্বদা আমার পাশে পেয়েছিলাম। আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে আছেন গভীরভাবে। এই গল্পটি আরো চমকপ্রদ। ২১ জুলাই ১৯৭০ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তরুণ কবিদের নিয়ে একটি কবিতা পাঠের আসর করেছিল। ওই আসরে সম্ভবত সভাপতি ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। সেখানে আমি ‘হুলিয়া’ কবিতাটি পাঠ করি। এই কবিতা শুনে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘তৃতীয় মত’-এ ‘হুলিয়া’র বিষয়বস্তু নিয়ে বড় ধরনের মন্তব্য করেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘তৃতীয় মত’ কলামটি তখন খুব জনপ্রিয় হওয়ার কারণে আমার ‘হুলিয়া’ কবিতাটি অনেকে খোঁজ করা শুরু করেন। এই কলামটি আমার কাব্যভাগ্য আরো প্রসারিত করে।

প্রশ্ন : কবিতাকে পাঠকের আরো কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য কবিতার ধরন কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

নির্মলেন্দু গুণ : কবিতাকে কোনো সুনির্দিষ্ট ধরনের মধ্যে আবদ্ধ রাখার পক্ষপাতী আমি নই। কবিতা হবে বিচিত্র ধরনের। বিচিত্র মতের। বিচিত্র পথের। পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য কবিতার অতি সরলীকরণও যেমন প্রত্যাশিত নয়, তেমনি অতি জটিলীকরণের মাধ্যমে পাণ্ডিত্য ফলানোর চেষ্টাকেও আমি সমর্থন করি না। কবিতা শুধুই যে বোঝার বিষয়, তা নয়। এটা অনেকাংশে উপলব্ধিরও বিষয়। পোয়েট্রি ইজ কমিউনিকেটেড বিফোর ইট ইজ আন্ডারস্টুড। আমি কবিতার জাদুশক্তিতে বিশ্বাসী।

প্রশ্ন : সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, দাদা।

নির্মলেন্দু গুণ : তোমাকেও ধন্যবাদ।



সাতদিনের সেরা